এনডিপি নেতৃত্ব প্রতিযোগিতায় অচেনা মুখ, সাধারণ কানাডিয়ানের আগ্রহ সীমিত

কানাডার জাতীয় রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুগুলোর একটি হলো নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি এনডিপি র নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা

কানাডার জাতীয় রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুগুলোর একটি হলো নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি)-র নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। এক সময়ের শক্তিশালী এই প্রগতিশীল দলটি এখন গভীর সংকটে রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল, ভোটব্যাংক ক্ষয়প্রাপ্ত, এবং নেতৃত্বহীনতায় ভুগছে। যদিও নতুন নেতৃত্বের দৌড় শুরু হয়েছে, সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, কানাডিয়ানদের অধিকাংশই এখনো এই সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভালোভাবে চেনেন না বা তাদের সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা রাখেন না।

রিসার্চ কোর পরিচালিত এক সাম্প্রতিক অনলাইন জরিপে (৩০ জুন–২ জুলাই) কানাডার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এক হাজার এক জন উত্তরদাতা অংশ নেন। এতে দেখা যায়, এনডিপির নেতৃত্বের দৌড়ে থাকা নয়জন আগ্রহীর মধ্যে বেশিরভাগই সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অপরিচিত।

- Advertisement -

জরিপে যখন অংশগ্রহণকারীদের কাছে বর্তমান সংসদ সদস্য লিয়াহ গাজান, গর্ড জন্স, জেনি কুয়ান ও হিদার ম্যাফারসনের নাম উল্লেখ করা হয়, তখন বিপুল সংখ্যক মানুষ জানান, তারা এসব নাম কখনো শোনেননি। এমনকি দলটির সাবেক জনপ্রিয় এমপি রুথ এলেন ব্রোসো, ভ্যানকুভারের সাবেক মেয়র কেনেডি স্টুয়ার্ট এবং প্রগতিশীল চলচ্চিত্র নির্মাতা আভি লুইসের নামও অনেকের কাছে অপরিচিত রয়ে গেছে।

রিসার্চ কোরের সভাপতি ও জনমত বিশ্লেষক মারিও ক্যানসেকো বলেন, “এনডিপির নেতৃত্ব প্রতিযোগিতা এখন এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা কনজারভেটিভ বা লিবারেল পার্টির মতো নয়। যেখানে ওই দুই দলে সাধারণত প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক মুখদের দেখা যায়, এনডিপিতে এবার অনেকটাই উন্মুক্ত এবং অনিশ্চিত ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এতে যেমন নবজাগরণের সুযোগ রয়েছে, তেমনি নেতৃত্বের প্রতি জনবিশ্বাস গড়ে তোলা এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ।”

জরিপের ফলাফল অনুসারে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন সাবেক এমপি রুথ এলেন ব্রোসো ১৮ শতাংশ উত্তরদাতা তার সম্পর্কে ইতিবাচক মত দিয়েছেন।

অন্যদিকে নেতৃত্বের দৌড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় হিসেবে উঠে এসেছেন জেনি কুয়ান, যাকে ২২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী নেতা হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, কুয়ানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং সমাজকল্যাণমূলক ইস্যুতে তার ধারাবাহিক অবস্থানই তাকে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। তবে বাস্তবতা হলো ২২ শতাংশ সমর্থনও কোনো জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের জন্য যথেষ্ট নয়। এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়, এনডিপিকে এখনও সাধারণ মানুষের মনোযোগে ফিরিয়ে আনতে অনেক দূর যেতে হবে।

২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ফেডারেল নির্বাচনে এনডিপি ভয়াবহ পরাজয়ের মুখে পড়ে। দলটি মাত্র সাতটি আসন পায় যা তাদের ইতিহাসের অন্যতম নিম্নতম ফলাফল। কানাডার পার্লামেন্টারি নিয়ম অনুযায়ী, অন্তত ১২টি আসন না পেলে কোনো দল আনুষ্ঠানিক পার্টির মর্যাদা পায় না। ফলে এনডিপি এখন “অফিসিয়াল পার্টি” পরিচয় হারিয়ে ফেলেছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে যখন দলের দীর্ঘদিনের নেতা জাগমিত সিং নিজের আসনেই পরাজিত হন। পরবর্তীতে তিনি নেতৃত্ব ছাড়েন এবং বর্তমানে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার এমপি ডন ডেভিস অন্তর্বর্তীকালীনভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই শূন্যতা শুধু নেতৃত্বেই নয়, দলের মনোবলেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নেতৃত্ব সংকট এনডিপির জন্য একদিকে যেমন সংকট, অন্যদিকে এটি এক সম্ভাবনার সময়ও। পুরোনো ভোটব্যাংক হারিয়ে গেলেও নতুন প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সমতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। তবে প্রশ্ন হলো নতুন নেতৃত্ব কি এই তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করতে পারবে? এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে কতটা দ্রুততা দেখাবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেগান লরেন্ট বলেন, “এনডিপির এখন যা দরকার, তা হলো শুধু নতুন নেতা নয় নতুন ভাষা, নতুন কৌশল ও নতুন দৃষ্টি। তাদের সংগঠন কাঠামো, যোগাযোগ নীতি এবং প্রচারণা পদ্ধতি পুরোনো হয়ে গেছে। জনগণের সঙ্গে সংযোগ না বাড়ালে তারা আরো প্রান্তিক হয়ে পড়বে।”

কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গনে কনজারভেটিভ ও লিবারেল পার্টি এখনো দুই প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই বাস্তবতায় এনডিপি যদি আবারও প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পেতে চায়, তাহলে কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তন যথেষ্ট নয় প্রয়োজন পুরো সাংগঠনিক পুনর্গঠন।

দলটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তারা কতটা বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে তার ওপর। প্রগতিশীল নীতির প্রতি তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানই হয়তো নতুন করে প্রাণসঞ্চার করতে পারে যদি তারা সেই বার্তাটি স্পষ্টভাবে জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।

এনডিপির বর্তমান পরিস্থিতি যেন এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। সামনে পথ কঠিন, কিন্তু একেবারে বন্ধ নয়। নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে যদি তারা সংগঠনের দুর্বলতা কাটিয়ে, জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে, তবে কানাডার বামঘরানার রাজনীতিতে এনডিপি আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

আর যদি তা না পারে, তবে কানাডার রাজনীতি হয়তো আরও দুই মেরু কনজারভেটিভ ও লিবারেল কেন্দ্রিক হয়ে পড়বে, যেখানে এনডিপি কেবল একটি ইতিহাসের নাম হয়ে থাকবে।

This article was written by Rezaul Haque as part of the LJI

- Advertisement -

Read More

Recent