
উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ দুই প্রতিবেশী দেশ কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র এর সম্পর্ক নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য বিরোধ, রাজনৈতিক উক্তি, এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নীতির কারণে, কানাডিয়ানদের একটি বড় অংশ এখন তাদের দক্ষিণের প্রতিবেশীকে “সম্ভাব্য হুমকি” হিসেবে বিবেচনা করছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে ৫৯ শতাংশ কানাডিয়ান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তাদের জন্য একটি সম্ভাব্য হুমকি। তুলনামূলকভাবে, মাত্র পাঁচ বছর আগে, ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ২০ শতাংশ। অর্থাৎ সাম্প্রতিক পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি মনে করা কানাডিয়ানদের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।
তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ নেতিবাচক নয়। জরিপে ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা এখনও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মিত্র। অর্থাৎ, একদিকে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং সহযোগিতা বজায় থাকলেও, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবিশ্বাস ক্রমশ বাড়ছে।
পিউ রিসার্চের গবেষক জ্যানেল ফেটারলফ এই পরিবর্তনকে “দৃষ্টিভঙ্গির যুগান্তকারী রূপান্তর” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “কানাডা ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে স্থিতিশীল অংশীদার হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক বক্তব্য, সীমান্তনীতি, এবং শুল্ক আরোপের কারণে সাধারণ কানাডিয়ানদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে সন্দেহ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে।”
এই সমীক্ষা ২৫টি দেশের নাগরিকদের মধ্যে পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখেছে, তবে আটটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে। আশ্চর্যের বিষয়, এই তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রতিবেশী কানাডা ও মেক্সিকো।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মনোভাবের পেছনে প্রধান কারণ হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি। ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে কানাডার ওপর একাধিক বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করা হয়, বিশেষ করে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং গাড়ি শিল্পে। এ কারণে কানাডার রপ্তানি খাত বড় ধরনের আঘাত পায়। এছাড়া ট্রাম্প প্রকাশ্যে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের “একটি অঙ্গরাজ্য” হিসেবে উল্লেখ করায় কানাডিয়ানদের মধ্যে জাতীয় মর্যাদা ও স্বাধীনতার বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চে ট্রাম্প প্রশাসন পুনরায় কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর শুল্ক আরোপ করে, দাবি করে যে এই দুটি দেশ ফেন্টানাইল উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যদিও কানাডা সরকার সেই অভিযোগ অস্বীকার করে। এই শুল্ক থেকে কিছু পণ্যই কেবলমাত্র কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো বাণিজ্য চুক্তির আওতায় অব্যাহত থাকে।
পিউ রিসার্চ জানিয়েছে, এই সমীক্ষায় ২৪টি দেশে মোট ২৮,৩৩৩ জন নাগরিক অংশগ্রহণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তথ্য সংগ্রহ করা হয় ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত, টেলিফোন, অনলাইন এবং সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই তিন হাজার ৬০৫ জন আমেরিকানের ওপর একটি পৃথক সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে ইসরায়েল, এরপর রয়েছে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া। অন্যদিকে, কানাডা ও মেক্সিকোতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কানাডার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক যতই গভীর হোক না কেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গায় অবিশ্বাস স্থান করে নিচ্ছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের একপাক্ষিক বাণিজ্য সিদ্ধান্ত এবং কানাডাকে অবমূল্যায়নমূলক মন্তব্য, কানাডিয়ান সমাজে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি অবিশ্বাস, এবং বৈশ্বিক জোটভিত্তিক কূটনীতিতে আগ্রাসী মনোভাব এমন স্থিতিশীল দেশগুলোর জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সময় যে দেশ ছিল “সবচেয়ে কাছের বন্ধু”, এখন তার প্রতিই ক্রমবর্ধমান সংখ্যক কানাডিয়ান সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন। এই পরিবর্তন হয়তো উত্তর আমেরিকার ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
