
কানাডা পোস্টের সাম্প্রতিক চুক্তি প্রস্তাব বিপুল ভোটে প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশজুড়ে কর্মরত হাজার হাজার ডাককর্মী। দুই সপ্তাহব্যাপী ভোট গ্রহণ শেষে ইউনিয়নের সদস্যরা জানিয়ে দিয়েছেন—এই প্রস্তাব তাদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ। এর ফলে কয়েক মাস ধরে চলা শ্রমিক অসন্তোষ ও দর-কষাকষি আরও দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে।
কানাডিয়ান ইউনিয়ন অব পোস্টাল ওয়ার্কার্স (সিইইউপিডব্লিউ) জানিয়েছে, শহর ও গ্রামীণ—উভয় শ্রেণির কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত দর-কষাকষি ইউনিটের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সদস্য চুক্তি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। ইউনিয়নের মতে, সদস্যদের এই রায় স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ডাকবিভাগের কর্মীরা আর নিম্নমানের প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন এবং ন্যায্য মজুরি ও কর্মপরিবেশের জন্য তারা ঐক্যবদ্ধ।
কানাডা পোস্টের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভোটের ফলাফল হতাশাজনক হলেও তারা কর্মীদের মতামতকে সম্মান করছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে তা মূল্যায়ন করছে। বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়া কর্মীদের ধন্যবাদ জানাই এবং আশা করি শিগগিরই একটি গঠনমূলক সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে।”
উল্লেখযোগ্য যে, কানাডা পোস্ট তাদের প্রস্তাবে চার বছরে মোট ১৩ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছিল। পাশাপাশি খণ্ডকালীন ও অস্থায়ী কর্মীদের নিয়োগ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনাও ছিল তাদের প্যাকেজে। কিন্তু ইউনিয়ন নেতৃত্ব মনে করেন, এটি কর্মীদের স্বার্থের পরিপন্থী, কারণ খণ্ডকালীন ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হচ্ছে। ইউনিয়ন বহু বছর ধরে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে।
সিইইউপিডব্লিউর জাতীয় সভাপতি ইয়ান সিম্পসন বলেছেন, “সময় এসেছে কানাডা পোস্টের আবার আলোচনার টেবিলে ফেরার এবং প্রকৃত অর্থে গুরুতর আলোচনা শুরু করার। কর্মীদের ধৈর্যের সীমা অতিক্রম হয়েছে—এখন প্রয়োজন ন্যায্য সমাধান।”
এই ভোটের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২১ জুলাই এবং শেষ হয় শুক্রবার সন্ধ্যায়। পুরো ভোট কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করে কানাডা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস বোর্ড। এই বোর্ডকে সক্রিয় করেন ফেডারেল কর্মসংস্থানমন্ত্রী প্যাটি হাইডু, যিনি সম্প্রতি কানাডা পোস্টে চলমান শ্রমিক বিরোধে মধ্যস্থতার আহ্বান জানান।
বর্তমানে কানাডা পোস্টে প্রায় ৫৫ হাজার কর্মী কাজ করছেন, যারা দেশের প্রতিটি প্রান্তে ডাকসেবা চালিয়ে রাখছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও কর্মপরিসরের চাপে তাদের অসন্তোষ বেড়েছে। অনেক কর্মী অভিযোগ করেছেন, ডাক বিতরণ ব্যবস্থায় কাজের চাপ বেড়ে গেলেও পারিশ্রমিক ও সুবিধা সে অনুযায়ী বৃদ্ধি পায়নি।
অন্যদিকে কানাডা পোস্টের দাবি, ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল যুগে ডাকসেবার আয় কমে যাচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানটি কঠিন আর্থিক বাস্তবতার মুখোমুখি। তাই তারা ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, চুক্তিভিত্তিক শ্রম ও খণ্ডকালীন কর্মী নির্ভরতা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। তবে ইউনিয়ন নেতারা বলছেন, এই যুক্তি শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ডাকবিভাগের এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে কানাডার যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের ডাকসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ইতিমধ্যেই বিলম্বিত চিঠিপত্র ও পার্সেল বিতরণ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যদি দ্রুত মধ্যস্থতায় না আসে, তবে কানাডা পোস্টে আংশিক কর্মবিরতি বা পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘটের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এতে শুধু সেবা খাত নয়, বরং সমগ্র অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়বে।
কানাডা পোস্ট একসময় ছিল দেশের নির্ভরযোগ্য সেবার প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের বিরোধ, অর্থনৈতিক চাপে সঙ্কুচিত সুবিধা এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের ফলে প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কর্মীরা যেখানে স্থিতিশীল জীবন ও ন্যায্য মজুরি চান, সেখানে প্রতিষ্ঠান বলছে টিকে থাকার লড়াইয়ে তাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। এই টানাপোড়েনের মাঝেই অনিশ্চয়তায় রয়েছে কানাডা পোস্টের ভবিষ্যৎ এবং তার সঙ্গে জড়িত ৫৫ হাজার পরিশ্রমী ডাককর্মীর জীবন।
This article was written by Rezaul Haque as part of the LJI
