
আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল থেকে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণের ওপর বৈশ্বিক কর আরোপের উদ্যোগ ব্যর্থ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (IMO) বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই স্থগিত হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে কার্যত এই প্রস্তাবটি থমকে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সমুদ্রপথে পরিবহন খাতের নির্গমন কমানোর বৈশ্বিক প্রচেষ্টা এ ঘটনায় বড় ধাক্কা খেল বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশ্লেষকরা।
লন্ডনে IMO সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিশ্বের অনেক দেশ জাহাজ চলাচল শিল্পকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ধীরে ধীরে সরে এনে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করার প্রস্তাবে একমত হয়েছিল। তবে, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের কঠোর বিরোধিতার কারণে বৈঠকে ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।
বৈঠক শেষে সংস্থার কোনো প্রতিনিধি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “এই প্রস্তাবটি ছিল ন্যায্য কার্বন ফি আরোপের উদ্যোগ, যা শিপিং শিল্পের নির্গমন কমাতে সহায়তা করত। কিন্তু রাজনৈতিক চাপ ও হুমকির কারণে আলোচনা স্থগিত করতে হয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে বলেন, “আমেরিকা এই তথাকথিত সবুজ কর কেলেঙ্কারির পক্ষে থাকবে না। এটি আমেরিকার অর্থনীতির ওপর বৈশ্বিক বোঝা চাপানোর ষড়যন্ত্র।” তিনি আরও দাবি করেন, কার্বন ফি আরোপ করলে তা “আমেরিকার জাহাজ শিল্প ও আমদানি-রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা ক্ষমতাকে দুর্বল করবে।” শুধু বিরোধিতা নয়, ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়েছে যে, যারা এই করের পক্ষে ভোট দেবে তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র “প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ” নিতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (X) পোস্ট করে বৈঠক স্থগিত হওয়াকে ট্রাম্পের “আরেকটি বড় বিজয়” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “এই নীতিমালা ছিল বৈশ্বিক কার্বন ট্যাক্সের নামে একটি ছদ্মবেশী অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো আন্তর্জাতিক চাপকে মেনে নেবে না।” রুবিও আরও হুঁশিয়ারি দেন, যেসব দেশ এই কর সমর্থন করবে তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, ভিসা নিয়ন্ত্রণ এবং বাণিজ্যিক প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশ কানাডা প্রকাশ্যে এই উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিলেও ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিশোধমূলক হুমকিকে কেন্দ্র করে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ট্রান্সপোর্ট কানাডা-এর মুখপাত্র হিশাম আইয়ুন বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেন, “কানাডা, IMO-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল শিল্পে জলবায়ু কার্যক্রম এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে চাই।”
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশোধমূলক অবস্থান নিয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। রুবিও বা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকেও কানাডার উদ্বেগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন রোধে জাহাজ চলাচল শিল্পের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য সমুদ্রপথে পরিবহন হয়, এবং এই খাত থেকে বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৩ শতাংশ আসে।
এই শিল্পে বৈশ্বিক ফি আরোপের উদ্যোগটি ছিল গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বাধার কারণে এই প্রচেষ্টা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান জলবায়ু কূটনীতিতে নতুন সংঘাতের সূচনা করেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি শিপিং খাতে কোনো বৈশ্বিক নীতিমালা কার্যকর না হয়, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে এই খাতের কার্বন নিঃসরণ দ্বিগুণ হতে পারে।
IMO বৈঠক স্থগিত হওয়ার ফলে সমুদ্রপথে পরিবহনের মাধ্যমে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক ঐক্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিশ্ব এখন দেখছে জলবায়ু ন্যায্যতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েনে কোন দিকটি জয়ী হয়।
