
মার্কিন শুল্কনীতির প্রভাবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে কানাডার অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাসে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বার্ষিক ভিত্তিতে ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে। রপ্তানি ও বিনিয়োগে তীব্র পতনই এই সংকোচনের মূল কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এর আগে বছরের প্রথম প্রান্তিকে কানাডার অর্থনীতি ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল, যদিও প্রাথমিক হিসাবে সেই প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ। পরে সেটি সংশোধন করে ২ শতাংশে নামিয়ে আনে স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে জনপ্রতি প্রকৃত জিডিপিও হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ, গড়ে একজন কানাডিয়ান নাগরিকের উৎপাদনশীলতা ও আয় উভয়ই কমেছে। অথচ প্রথম প্রান্তিকে এ সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কা করছিলেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব কানাডার অর্থনীতিতে পড়বে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও অটোমোবাইল খাতে ব্যাপক শুল্ক আরোপ করে। এতে কানাডার সবচেয়ে শক্তিশালী রপ্তানি খাতগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ব্যবসায়ীরা এই শুল্ক এড়াতে বছরের শুরুতেই বিপুল পরিমাণ ক্রয়াদেশ সম্পন্ন করেছিলেন। ফলে প্রথম প্রান্তিকে অর্থনৈতিক কার্যক্রম কিছুটা বাড়লেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে চাহিদা হঠাৎ করে কমে যায়।
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে যাত্রীবাহী গাড়ি ও লাইট ট্রাকের রপ্তানি কমেছে প্রায় ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন। তাছাড়া শিল্পযন্ত্রপাতি, ইকুইপমেন্ট ও যন্ত্রাংশ রপ্তানিও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। সেবা খাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে, বিশেষ করে ভ্রমণ সেবায় আয় কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও চিত্রটা হতাশাজনক। দ্বিতীয় প্রান্তিকে যন্ত্রপাতি ও ইকুইপমেন্টে বিনিয়োগ কমেছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০১৬ সালের পর সর্বনিম্ন। তবে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এই হিসাবের মধ্যে কোভিড-১৯ মহামারির সময়কাল অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
জুন মাসে প্রকৃত জিডিপি হ্রাস পেয়েছে দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে প্রাথমিকভাবে সমপরিমাণ প্রবৃদ্ধির আশা করা হয়েছিল। পণ্য উৎপাদন খাতে উৎপাদন কমেছে ০.৫ শতাংশ, আর সেবা খাতে হ্রাস পেয়েছে ০.১ শতাংশ।
শুধু রপ্তানিই নয়, আমদানিতেও পতন ঘটেছে। অটোয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্ক আরোপ করায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর কানাডায় পণ্য রপ্তানির আগ্রহ কমেছে। এর ফলে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য প্রবাহে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে কানাডিয়ানদের আমেরিকা ভ্রমণও কমে গেছে, যা পরোক্ষভাবে সেবা খাতের রপ্তানি আয় কমিয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি শুল্ক পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হয়, তবে তৃতীয় প্রান্তিকেও কানাডার অর্থনীতি সংকুচিত হতে পারে। ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা ব্যবসায়িক আস্থা ও বিনিয়োগ প্রবণতা উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
একজন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন, “কানাডার অর্থনীতি বহির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন যতদিন থাকবে, ততদিন প্রবৃদ্ধি টেকসই হওয়া কঠিন।”
সব মিলিয়ে, মার্কিন শুল্কনীতি, রপ্তানি হ্রাস ও বিনিয়োগে মন্দা এই তিনটি কারণ মিলেই দ্বিতীয় প্রান্তিকে কানাডার অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই অটোয়া কীভাবে এই চাপ মোকাবিলা করবে এবং তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে পারবে কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।
