
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কাছে কানাডাকে একটি “স্থিতিশীল, নির্ভরযোগ্য ও পূর্বাভাসযোগ্য” অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে উদ্যোগী হয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালা লামপুরে আয়োজিত আসিয়ান (ASEAN) সম্মেলনে অংশ নিতে শনিবার তিনি পৌঁছান দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার সবচেয়ে দীর্ঘ বিদেশ সফর।
এই সফরটি এমন এক সময় হচ্ছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অটোয়ার সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনা হঠাৎ স্থগিত করেছেন, যা উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবুও, কানাডা এখন তার বাণিজ্য ও বিনিয়োগের দিগন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরও সম্প্রসারণে মনোযোগ দিচ্ছে।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় অন্টারিও সরকারের একটি টেলিভিশন বিজ্ঞাপন থেকে, যা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে প্রচারিত হয়। সেই বিজ্ঞাপনে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের একটি ফুটেজ ব্যবহার করা হয় যেখানে তাকে শুল্কবিরোধী অবস্থান নিতে দেখা যায়।
ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টিকে “অসৎ উদ্দেশ্যমূলক” ও “বিভ্রান্তিকর” বলে দাবি করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে সাংবাদিকদের বলেন, “কানাডা মিথ্যা বলছে। তারা প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের একটি ভুয়া বিবৃতি তৈরি করেছে। রিগ্যান ছিলেন শুল্কের একজন দৃঢ় সমর্থক, বিরোধী নন।” এই মন্তব্যের পরই ট্রাম্প কানাডার সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনা স্থগিতের ঘোষণা দেন।
কুয়ালা লামপুরে পৌঁছে মার্ক কার্নি জানান, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় কানাডা “দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর পাশে থাকবে” এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মুক্ত বাণিজ্যের পক্ষে কাজ করবে। তিনি বলেন, “কানাডা রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল, অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরযোগ্য, এবং পরিবেশ ও মানবাধিকারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আসিয়ান অঞ্চলের সঙ্গে অংশীদারিত্ব আমাদের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।”
আসিয়ান সম্মেলনের সময় ট্রাম্পের সঙ্গে কার্নির কোনো দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হবে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে বলেন, “এ ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই।” ট্রাম্পের এই অবস্থান দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম পেলেরিন মনে করেন, আলোচনার ভেস্তে যাওয়ার কারণ শুধু বিজ্ঞাপন নয় বরং এটি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের কিছু কাঠামোগত বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রতিফলন। তার ভাষায়, “বিজ্ঞাপন হয়তো ছিল তাৎক্ষণিক উদ্দীপনা, কিন্তু মূল সমস্যা আরও গভীরে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল কানাডা কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে কিছু নীতি পরিবর্তন করুক যা অটোয়া মানতে রাজি হয়নি।”
কানাডার কূটনৈতিক মহলে মনে করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সাময়িকভাবে শীতল হলেও, আসিয়ান বাজারে কানাডার উপস্থিতি বাড়ানো বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং টেকসই জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ সহযোগিতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছেন কার্নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্ক কার্নির কূটনীতি মূলত “বহুমুখী অংশীদারিত্ব”-এর ওপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থেকে কিছুটা স্বাধীন হয়ে কানাডা এখন এশিয়া ও ইউরোপে নতুন বাণিজ্য ভারসাম্য গড়তে চায়। আসিয়ান সম্মেলন সেই বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ, যেখানে কানাডা নিজেকে “বিশ্বস্ত ও নৈতিক অংশীদার” হিসেবে উপস্থাপন করছে।
