উইন্ডসরে আগাম তুষারপাত

আমাদের এই উইন্ডসরে এ বছর আগাম তুষারপাত শুরু হয়েছে

আমাদের এই উইন্ডসরে এ বছর আগাম তুষারপাত শুরু হয়েছে।

তবে অবাক ব্যপার কি বাগানের কিছু সব্জি বেঁচেছিল বরফের আগের দিন পর্যন্ত। আমরা যেসব সব্জি এবং ফলের গাছ লাগাই এর অধিকাংশই গ্রীষ্মকালীন। তারপরও বছরের পর বছর একই ফসল আবাদের ফলে এরা অধিকতর ঠান্ডা সহিষ্ণু হয়ে উঠেছে।

- Advertisement -

এ বছর উইন্ডসরে প্রথম বরফ পড়েছে নভেম্বরের ১০ তারিখে।

আমি সবশেষ বাগান পরস্কার করেছি  ৯ তারিখে। তখনো সিম, মূলা, লাউ, করল্লা এবং বেগুন গাছগুলো ভালই বেঁচেছিল। অক্টোবরের মাঝামাঝি আমরা বেড়াতে গিয়েছিলাম আমেরিকায়। দু সপ্তাহের ভ্রমনের প্রথম কয়েকদিন কাটিয়েছি আমার ছেলে শাওনের বাসায়। ক্যালিফোর্নিরায় সিলিকন ভ্যালি হিসেবে পরিচিত ইস্ট পলোয়াল্টো  শহরে সময়টা কেটেছে ভালই। তবে অল্প সময় ছিলাম বলে বন্ধু – স্বজন কারো সাথেই দেখা করার সূযোগ হয়নি। সেই সময়কার কিছু ছবি ভেবেছি ফেসবুকে শেয়ার করব কিন্তু তা করা হয়ে উঠেনি।

বরফের দিন শুরুর আগে আগেই ছিল আমাদের ক্যালিফোর্নিয়া ভ্রমন পর্ব । প্রথমের ইস্ট পলোয়াল্টওতে  শাওনের বাসায় এবং পরবর্তিতে স্যান্ডিয়াগোতে স্বপ্নিলের বাসায়।

আমাদের ক্যালিফোর্নিয়া ভ্রমন পর্বটি ছিল বেশ উপভোগ্য।

প্রথম চারদিন সিলিকন ভ্যালিতে বেড়ানোর পর চলে যাই স্বপ্নিলের বাসায়। দূরত্ব প্রায় আটশ কিলোমিটার। গাড়ি চালিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ভ্যালী হয়ে স্যান্ডিয়াগোতে পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় আট থেকে নয় ঘন্টা। ভ্রমনের প্রথমদিকে আমরা চলেছি পাহাড়ের গা ঘেঁষে। একদিকে সুউচ্চ পাহাড় আর অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের অথৈ জলরাশি। প্রকৃতি যে কত সুন্দর সেটি এভাবে গাড়িতে ড্রাইভ করে না গেলে বুঝা যায় না।

গাড়ি চালাচ্ছে আমার ছেলে শাওন এবং পাশে আমি।

পেছনের সিটে আমার স্ত্রী শাহীন এবং ছেলে-বৌ সিরোরাত। একটা সময় পাহাড় আর সাগরের খেলা শেষ। আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করে মরুময় সেন্ট্রাল ভ্যালির উপর দিয়ে। শত শত মাইল জুড়ে প্রায় সমতল ভুমি। তবে সারা বছরই তাপমাত্রা থেকে চল্লিশের উপর। তাই খরাময় বিস্তৃন অঞ্চল। তবে মজার ব্যাপার হলো এই মরুভূমিতেই হচ্ছে বাহারি ফলের চাষ। বৃষ্টির সময় বিশাল প্রাকৃতিক রিজার্ভারে পানি ধারন করে তা ব্যবহার করা হয় গাছের গোঁড়ায় আটোমেটিক সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে। খুব ইচ্ছে হয়েছিল গাড়ি দাড় করিয়ে কোন একটি ফল বাগানে যাই। কিন্তু পরিচিত ফার্ম মালিক না থাকায় তা আর হয়ে উঠেনি।

প্রশান্ত মহাসাগরের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো এক মনোরম শহর স্যান-ডিয়াগো। এই শহরের তাপমাত্রা বরাবরই খুব সহনীয়। সাগরের জলীয়বাষ্প পাহাড়ের গায়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে শহরটিকে নাতিশীতোষ্ণ রাখে সারা বছর। আমরা যখন গাড়ি চালিয়ে লস এঞ্জেলসের কাছাকাছি পৌঁছাই তখন সূর্য প্রায় অস্তগামী। অপেক্ষাকৃত সমতল পেড়িয়ে আমাদের গাড়ি তখন চলছে আঁকবাঁকা। পরন্ত বিকেলের বর্নিল আঁভায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি প্রকৃতির গহীনে। অপূর্ব এক ভাল লাগা কাজ করেছিল নিজের ভেতর। আমরা যখন স্যান্ডিয়াগোতে স্বপ্নিলের বাসায় পৌঁছাই  তখন সন্ধ্যা নেমেছে পাহাড়ের গাঁয়। চারিদিকে ঝি ঝি পোকার ডাক – আবছা অন্ধকার।

স্যান ডিয়াগো শহরের একটি আকর্ষনীয় দিক হচ্ছে শহরটির অধিকাংশ লোকালয় হচ্ছে পাহাড়ের উপর কিংবা পাহাড়ের ঢালে। আর লোকালয় থেকে কিছুদূর গেলেই পাওয়া যাবে প্রশান্ত মহাসাগরের সীমাহীন জলরাশি। এ এক অপরূপ মায়াবী সৌন্দর্য।

আগেই বলেছি আমার খুব ইচ্ছা ছিল ফল বাগান ঘুরে দেখার।

এত গরমের দেশে কিভাবে অতি সুমিষ্ট ফল ফলাদি জন্মায় তা দেখার আগ্রহ ছিল প্রচন্ড। স্বপ্নিল সে অনুযায়ি সব ব্যবস্থা করল। ওর এক বন্ধু পরিবার আমাদের আমন্ত্রন জানাল স্যান ডিয়াগোর অদূরে ভ্যালি সেন্টার এলাকায় ওদের কৃষি খামার দেখতে যাওয়ার জন্য। ওরা এটিকে খামার বললেও এটি আদতে একটি ফল বাগান। দু’দিক থেকে সুউচ্চ পাহাড় নেমে এসেছে আর দু’পাহাড়ের মিলন স্থলে বয়ে গিয়েছে পানির নহর। এ নহরে পানি আসে কলোরাডো রিভার থেকে। ক্যালিফোর্নিয়ার রাজ্য সরকার নদীর পানি কিনে তা কৃত্তিম ড্যামে জমা করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষকদের খুব সূলভমূল্যে এই পানি সরবরাহ করে। প্রায় একশত একর আয়তনের বিশাল এক কৃষি খামার। বাহারি জাতের কমলা, মাল্টা, লেবু, পেয়ারা, ডালিম ইত্যাদি সবই আছে সফি এবং নিকদের বাগানে। বলে নেই সফি (সুফিয়া) হচ্ছে স্বপ্নিলের বান্ধবী এবং নিক সফির বর। ওদের ফল বাগানের পাশে অবস্থিত “ দি ইয়েলু ডেলি ”  রেস্টুরেন্টে আমাদের দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রন। স্বপ্নিলের পোর্টোবেলো ড্রাইভের বাসা থেকে এই ফল বাগান মাত্র এক ঘন্টার ড্রাইভিং দূরত্বে অবস্থিত।

আমরা বাগান ঘুরে ঘুরে কমলা, মাল্টা, গ্রেইপ ফ্রুট, ছোট জাতের দেশি পেয়ারা এবং ডালিম সংগ্রহ করলাম অনেক। নিজ হাতে ফল উঠানো – কতই না মজা। তার উপর যত ইচ্ছে তত। কত ফল যে পেকে মাটিতে পরে আছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। যে ফলের যখন বাজার মূল্য ভাল থাকে তাই শুধু বাগানের শ্রমিকরা সংগ্রহ করে। বাকি সব অনেক সময় বাগানেই পঁচে যায়। প্রতিটি গাছের গোরা পানির পাইপ লাইন আছে যা সে্ট করা অটোমেটিক টাইমারের মাধ্যমে চালু হয় সময়মত।

আমরা যখন কানাডায় ফল বাগানে যাই তখন শত শত মানুষ সেখানে যায়। তাছাড়া সার – কীটনাশক  দেয়া ফলন আমরা সংগ্রহ করি। এবার ছিল এর ব্যতিক্রম। পাহাড়ি বাগান, প্রাকৃতিক ফলন। কোন রাসায়নিক কীটনাশক নাকি ওদের দিতে হয় না। কিংবা দেয়ার নয়ম নাই। ইন্সপেক্টর এসে মাঝে মাঝেই সব পরীক্ষা করে।

আসাধারন এক বাগান ভ্রমন অভিজ্ঞতা।

 

উইন্ডসর, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent