
আমাদের সমাজে একটা বিষয় খুব লক্ষ্য করি—পরশ্রীকাতরতা যেন বাঙালির রক্তে মিশে আছে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এ নিয়ে সুন্দর পর্যবেক্ষণ আছে, আগ্রহীরা পড়ে নিতে পারেন। একবার ভাবুন তো, একই ঘরে বড় হওয়া দুই ভাই, একই খাবার, একই পরিবেশ, একই স্কুল…তবুও একজন যখন একটু এগিয়ে যায়, তখন অন্যজনের ভিতরে কোথা থেকে যেন এক ক্ষীণ কষ্ট, একটা হাহাকার, একটা তীব্র প্রশ্ন জেগে ওঠে—সে পারল, আমি পারলাম না কেন?
এই প্রশ্নটি আত্মসমালোচনায় নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও অনেকের মনেই তা হয় না। বরং ইর্ষা ধীরে ধীরে রূপ নেয় বিদ্বেষে। যেন অন্যের উন্নতিই নিজের অপমান। মনস্তত্ত্ববিদরা একে বলে relative deprivation:
নিজের বঞ্চনায় নয়, অন্যের প্রাপ্তিতে কষ্ট পাওয়া।
দারিদ্র্য, সীমিত সুযোগ, ঔপনিবেশিক শাসনে দীর্ঘদিনের হীনমন্যতা—সব মিলিয়ে আমাদের সমাজে একটা zero-sum mentality তৈরি হয়েছে, সেজন্য সেভাবছে, অন্যের সাফল্য মানে আমার ক্ষতি। এই মানসিকতা শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, রাজনীতি, সংস্কৃতি, এমনকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশের অনেক মানুষের মনে ভারত-বিদ্বেষের কারণ ব্যাখ্যা করতে এই উপসর্গটি বিবেচনায় রাখা উচিত। (ভারত-বিদ্বেষ নিয়ে ধারাবাহিক লেখার ইচ্ছে আছে, যদি সময় পাই।)
প্রশ্ন করতে পারেন—কেন একজনের উন্নতি আরেকজনের কাছে আনন্দ নয়, বরং, হুমকি হয়ে দাঁড়ায়? কেন একজনের অর্জন আরেকজনের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে? কেন আমরা তুলনার বদলে অনুপ্রেরণা নিতে শিখলাম না?
পরশ্রীকাতরতা কোনো জাতিগত স্বভাব নয়—এটি আমাদের ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও সামষ্টিক মনস্তত্ত্বের দীর্ঘ ছায়া। চাইলে আমরা এই ছায়া ভাঙতে পারি। যেদিন আমরা অনুভব করব—অন্যের উন্নতি আমার সম্ভাবনা কমায় না—বরং সম্ভাবনার পথ দেখায়, সেদিনই আমাদের সমাজ পরশ্রীকাতরতা থেকে মুক্তির পথে হাঁটবে।
