মুক্তিযুদ্ধের পরে

মুক্তিযুদ্ধের পরে

বঙ্গবন্ধুকে সামনে থেকে দেখিনি, দেখা হয়নি। বয়স একটা কারণ বটে, তবে সেটাই একমাত্র কারণ না। মুক্তিযুদ্ধের পরে, সালটা বলতে পারবো না, তিনি নওগাঁয় এসেছিলেন। শহরের নওজোয়ান মাঠে জায়গা হবে বিধায় দিঘলি বিলের শুকনো জমিনে বিশাল জনসভাটি হয়েছিল। আমার মনে আছে, আমাদের গ্রাম থেকে অনেক মানুষ এসেছিলেন, শেখকে দেখবে, তার বক্তৃতা শুনবে– এই বাসনায়। আমি তখন দ্বিতীয় কি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। জেদ ধরেছিলাম, আমিও যাবো। বাচ্চা ছেলের শেখকে দেখার কী আছে? সেই বিবেচনায় হয়তো বয়স্করা ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলেন। অথবা, ভেবেছিলেন, যদি হারিয়ে যায়। লাখো মানুষের সমাবেশ যে! আমিও একাএকা আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাজির, সেখানে কয়েকজন বন্ধুকে পেয়ে গেলাম। কেউ একজন বলল, চল ছাদে যাই, সেখান থেকে দিঘলি বিল দেখা যায়। ছাদে উঠলাম, তারপর সিঁড়ির ওপরে যে ছোট্ট ছাদ, সেটার ওপরেও উঠলাম। হায়! কোথায় দিঘলি বিল! আর যদি দেখাও যেতো, বঙ্গবন্ধুকে তো দেখা যেতো না। তবু, কচি মনের কী প্রবল আকাঙ্খা।

সেই অভাব দূর করতেই বুঝি আমি জিয়ার পেছনে ছুটেছি। ১৯৭৮ সাল। তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। আমরা থাকতাম দিনাজপুর জেলার প্রান্তিক থানা হরিপুরে। জিয়া আসবেন রাণি শৈংকইল থানায়। হরিপুর থেকে ১০-১১ মাইল দূরে। আমরা ইশকুলের তিন বন্ধু পায়ে হেঁটে হাজির হয়েছিলাম সেই জনসভায়। বক্তৃতা শেষে জিয়া পাবলিকের সাথে হাত মেলাতেন। আমিও কোন ফাঁকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। সেই প্রথম। তারপরে, আরও কয়েকবার সুযোগ হয়েছিল হাত মেলাবার। শেষটা ছিল ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮০। তখন আমরা পঞ্চগড়ে। জিয়ার শেষ সফরটি ছিল তেঁতুলিয়ায়। কৃষক দলের জাতীয় সম্মেলন। পঞ্চগড়ে যাদের সাথে মিশে বড় হয়েছি, তাদের বেশিরভাগ তখন ছাত্রদল করে। তো, তাদের সাথে মিশে হাজির হয়েছিলাম তেঁতুলিয়ায়। খুব কাছ থেকে একজন রাষ্ট্রপতিকে দেখা, সেটাই প্রথম, সেটাই শেষ। রাতে দিনাজপুর শিল্পকলা অ্যাকাডেমির আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আমাদের সুযোগ হয়েছিল তৃতীয় সাড়িতে বসে সেই অনুষ্ঠান দেখার। সামনা-সামনি খালেদা জিয়াকেও সেবারই প্রথম ও শেষ দেখা।

- Advertisement -

এরশাদকেও দেখেছি নওগাঁর এক জনসভায়। মাত্র একবার।

 ১৯৮৩ থেকে ৮৫, দীর্ঘ দুবছর ঢাকা কলেজে পড়বার সময় ৩২ নম্বরে যাওয়াটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। পচাত্তরের পনেরই আগস্টের পর অবিকল, অবিকৃত বাড়ি। তখনও জাদুঘর হয়ে ওঠেনি। সিঁড়িতে রক্তের দাগ, শুকিয়ে কালো হয়ে আছে। দেওয়ালে বুলেটের ক্ষত। গ্যারেজের সামনের দিকে বাস্কেট বলের রিং, কে একজন বলল, শেখ কামাল ছিল খেলা পাগল। আবাহনী তাঁরই সৃষ্টি, সেটা জেনে কী যে ভালো লেগেছিল, কারণ সেই কবে থেকে আমি আবাহনীর ভক্ত। পনেরই আগস্টে বাড়ির সামনে মঞ্চ বানিয়ে শোক দিবসের অনুষ্ঠান হতো। আমি যেতাম, অথবা আমাকে টেনে নিয়ে যেতো রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতার মতো–

 ”আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে

হে সুন্দরী?

বলো  কোন্‌ পার ভিড়িবে তোমার

সোনার তরী।

যখনি শুধাই, ওগো বিদেশিনী,

তুমি হাস শুধু, মধুরহাসিনী–

বুঝিতে না পারি, কী জানি কী আছে

তোমার মনে।!”

মহাদেব সাহা কিংবা নির্মলেন্দু গুনের সকণ্ঠে নিজের কবিতা আবৃত্তি। সেটাও বড় কারণ, কবিতা শুনতে শুনতে ডুবে যেতাম, দেখতাম, বঙ্গবন্ধুর রক্তে ভেসে যাচ্ছে বাংলার সবুজ জমিন। আর বিচারপতি কে এম সোবহানের স্মৃতিচারণ। সেটাও ছিল শুনবার মতো। শেখ হাসিনাকে সেবারই প্রথম দেখা। দূর থেকে যদিও।

 ১৯৮৬ সালে রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে নানা-ঘটনায় ছাত্রলীগে সক্রীয় হলাম। মেধা যতটুকু ছিল, তারচেয়ে বেশি ছিল জেদ, কারণ, এক বড় ভাই আমার টেবিলে সেঁটে রাখা বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখে শাসিয়ে গিয়েছিল এই বলে যে, এখানে শেখ মুজিব চলবে না। ১৯৮৯ সাল নাগাদ শেখ হাসিনার জনসভা ছিল সাহেববাজারে। ছাত্রলীগের মিছিল নিয়ে রাজশাহী বিআইটি থেকে আমরা হাজির হয়েছিলাম। বিশাল জনসভার একপ্রান্তে ঠাঁই হলো আমাদের। অনেক দূর থেকে শেখ হাসিনাকে দেখেছি। সেটাই শেষ।

টাঙ্গাইলের সুতি শাড়িতে হালকা-পাতলা শেখ হাসিনাকে বরাবর দূর থেকে দেখে এসেছি। কাছে যেতে ইচ্ছে করেনি। মন সায় দেয়নি। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মসাধ মেটাতে সপরিবারে নিহত হতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে, এটা আমাকে সারাক্ষণ ভাবায়, আমাকে অপরাধী বানিয়ে রাখে। তাঁরই অভাগা কন্যা, ভাগ্যদোষে বেঁচে যাওয়া। নইলে, বিশ্ব-ইতিহাসে এমন নজির তো নেই। রাজনৈতিক কারণে সপরিবারে হত্যার ঘটনাই তো হাতে গোনা। তাদের কোনটাতেই উত্তরাধিকার বেঁচে ছিল না। সেটা কারবালা হোক কি রাশিয়ায় জার। এমনকি, তলস্তল বলেন কি শেকসপিয়র, কিংবা রবীন্দ্রনাথ, কারও কল্পনাতেও এমন হত্যাকান্ড নিয়ে কোন লেখা বের হয়নি।

বাঙালি এক নারী পাহাড়ের চেয়েও বিশাল কষ্ট বুকে চেপে রাজনীতি করে যাচ্ছেন– যত ভাবি, তত অবাক হই। আমাদের সাহিত্যজগত বড়ই কৃপন, অথবা, অচেতন। তা না হলে বিশ্ব-ইতিহাসের এতবড় ঘটনা নিয়ে কোন গাঁথা নেই, কোন গল্প নেই। উল্টো, আছে শুধু গীবত।

 

ক্যালগেরি, আলবার্টা

- Advertisement -

Read More

Recent