
সবাই তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে মামার অনুষ্ঠানের লোকজন এলেই রওনা হয়ে যাবে কিন্তু ওদের কোনো খবর নাই।
সামিয়া ইকবাল টেলিফোন করেছেন, উনি আজ আবেদিন আহমেদের সাথে যেতে পারছেন না। অনুষ্ঠানের মূল মানুষ এখনো ঢাকায় এসে পৌঁছান নাই সেজন্য। ঠিকানা এবং মোবাইল ফোন নাম্বার দিয়ে আবেদিন আহমেদ জানতে চাইলেন উনার গাড়ি লাগবে কিনা ?
আমরা নিজেরাই চলে আসব, গাড়ি পাঠাতে হবে না। আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা ঠিক দু-একদিনের মধ্যে পৌঁছে যাবো।
ওরা আজ যেতে পারছেন না। আমরা তবে রওনা হয়ে যাই। আবেদিন আহমেদ সবার দিকে তাকান।
আমরা সব তৈরি, চলো বেরিয়ে পড়ি। মাইক্রোবাসে আবেদিন আহমেদ, মিসেস আবেদিন আহমেদ, সাজিদ, জয়, তাতাই, লিমা গ্রামের পথে রওনা হয়ে যায়। লিমা না যাওয়ার জন্য গাঁইগুই করছিল আগের রাতে। ওর নাকি অনেক কাজ ঢাকায়। তাতাই কিছু সিরিঞ্জ আর প্যাকেটে সাদা গুঁড়ো পাউডার দেখিয়ে বলে আমার কাছে সব আছে, তোমার অসুবিধা হবে না আশা করি। লিমা এমন অবাক হয়। ও ভেবেছিল কেউ কিছু জানে না। এই পুচকে মেয়েটা দেখি সব খবর জানে। বাবা-মাকে বলে দিয়েছে নাকি ? লিমা মনে মনে শংকিত হয়। এরপর আর আপত্তি করেনি। চুপচাপ গোছগাছ করে শুয়ে পড়েছিল।
সাজিদ চুপচাপ বসে আছে। সেই কত বছর আগে আবেদিন আহমেদের সাথে ঐ গ্রাম থেকে চলে এসেছিল। কত জায়গায় ঘুরে বেড়ায় এখন কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সে গ্রামে আর কখনো যাওয়া হয়ে উঠেনি। এত বছর পর উনার সাথেই ফিরে চলেছে সেই গ্রামে। স্মৃতি ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে সে। মনে পড়ছে─অনেক কথা উনার সাথে দেখা হওয়ার দিনগুলো। বাদশা মিয়াকে খুব বেশি মনে পড়ছে। নদীর পাড় কি সেই আগের মতনই আছে ? সেই বিস্তৃত ধানের ক্ষেত, সরিষা ক্ষেত। মানুষ কেমন আছে ? বাদশা মিয়ার কুঁড়েঘরখানা আছে কি এখনো? আপন মনে হেসে ফেলে সাজিদ। সেই কুঁড়েঘর কি ঝড়জলে এত বছরে দাঁড়িয়ে থাকে ?
জয় দেখছে বাংলাদেশ। ঢাকার বাইরে এই প্রথম যাচ্ছে সে। মা যে বলত সবুজ এক দেশ। সত্যি সবুজ দেশ সেটা অনুভব করে জয়। এই শীতকালেও গাছগুলো সম্পূর্ণ ন্যাড়া নয়, গাছে সবুজ পাতা। বরফে সাদা নয় প্রকৃতি। মাঝে মাঝে হলুদ নীল ফুলে ছাওয়া ক্ষেত সরিষা, তিসির ফুল। রাস্তার দুপাশে জমি, জল, নৌকা দেখতে ভালোলাগে জয়ের।
লিমা আর তাতাই গল্প করে যাচ্ছে অবিরাম। ভালো লাগছে আবেদিন আহমেদ আর মিসেস আহমেদের।
নতুন ঘর উঠিয়েছেন আবেদিন আহমেদ বাড়িতে। পুকুর পাড়ে বাঁধান সিঁড়ি। চারপাশে দেয়াল অনেক পরিচ্ছন্ন আর ছিমছাম। শুকুর আলি আর তার বউ সব গোছগাছ করে রেখেছে। এছাড়া ঢাকা থেকে দুইজন কাজের লোক আগেই পাঠিয়ে দিয়েছেন। বাড়িঘর ঠিকঠাক করে রান্নাবান্নার জন্য। উনি প্রায়ই একা গ্রামের বাড়িতে দু-চার দিন বা এক সপ্তাহের জন্য এসে থাকেন কিন্তু পরিবারের সবাইকে নিয়ে এইবার প্রথম অনেক বছর বাদে। তাছাড়া অন্য মেহমান আসবেন তাই আয়োজন বেশ ভালোমতন করেছেন।
বাড়ি এসে সবাই এত অবাক, এ যে বিশাল পরিবর্তন। মিসেস আবেদিনও ভাবেননি স্বামী এত সুন্দর করে ফেলেছেন বাড়িঘর সব। শ্বশুর শাশুড়ির আমলের টিনের ঘরখানা আরো ঝকঝকে হয়েছে। এছাড়া পিছনে বাংলো টাইপের নতুন বাড়ি আধুনিক সব সুবিধাসহ। অনেক রুম। মাঝখানে সবুজ ঘাসের লন। একপাশে গার্ডেন চেয়ার টেবিল ছাতা সাজানো, দোলনা ঝুলছে, গোলাপের ঝাড়, পুকুরপাড় পর্যন্ত যেতে অনেক গাছের সারি। বাঁধানো সিঁড়ি নেমে গেছে, টলটলে জল, মাছ সাঁতার কাটছে। তাতাই হাততালি দিয়ে বলে,
মামা এত অনেক সুন্দর, ঢাকার বাসার চেয়ে ভালো লাগছে।
ঠিক তাই। এত কিছু কবে করলে? আমাকেও দেখাওনি কখনো।
তোমরা ঢাকা ছেড়ে নড়তেই চাও না। লিমা আর তাতাই হাত ধরে সারা বাড়ি এক দৌড়ে ঘুরে দেখে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে লনের চেয়ারে বসে তাতাই বলল,
এবার আমি গাছের ফল খাব।
এই যে আপা ডাবের পানি খাও আগে। শুকুর আলি সবাইকে ডাবের পানি এগিয়ে দেয়।
খুব সুন্দর। আমি খুব এনজয় করছি, জয় আনন্দ প্রকাশ করে বলে।
দুদিন ধরে খুব মজা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা সারা গ্রাম। গ্রামের লোকজন ভিড় করে আসছে ওদের দেখতে।
সাজিদ তাতাই আর জয়কে নিয়ে নদীর ধারে একটা জায়গায় এসে বসে। এইখানে তোমার মামা বসেছিল তাতাই আর আমি এই মেঠো পথ ধরে গান করতে করতে হেঁটে আসছিলাম। উনি আমার গান শুনে আমাকে থামালেন। এইখানে বসে আমি গান শুনালাম অনেক। আমাকে বললেন যাবে আমার সাথে ?
এখনো আমার কানে বাজে কথাটা। আবেগপ্রবণ হয়ে কথা বলে যায় সাজিদ।
লিমা প্রথম দিনের ছোটাছুটির পর একটু চুপচাপ হয়ে গেছে। ওর মনে হয় ক্লান্ত লাগছে। আর গ্রামের মানুষের সারাক্ষণ ঘিরে থাকাটা ও পছন্দ করছে না। তাই দরজা লাগিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে রয়েছে। তাতাই ঘুরে ঘুরে আসছে দেখে, লিমা তাতাইকে বলে দিয়েছে তুই মজা করে ঘুরে বেড়া। আমার জন্য চিন্তা করিস না, আমি ঠিক আছি। একা থাকতে ভালোলাগছে।
মাঠের দিকে হাঁটতে হাঁটতে একদিন সাজিদকে জিজ্ঞাসা করল তাতাই,
– লিমাপার বিষয়ে তোমার ধারণা শুনতে চাই।
– চুপ করে থেকে সাজিদ বলে,
– তাতাই আমি যদি এখন বলি, তোকে আমি ভালোবাসি ব্যাপারটা তুই কীভাবে নিবি?
– হুম, বুঝতে পারলাম কিন্তু সে কি সত্যি তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে ?
– মনে হয় না, ভালোবাসা বিষয়টা ওর কাছে পরিষ্কার না। ও শারীরিকভাবে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল, সে আহŸান আমাকে করেছিল বারবার। হাতের কাছে আমি ছিলাম, আমার নাম ধাম এসবই ওকে আকর্ষণ করছিল হয়তোবা। অথবা আরেকটা কারণ হতে পারে, আমাকে অন্য কেউ পছন্দ করে এটা সে মেনে নিতে পারছিল না, জ্যালাস হয়ে পড়ছিল। তাই ওদের দেখাতে চাইছিল যে আমি ওর হয়ে আছি।
– তুমি কি ওকে ভালোবাসতে পারো না কোনোভাবেই?
– ওকে আমি ভালোবাসি অনেক, ও আমার বোন তোর মতন।
তাতাই আর কিছু বলে না। সাজিদ ভাই অনেক ভালো।
সমস্যা লিমাপার। ওকে ঠিক করতে হবে। নিজেকে নষ্ট করার সব প্রচেষ্টা চালিয়েছে, কেন ভালো হতে পারল না?
মামার অনুষ্ঠানের লোক কাল সকালে পৌঁছাবে খবর দিয়েছে। আজ সকালে টেলিফোন পেয়ে মামা খুব খুশি। এই ক’দিন ভিতরে একটু টেনশন ছিল হয়তোবা যদিও হাসিখুশি ভাব করছিলেন তবে আজকের উচ্ছ¡াসটা একটু বেশি। মামা বললেন চলো আজ সবাই মিলে গ্রামের ভিতর চক্কর দেই, নদীর দিকে গিয়েছো তোমরা ?
যাওয়া হয়েছে, তাতে কি আবার যাবো।
বিকালে সবাই হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের অনেক দূরে ক্ষেত পেরিয়ে এলো। মনে হয় যেন তেপান্তরের মাঠ ধরে হাঁটছে। সূর্যটা বিরাট সোনার থালার মতন নেমে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে। নীড়ে ফেরা পাখি উড়ছে। মৃদুু ঠাণ্ডা হওয়ায় কথার খই ফুটছে ওদের মুখে। তাতাইর ভীষণ ভালো লাগছে। জয় বারবার বলছে, আই এনজয় এ লট, বিউটিফুল! হঠাৎ মামা এক জায়গায় থেমে বলেন,
– সাজিদ এই জায়গাটা চেনো ?
– সাজিদ মাথা নাড়তে নাড়তে বলে, এইখানে কত সময় কেটেছে কেমনে ভুলে যাই?
– খোলা মাঠের এতো জায়গা দেখিয়ে মামা বলেন,
আমার মনে হয় এখানে একটা ঘর বানিয়ে দিলে ভালো হয়।
– কি দরকার, সাজিদ আপত্তি করে।
ফিরার পথে ওরা দেখে একটি ষোল-সতের বছরের গ্রামের মেয়ের সাথে একটি বিদেশি লোক আর একজন শহুরে মহিলা হাঁটছে। তাদের পেছনে পেছনে একজন গ্রামের মহিলা যাচ্ছে। ছবিটা কেমন অন্যরকম মনে হলো। সবাই একসাথে চোখ মেলে ওদের দেখছে। ওরা এদিকেই আসছে। মুখোমুখি হলে দু’দলই থেমে গেল। আবেদিন আহমেদ সালাম, পরিচয় দিয়ে ওদের পরিচয় জানতে চাইলেন। বিদেশি লোকটিকে দেখিয়ে মহিলা বললেন,
উনি আমার স্বামী স্যামুয়েল এন্ডারসন, আমি জিনিয়া এন্ডারসন, আমাদের এ্যাডপটেড মেয়ে আয়শা। উনি আয়শার মা। ওরা আজই ঢাকা থেকে এসেছেন, আয়শাকে নিয়ে ওরা ঘুরবেন বাংলাদেশ। আজই ফিরে যাবেন। ওদের পরিচয় এবং কর্ম শুনে সবাই চমৎকৃত।
আবেদিন আহমেদ খুশি হয়ে বলেন, আমার গ্রামের একটা মেয়েকে আপনারা সাহায্য করছেন কোনো দূর বিদেশে বসে, আমার খুব ভালো লাগছে আপনাদের সাথে পরিচিত হতে পেরে। খুব তাড়া না থাকলে থাকুন না আজ আমাদের বাড়ি। জিনিয়া একটু সন্দেহের চোখে তাকায়, কিন্তু স্যামুয়েল ভদ্রলোক খুব অমায়িক হাসি-খুশি। তিনি বলেন, আমি তো বাংলাদেশ জানতে এসেছি। মেয়েকে দেখতে এসেছি। আমার ওয়াইফ অনেক আগে কানাডায় চলে গেছে। দেশের অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে, ও অনেক কিছুই চিনে না। আপনাদের সাথে কথা বলে আমরা কিছু গাইড লাইন পেতে পারি।
আমরা আপনাদের পুরো বাংলাদেশ দেখাতে পারব। আমরাও ঢাকা থেকে বেড়াতে এসেছি। এটা যদিও আমার গ্রাম, এখানে থাকা হয় না। সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে মামা বলেন,
চলেন আজ থাকেন আমাদের সাথে।
আয়শার মা বলে, এরা মানুষ ভালা। আফনারা না এই গ্রামে থাকতে চাইছিলেন, আলাহ আফনার ইচ্ছা পুরা করছে। এদের বাড়িত থাকুইন আফা। আমি তাইলে আয়শারে লইয়া যাই। কাইল আইমু।
আবেদিন আহমেদ বলেন, যাবেন কেন আপনিও আমাদের মেহমান আজ, আপনিও আমাদের সাথে থাকুন মেয়ে নিয়ে। বিশাল দল বাড়ির পথে রওনা হয়।
তাতাই টুকটুক করে আয়শার সাথে কথা বলে। ওর মনে হয়, ব্রান্ডার মতন একটা উজ্জ্বল মেয়ে আয়শা। তবে ব্রান্ডার মতন চঞ্চল না।
টরন্টো, কানাডা
