
আশির দশকের গোড়ার দিকে ফোর ফাইভে পড়ি। রেডিওতে ‘বিজ্ঞাপন তরঙ্গ’ শুরু হলেই অপেক্ষায় থাকতাম কখন ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’ গানটি হবে। অপেক্ষার প্রহর খুউব বেশি দীর্ঘ হতোনা। এতো বেশি অনুরোধ থাকতো যে শাহবাগের রেডিও স্টেশনকে প্রায় প্রতিদিনই গানটি বাজাতে হতো। রেডিও বাংলাদেশের সবচে’ বড় ট্রান্সমিশন যন্ত্রটি তখন শাহবাগে। কোনো পরিসংখ্যান আছে কিনা জানা নেই। থাকলে হয়তো অফিসিয়াল প্রচারে এ গানটি হতো শীর্ষ রেকর্ড। স্মৃতি থেকে বলতে পারি ‘প্রাণ সজনী’ মুক্তির পরবর্ত্তী এক বছর এ গানটি কয়েক শতবার বেজেছে রেডিওতে। দয়ালের ডাক কি, চলতি পথে থামা কি, এসব না বুঝলেও আমার বয়সি শিশুরা মুখস্হ করে ফেলেছিলো সে গান। এক দঙ্গল দূরন্ত বালকের সাথে স্কুলে আমিও কোরাস গেয়েছি কতো!
এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন তখন দানা বাঁধছে। রাস্তায় জলপাই রঙের গাড়ির আনাগোনা। এরকম জলপাই জমানায় আমার ফুপাতো ভাই ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফিজিক্সে। ক্যালেন্ডারের পাতায় বড় করে লেখা ১৯৮৩। আমি শেরে বাংলা নগর গভঃ বয়েজে নিচের ক্লাশে পড়ি। হঠাৎ ভাই এসে বললেন, আমাদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে এন্ড্রু কিশোর আসবেন। জাসদ ছাত্রলীগ নবীনদের বরণ করবে টিএসসি অডিটোরিয়ামে। অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী প্রধান অতিথি। অনু্ষ্ঠানের শেষে আরণ্যক নাট্যগোষ্ঠির ‘সাত পুরুষের ঋন’ মঞ্চস্হ হবে। এতোসব তথ্যের মধ্যে আমার কানে গেলো কেবল এন্ড্রু কিশোরের নাম। ভাইকে বললাম,
আমি যাবো। আমাকে সাথে নিবা? এন্ড্রু কিশোরকে সামনে থেকে দেখবো।
না, তুই ছোটো মানুষ। ইউনিভার্সিটিতে মারামারি হয়।
মারামারিতো স্টেডিয়ামেও হয়। তবুতো আবাহনী মোহামেডানের খেলা মাঠে গিয়ে দেখি।
ইউনিভার্সিটিতে গোলাগুলিও হয়।
তাতে কী?
ভাই কিছুতেই নেবেনা আমাকে। কান্না জুড়ে দিলাম। মা এসে জানতে চাইলেন কাঁদছি কেনো।
এমন সময় আমাকে বাঁচিয়ে দিলো রেডিওতে বেজে ওঠা একটি গান। ‘কেউ কারো নয়’ ছবিতে গাওয়া,
ভালোবেসে গেলাম শুধু
ভালোবাসা পেলাম না…..
ব্যাস…. মা যেই শুনলেন এন্ড্রু কিশোরকে দেখতে চাইছি, অমনি ভাইকে বললেন,
যাও বাবা, ওকে একটু নিয়ে যাও।
এভাবেই প্রথম দেখি জীবন্ত কিংবদন্তীকে। টিএসসির উপচে পড়া অডিটোরিয়ামে মাত্র চারটি গান গেয়ে নেমে যাচ্ছিলেন মঞ্চ থেকে। এপ্লাইড ফিজিক্সে পড়া পাড়ার বড় ভাই ইউসুফ ভাই শিল্পীর সামনে দু’হাত প্রশস্ত করে পথ আটকে ধরলেন। শিল্পী মঞ্চে ফিরে গাইলেন নতুন একটি গান।
ইউসুফ ভাই যখন এন্ড্রু কিশোরের হাতে হাত রেখে অনুরোধ করছিলেন, দর্শক সাড়িতে বসা ‘আমি’ নামক বালকটির কাছে তখন পৃথিবীর সবচে ভাগ্যবান ব্যাক্তির নাম ইউসুফ ভুঁইয়া।
আহ্ এরকম সেলিব্রেটিকে আমিও যদি ছুঁয়ে দেখতে পেতাম।!!
হুম…. ছেলেবেলার সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছিলো। মন্ট্রিয়লে জমপেশ আড্ডা হয়েছিলো প্রিয় এন্ড্রুদার সাথে। আড্ডার শিরোমনি ছিলেন আরেক কিংবদন্তী সাবিনা ইয়াসমিন। (আগের একটি পোস্টে লিখেছিলাম। কেউ চাইলে আমার ওয়ালে গিয়ে পড়তে পারেন)। সাথে ছিলেন ড্রাম লিজেন্ড লিটন ডি-কস্টা। গানের প্রতি এন্ড্রূদার ভালোবাসা দেখে সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলাম। সাবিনা ইয়াসমিন তখন সবেমাত্র ক্যান্সার থেকে ফিরেছেন।
কথা বলছিলাম সাবিনা আপার শারীরিক সুস্হতা নিয়ে। এন্ড্রুদা শুধু সুস্হতা নয়, বলছিলেন গান গাইতে হবে। গাইতেই হবে। সাবিনা আপার গান ছাড়া বাংলার মানুষ বাঁচবে না।
আসলেই এ রঙিন দুনিয়ায় গান ছাড়া মানুষ বাঁচবে কি করে? কতো রঙের মানুষ যে দুনিয়াতে আছে সেটাও প্রথম বুঝতে শিখি এন্ড্রু কিশোরের গানে।
কতো রঙ্গ জানো রে
মানুষ,
কতো রঙ্গ জানো।
তুমি
এই ভালো এই মন্দ
ক্ষণে হাসো ক্ষণে কান্দো
হায় রে এ কী দ্বন্দ্ব।
ইউটিউব, ফেসবুক, সেলফোন দূরে থাক, রঙিন টিভিও খুব বেশি মানুষের ছিলোনা। আমরা বেড়ে উঠেছি রেডিওতে তাঁর গান শুনতে শুনতে। বুকের ভেতর ভালোবাসা নামের বস্তুটিও বেড়ে উঠেছে আমাদের সাথে সাথে।
“আমার বুকের মধ্যেখানে
মন যেখানে
হৃদয় যেখানে…….”
কিংবা,
“আমার সারা দেহ
খেয়োগো মাটি,
এ চোখ দুটো মাটি খেয়োনা।
আমি মরে গেলেও
তারে দেখার সাধ
মিটবে না গো
মিটবে না……..”
এন্ড্রুদা এ মূহুর্তে টরন্টো এলাকতেই আছেন। গেলো শনিবার সুরের ঝংকার তুলেছিলেন টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল প্যাভিলিয়নে। ‘বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালে’ আসা হাজার দর্শককে বুকভরা আনন্দ দিয়েছেন। কাল মাতাবেন টরন্টোর অদূরে হ্যামিল্টন। বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব হ্যামিল্টন (Bangladesh Association of Hamilton) আয়োজিত বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। যারা টরন্টৌর অনুষ্ঠান মিস করেছেন, তারা দলে বলে চলে যেতে পারেন হ্যামিল্টন।
অনেক অনেক শুভকামনা হ্যামিল্টন অনুষ্ঠানের জন্য।।
পুনশ্চে এসে চুপি চুপি বলে রাখি। এখনো মাঝে মাঝে রাতে একটা গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ি। ‘মান সম্মান’ ছবিতে এ গানে ঠোঁট মিলিয়েছিলেন নায়ক আলমগীর।
“কারে বলে ভালোবাসা
কারে বলে প্রেম।
মিলন বিরহে
আমি জ্বাললেম,
লোকে বলে ভালোবাসা
আমি বলি ভাঙা বাসা….
তাকে হারালেম
তাকে হারালেম……”
