
আশির দশকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশী এক অধ্যাপক কানাডায় এলেন। মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞানে পিএইচ.ডি করবেন বলে। বিবাহ ব্যবস্থা এবং পারিবারিক সম্পর্কের উপর পাঁচ বছর ধরে অনেক গবেষণা করলেন। অভিসন্দর্ভ পত্র জমা দিতে খানিকটা দেরী হলো। ডিফেন্সটাও ছিলো নড়বড়ে। তবু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তারা তাঁকে ঠিকঠাক পিএইচ.ডি দিয়ে দিলেন। এবার দেশে ফেরার পালা। কিন্তু মাস্টার মশাই গোঁ ধরলেন তিনি দেশে যাবেন না। কারণ তদ্দিনে তিনি বুঝে গেছেন মন্ট্রিয়লে থাকতে গেলে কোনো রোজগার লাগেনা। কুইবেকের দয়ালু সরকারের ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্ট যতদিন আছে ততদিন ফেয়ারওয়েল না নিলেও চলবে। তিনি যথারীতি কানাডায় থেকে গেলেন।
এদিকে বাংলাদেশের সামরিক সরকার চোটপাট শুরু করেছে। যাঁরা বৃত্তি নিয়ে বাইরে গেছেন তাঁদের ডিগ্রী শেষে অবিলম্বে কাজে যোগদান করতে হবে। নইলে চাকরি নট। বেচারা অধ্যাপক দেশের চাকরি খোয়ালেন। এতে অবশ্য তেমন দুঃখ পেলেন না। দুঃখ পেলেন অন্য জায়গায়। যখন বাংলাদেশ থেকে আরেক অধ্যাপক বন্ধু তাঁকে ফোন দিলেন।
বন্ধু, কেমন আছো ?
ভালো, খুউব ভালো।
কি করছো এখন? মানে চাকরি বাকরি কিছু….?
কিছু করিনা, বসে খাই।
বল কি? সংসার চলে?
আপাতত চলে যাচ্ছে।
থাকো কোথায়?
মন্ট্রিয়ল।
সে তো বুঝলাম, মন্ট্রিয়লের কোথায়?
পার্কে।
মাই গড, পার্কে থাকো? …… একটা বাসাও নিতে পারোনি?
না, পার্ক মানে পার্ক-এক্সটেনশন।
ওরে বাবা, মূল পার্কেও জায়গা পাওনি। শেষমেষ এক্সটেনশনে থাকতে দিলো।
অধ্যাপক মশাই এবার রেগে গিয়ে বললেন, “আরে ভাই, এটা একটা জায়গার নাম। পার্ক-এক্সটেনশন। পাবলিক সংক্ষেপে বলে পার্ক। মন্ট্রিয়লের মধ্যভাগে একটা নিম্নবিত্ত পাড়া। ঢাকায় যেমন শেওড়াপাড়া কাজীপাড়া যাত্রাবাড়ি ইত্যাদি”। বাংলাদেশী অধ্যাপক বন্ধুটি তবু থামেন না। বলেই চললেন, ‘….. খামোখা বন্ধু ঠান্ডার দেশে থেকে গেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটা চেষ্টা করলে এখনো………..’
এবার আর সহ্য হলো না। লাইনটা কেটে দিলেন।
অধ্যাপক মশাই এখন মন্ট্রিয়লের একটি কলেজে পড়ান। পার্ক ছেড়েছেন বহুকাল। ছাড়ার আগে দুটো সিক্স-প্লেক্স আর একটা ডু-প্লেক্স বাড়ি কিনে গেছেন। এখন ভাড়া দেন।
গল্পটা শোনা। যতটুকু শোনা তারচে’ হয়তো বাড়িয়ে বলা।
তবে পার্ক নাম নিয়ে বিভ্রান্তি কিন্তু সম্পূর্ণ সত্য। ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ এলাকাটি মন্ট্রিয়ল নামক ত্রিভুজের ভরকেন্দ্রে অবস্থিত। ডাউনটাউন সংযুক্ত বিখ্যাত সড়ক ‘পার্ক এভিনিউ’র বর্ধিতাংশে এর অবস্থানের কারণে নাম দেয়া হয়েছিলো পার্ক-এক্সটেনশন। পাতালরেল চালু হলে এখানকার মেট্রো স্টেশনটির নামকরণ করা হয় ‘পার্ক’।
কানাডায় বাঙালিদের আনুষ্ঠানিক গোড়া পত্তন হয় এই পার্ক-এক্সটেনশনে। পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে কানাডায় এসেছিলেন এমন বাঙালির সংখ্যা নেহায়েত মন্দ নয়। স্বাধীনতা উত্তরকালে হাজারো বাঙালি এসে বসতি গেড়েছে এখানে। কিছুটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে অন্য এলাকায়। কিন্তু বানিজ্যিক, সাংস্কৃতিক এবং রসনাবিলাসের কারণে পার্কের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ কখনই সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশী গ্রোসারী, বুটিক শপ, পত্রিকা অফিস সবই এ এলাকায়।
নব্বুই দশকের মাঝামাঝি সময়ে কুইবেকের বিচ্ছিন্নতাবাদ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। রাজনৈতিক উত্তাপে প্রচুর বাঙালি প্রায় উদ্বাস্ত হয়ে মন্ট্রিয়ল থেকে টরন্টো যায়। শুরু হয় একই দেশে বাংলাদেশী কানাডিয়ানদের নতুন নগরযাত্রা। মজার ব্যাপার এ যাত্রাতেও বাঙালি ‘পার্ক’ ছাড়তে পারেনি। টরন্টো গিয়ে নতুন বসতি গড়ে তোলে ডাউনটাউনের রিজেন্টপার্ক এলাকায়। একই সময়ে নিউ ইয়র্ক ও শিকাগো থেকে আসা শত শত বাঙালিও বসত গড়ে রিজেন্টপার্কে। সেখানকার সরকারী বাড়িগুলোর প্রায় অর্ধেকটাই বাঙালিদের দখলে।
রিজেন্টপার্ক ভরে উঠলে বাঙালি নতুন পার্কের সন্ধান করে। পেয়েও যায়। একাবিংশ শতকের ঊষালগ্নে তারা দখল করে ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’ সাবওয়ে স্টেশন। সাবওয়ে সংলগ্ন ক্রিসেন্ট টাউন, টিসডেল, ফার্মেসি এভেনিউ ও মেসি স্কয়ারের বিশালাকার হাইরাইজ ভবনগুলিতে হাজারো বাঙালির বসবাস। ভিক্টোরিয়া পার্ক সাবওয়ে প্লাটফর্মে বাংলা ভাষায় শোভা পায় যাত্রী সম্ভাষণ।
অগ্রবীজঃ
পার্ক দিয়ে শুরু বাঙালির জয়যাত্রা পার্কে থেমে থাকেনি । ছড়িয়ে গেছে রাজপথে, ময়দানে, সিটি হলে। শিগগির কাউকে দেখা যেতে পারে টরন্টোর ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে। প্রাদেশিক ও ফেডারেল নির্বাচনেও বাংলাদেশী-কানাডিয়ানরা পিছিয়ে নেই। ইতোমধ্যে বেশ ক’জন নির্বাচন করেছেন। এবারো করবেন। আগামীতে নিশ্চয়ই কেউ নির্বাচিতও হয়ে যাবেন।
পুরো কানাডাই একদিন পার্কে পরিনত হোকনা! এতে কি কারো আপত্তি আছে?
