
প্রাচীন বাংলায় উৎসবের অন্ত ছিলোনা। এমনকি অখন্ড বঙ্গভূমিতে পরিনত হওয়ার আগে গৌড়, বরেন্দ্রী, রাঢ়, সমতট, হরিকেল বা চন্দ্রদ্বীপের অধিবাসীরা বছরব্যাপী উৎসবে মেতে থাকতো। বেশিরভাগ উৎসবেরই উৎস ছিলো নানান রকম ধর্মীয় বিশ্বাস। সামগ্রিকভাবে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন দেবদেবীকে খুশি করতে আয়োজন করা হতো এসব উৎসবের। স্থানীয় রাজা, মোড়ল বা ধনাঢ্য ব্যক্তিরা পারিবারিক কিংবা উম্মুক্ত পূজা অর্চনার আয়োজন করতেন। বিভিন্ন দেবদেবীর পূজাকে কেন্দ্র করে উৎসব হলেও কালক্রমে দূর্গাপূজা হয়ে ওঠে বাঙালির বৃহত্তম আনন্দ উৎসব। অষ্টক শতকে পাল রাজাদের আগমনের সাথে সাথে বাংলায় ব্যাপকভাবে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটে। এসময় বৌদ্ধ পূর্ণিমায় রাজ খরচায় বৃহৎ আকারে উৎসব করা হয়।
দ্বাদশ শতক পর্যন্ত দাপটের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের চর্চা ও উৎসব পালিত হয়েছে। মুসলমানদের ভারত বিজয়ের আগেই আরব বণিকেরা বাংলার হিন্দু ও বৌদ্ধ সমাজকে ধর্মীয়ভাবে প্রভাবিত করতে শুরু করে। ইসলাম আগমনের সাথে সাথেই উৎসবের ধরণ পরিবর্তিত হতে থাকে। পুত্তলিকা বা মুর্তিবিহীন উৎসব বিমূর্ত রূপলাভ করে। স্বাভাবিকভাবেই উৎসবের মাত্রা ক্ষীন হয়ে আসে। রোজার শেষে ঈদ-উল-ফিতর এবং আরবি জিলহজ্ব মাসে ঈদ-উল-আজহা সীমিত পরিসরে বাঙালি মুসলমানের উৎসবে পরিণত হয়। শুরুতে ঈদের উৎসব সীমিত আকারে উদযাপনের কারণ হিসাবে দুটো বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। এক. দরিদ্র হিন্দু শুদ্র শ্রেণী যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলো তাদের আর্থিক সঙ্গতি ছিলোনা পূর্ণ মাত্রার উৎসব আয়োজনের। দুই. নতুন ধর্মে দীক্ষিত অপূর্ন জ্ঞানের নব্য ফতোয়াবাজদের সৃষ্ট ধর্মীয় বাধা। ঈদের দিন নামাজ, কোলাকুলি আর অপর মুসলমানের বাড়িতে অন্নগ্রহণ ছাড়া সবই ছিলো শরীয়ত বিরোধী।
বাঙালি মহিলাদের ঈদের আনন্দ ছিলো কেবল রন্ধনশালা ঘিরে। বেপর্দা ঘুরে বেড়ানো ছিলো মহা অপরাধ। আনন্দ ঘাটতির কারণে হোক আর সংখ্যালঘুতার অজুহাতে হোক মূলধারার বাঙালি সংস্কৃতিতে ঠাঁই পেতে ঈদকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বহু বছর। এখন অব্দি অনেক পন্ডিত ব্যক্তি ঈদকে মূলধারার বাঙালি সংস্কৃতি মনে করেন না। তারা এটিকে কখনো আরব্য সংস্কৃতি কখনো কেবল মুসলমান সংস্কৃতি মনে করেন। বাঙালির উৎসবের তালিকায় অনেক ছোটখাটো উৎসব লেখা থাকলেও তারা এড়িয়ে যান ঈদকে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও কোটি বাঙালির উদযাপিত ঈদ বিষয়ে কিছু লিখেছেন বা ভেবেছেন এমন কিছু খুঁজে পাইনি। টরন্টো প্রবাসি কথা সাহিত্যিক ও রবীন্দ্র গবেষক শ্রদ্ধেয় সাদ কামালীর কাছে একবার অপ্রাসঙ্গিকভাবে জানতে চেয়েছিলাম ঈদ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কোনো ভাবনা ছিলো কি না। উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন, ঈদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিশেষ কোনো ভাবনা চোখে পড়েনি। তবে মহানবীর (সাঃ) জন্ম ও মৃত্যুদিন ১২ রবিউল আউয়ালে তিনি বাণী দিতেন। সাদ কামালী অবশ্য এও জানালেন, রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন মুসলিম লেখকদের বারবার তাগাদা দিতেন তাদের সমাজ জীবন পারিবারিক জীবন নিয়ে লেখার জন্য।
এটা আসলেই সত্য যে তৎকালীন হিন্দু সমাজে মুসলমানদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কে স্বচ্ছ কোনো ধারণা ছিলোনা। মুসলমান লেখকেরা মুসলিম সমাজের দর্শন ও সংস্কৃতি তুলে ধরলে ঈদসহ অন্যান্য উৎসবগুলো সহজেই বাঙালি সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারতো। এর একটা জ্বলন্ত উদাহরণ রেখে গেছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর রচিত ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি বাংলা সংস্কৃতিতে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। ঈদকে বরণ করতে এ গানটি জাতীয় রূপ লাভ করেছে।
দুঃখজনকভাবে এটাও সত্য যে, ঈদ নিয়ে বাংলা সংস্কৃতিতে আর কোনো কবিতা বা গান এমন দাপট ছড়াতে পারেনি। শুরুতে মোল্লাতন্ত্রের বাধার মুখে ঈদের আনন্দ যেমন ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ ছিলো ষাটের দশক পর্যন্ত সে অবস্থার বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ঈদের দিন বিকালে লাঠি খেলা, হাডুডু বা ফুটবল খেলার আয়োজন ছিলো কিছুটা ব্যতিক্রম। তবে বিরাট রকমের পরিবর্তন এলো ঈদের দিন বাংলা সিনেমা মুক্তির ঘোষণায়। মৌলবাদের রক্তচক্ষু ডিঙিয়ে এটি ছিলো নীরব সাংস্কৃতিক বিপ্লব।
এরই ধারাবাহিকতায় ঈদ উপলক্ষে টিভিতে বাংলা সিনেমা প্রদর্শন, বিশেষ নাটক ও ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান বাংলা সংস্কৃতিতে বিরাট পরিবর্তন আনে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে উভয় ঈদে ‘আনন্দ মেলা’ অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিলো সারা বছরের অপেক্ষার ফসল। আর এখনতো ঈদ মানে বাংলা চ্যানেলে সাতদিনের অনুষ্ঠান। ফ্যাশন হাউজগুলোও সম্পুর্ন ঈদ নির্ভর। ঈদ ছাড়া নতুন ডিজাইনের পোশাক বাজারজাতকরণ হয়না। বাংলা সংস্কৃতির অনেক এখন কিছুই ঈদ কেন্দ্রিক।
তবু ধর্মীয় মৌলবাদের কবলে পরে অনেকের কাছে ঈদ কেবল ধর্মাচার। ধর্মের বাইরে যেনো ঈদের আর কোনো রূপ নেই। আবার “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” শ্লোগানটি যারা ধারণ করেন তাদের ভেতরেও অনেকে ঈদকে সার্বজনীন রূপ দিতে কুন্ঠিত হন। কোটি বাঙালির আনন্দোৎসব ঈদকে মূলধারার বাঙালি সংস্কৃতি ভাবতে দ্বিধা বোধ করেন। ঈদ মোবারক বাংলা শব্দ না হওয়ায় সংস্কৃতিবানেরা(!) একে অপসংস্কৃতি মনে করেন। অথচ কতো বিদেশি শব্দ আমাদের সংস্কৃতিতে ঢুকে অবচেতন ভাবে আমাদের হয়ে গেছে। এটিও এখন আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ।
টরন্টো, কানাডা
