এলসিবিওর তাক থেকে ক্রাউন রয়্যাল নামিয়ে ফেলা অত সহজ নয়

ডিয়েগোর সিদ্ধান্ত আসে এমন এক সময় যখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের হুমকি দিচ্ছিলেন

অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের একটি প্রতীকী ভঙ্গি হুইস্কির বোতল থেকে ঢেলে দেওয়া শুরুতে যতটা আবেগঘন প্রতিবাদ বলে মনে হয়েছিল, এখন তা রূপ নিয়েছে একটি জটিল ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক–অর্থনৈতিক বিতর্কে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বখ্যাত কানাডিয়ান হুইস্কি ব্র্যান্ড ক্রাউন রয়্যাল এবং তার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান, যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক সংস্থা ডিয়েগো। বিষয়টি শুধু একটি কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি কানাডার প্রাদেশিক রাজনীতি, কর্মসংস্থান, বহুজাতিক বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি মুক্ত বাণিজ্যের ধারণাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এই বিতর্কের শুরু হয় গত গ্রীষ্মে, অন্টারিওতে। ডিয়েগো ঘোষণা দেয়, তারা অন্টারিওর অ্যামহার্স্টবার্গে অবস্থিত ক্রাউন রয়্যালের বোটলিং কারখানা বন্ধ করে দেবে এবং কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেবে। এই সিদ্ধান্তে প্রায় ২০০ জন শ্রমিকের চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। বিষয়টি দ্রুতই অন্টারিওর সীমানা ছাড়িয়ে ম্যানিটোবা ও কুইবেক পর্যন্ত রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

- Advertisement -

ডিয়েগোর সিদ্ধান্ত আসে এমন এক সময়, যখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের হুমকি দিচ্ছিলেন। যদিও ডিয়েগোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক চাপের কারণে নয়; বরং তাদের সরবরাহ নেটওয়ার্কের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ হিসেবেই কারখানা স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ডিয়েগোর এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড। জনসমক্ষে এক অনুষ্ঠানে তিনি ক্রাউন রয়্যালের বোতল থেকে হুইস্কি ঢেলে ফেলে নিজের অসন্তোষের বার্তা দেন। অনেকের কাছে এটি ছিল একটি নাটকীয় প্রতিবাদ, আবার কারও চোখে এটি ছিল বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে স্থানীয় কর্মসংস্থান রক্ষার প্রতীকী অবস্থান।

সাম্প্রতিক সময়ে ফোর্ডের বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কারখানা বন্ধ হওয়ার পর যদি ডিয়েগো অন্টারিওতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক ধরে রাখার কোনও গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা হাজির না করে, তাহলে আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে এলসিবিও (লিকার কন্ট্রোল বোর্ড অব অন্টারিও)-এর তাক থেকে ক্রাউন রয়্যাল সরিয়ে নেওয়া হবে।

ফোর্ড বলেন, “অন্টারিওতে এমন অনেক দারুণ হুইস্কি প্রস্তুতকারক আছে, যারা এখানে মানুষকে চাকরি দিতে আগ্রহী। আমাদের উচিত তাদের দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং তাদের সহায়তা করা।”

ক্রাউন রয়্যালের ইতিহাস কানাডার সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে। ১৯৩৯ সালে তৎকালীন সিগ্রাম কোম্পানির প্রেসিডেন্ট এডগার ব্রনফম্যান এই হুইস্কির সূচনা করেন। উদ্দেশ্য ছিল রাজা ষষ্ঠ জর্জ এবং রানী এলিজাবেথের কানাডা সফরকে স্মরণীয় করে রাখা। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি একটি আইকনিক কানাডিয়ান ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।

১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এর বিক্রি শুরু হয় এবং জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০০০ সালে সিগ্রামের বেভারেজ শাখা বিক্রি হয়ে যায় ডিয়েগোর হাতে, যার মধ্যে ক্রাউন রয়্যালও অন্তর্ভুক্ত ছিল। মালিকানা বদলালেও ব্র্যান্ডের সাফল্য থেমে থাকেনি। ২০১৫ সালে এটি ‘হুইস্কি অব দ্য ইয়ার’ খেতাবে ভূষিত হয়, যা এর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে মুক্ত বাণিজ্য ও বৈশ্বিকায়নের বাস্তবতা সামনে এনেছে। একদিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক স্বাধীনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির যুক্তি, অন্যদিকে স্থানীয় কর্মসংস্থান রক্ষা এবং জাতীয় ব্র্যান্ডের মর্যাদা এই দুইয়ের সংঘাতই এখন অন্টারিও–ডিয়েগো দ্বন্দ্বের মূল সুর।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি এলসিবিও সত্যিই ক্রাউন রয়্যাল বিক্রি বন্ধ করে দেয়, তবে তা শুধু একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হবে না; বরং এটি কানাডার প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে বহুজাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি শক্ত বার্তাও বহন করবে। একই সঙ্গে এটি মুক্ত বাণিজ্যের নীতির সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতার সংঘর্ষকেও স্পষ্ট করে তুলবে।

এখন দেখার বিষয়, ডিয়েগো শেষ পর্যন্ত কোনও সমঝোতার পথে হাঁটে কি না, নাকি ক্রাউন রয়্যাল একটি ঐতিহাসিক কানাডিয়ান ব্র্যান্ড অন্টারিওর দোকানের তাক থেকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার পথে এগোয়।

- Advertisement -

Read More

Recent