জাহানারা ইমাম স্মারকগ্রন্থ > নেপথ্য কাহিনি

২৬ জুন, ১৯৯৪। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় মিশিগানের ডেট্রয়েট নগরীর সাইনাই হাসপাতালের বেডে ৬৫ বছর বয়েসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক শহিদ জননী জাহানারা ইমাম। আমি তখন কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহবানে ‘মৌলবাদী ফতোয়াবাজ রাজাকারদের প্রতিরোধের জন্যে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে’ অংশ নিচ্ছি। সেই সমাবেশে, সন্ধ্যায়, জননেতা আফম মাহবুবুল হক তাঁর বক্তৃতায় বললেন—‘যে কোনো মুহূর্তে দুঃসংবাদ আসতে পারে। শহিদ জননী জাহানারা ইমাম মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন আমেরিকার একটি হাসপাতালে।’ শহিদ মিনারের পাদদেশে বসে থাকা আমি চমকে উঠেছিলাম। প্রার্থনা করেছিলাম—এমনটি যেনো না হয়। কোনো দুঃসংবাদ যেনো না আসে। কিন্তু আমার প্রার্থনা কাজে আসেনি। পরে সময় মিলিয়ে দেখেছি—সেদিনের সেই সন্ধ্যায় শহিদ মিনারে আফম মাহবুবুল হকের বক্তৃতার সময়টাতেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন জাহানারা ইমাম।

- Advertisement -

জুলাই ০৪, ১৯৯৪। আমেরিকা থেকে শহিদ জননী জাহানারা ইমামের মরদেহ বাংলাদেশে এলো। পরদিন ০৫ জুলাই শত-সহস্র শোকার্ত মানুষের ঢল নেমেছিলো কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। ওখানে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হয়েছিলো সব শ্রেণি সব পেশার সববয়েসী মানুষ। উপস্থিত ছিলাম আমিও। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। জাহানারা ইমামের কফিনে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। জাতীয় কবিতা পরিষদের পক্ষ থেকে ফুলের রিং নিয়ে এসেছেন মুহম্মদ সামাদ। তাঁর সঙ্গে আছেন কেবল একজন, সৈয়দ শামসুল হক। সামাদ ভাই আমাকেও অনুরোধ করলেন তাঁদের সঙ্গে থাকতে। আমিও শামিল হলাম। তখন কমিটিতে না থাকলেও শুরু থেকেই কবিতা পরিষদে সক্রিয় ছিলাম জোড়ালো ভাবেই। সুতরাং সাবেক সদস্য হিশেবে তাঁদের সঙ্গে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণে অংশ নেয়াই যায়। (দীর্ঘ লাইনে রিং নিয়ে এগোনো আমাদের ছবিটা পরবর্তীতে আমাকে দিয়েছিলেন আলোকচিত্রি পাভেল রহমান। স্মারকগ্রন্থে এই ছবিটাও আছে।) সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বিশাল জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। সহস্র মানুষের সঙ্গে জানাজায় শামিল হয়েছিলাম আমিও। জনসমূদ্রে রূপান্তরিত হয়েছিলো সেদিন, ঈদগাহ ময়দানটি।

তখন, পত্র-পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে অসংখ্য রচনা প্রকাশিত হচ্ছে প্রতিদিন। জাহানারা ইমামকে নিয়ে একটি স্মারকগ্রন্থের পরিকল্পনা এঁটে পত্রিকা থেকে লেখাগুলো সংগ্রহ করে রাখছি। আমার অনেক বইয়ের প্রকাশক আলমগীর রহমান। তাঁর দুটি প্রকাশনা সংস্থা। প্রতীক এবং অবসর। জিজ্ঞেস করলাম পরিকল্পিত স্মারকগ্রন্থটি প্রকাশ করতে তিনি আগ্রহী কি না। তিনি ভেবেচিন্তে কয়েকদিন পর জানাবেন বললেন। কিন্তু আমি তাঁকে ভাবার জন্যে কয়েকদিন দিতে রাজি হলাম না। বললাম—কালকের মধ্যেই জানাতে হবে। আগামীকাল আপনার ফোন না পেলে আমি অন্য কোনো প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলবো। স্মারকগ্রন্থটি আদৌ বিক্রি হবে কি হবে না এই নিয়ে খানিকটা দ্বিধায় ছিলেন তিনি। অবশ্য পরেরদিনই ফোন করে আমাকে জানিয়েছিলেন যে আমি যেনো এটা অন্য কাউকে না দিই। তিনিই হবেন প্রকাশক। তবে শর্ত থাকে যে—লেখকদের কাছ থেকে অনুমতি আমাকেই নিতে হবে এবং লেখকদের কোনো সম্মানী তিনি দিতে পারবেন না। আমি বললাম, তথাস্তু।(স্মারকগ্রন্থটি সম্পাদনা বাবদও আমি কোনো সম্মানী নিইনি।)

এরপর নেমে পড়লাম আমি—যাকে বলে কোমর বেঁধে নামা। ভোরের কাগজ, যায় যায় দিন, জনকণ্ঠ, আজকের কাগজ, চিন্তা, খবরের কাগজ, সময়, বাংলার বাণী, সংবাদ এবং প্রবাসী পত্রিকায় রচনাগুলো প্রকাশিত হয়েছিলো। লেখকদের কাছ থেকে অনুমতি চাইতে গিয়ে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলাম। মনে আছে, শওকত ওসমানের একটি কবিতা নিয়েছিলাম ভোরের কাগজ থেকে। স্মারকগ্রন্থে কবিতাটি ছাপার অনুমতি চেয়ে ফোন করেছিলাম তাঁকে। টানা পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে তিনি আমাকে প্রিন্টিং মিসটেক এবং তাঁর কবিতাটির যতিচিহ্ন বিষয়ে বলেই যাচ্ছিলেন। অসীম ধৈর্যের পরীক্ষা সেদিন দিতে হয়েছিলো আমাকে। অতঃপর ফাইনাল প্রুফটি তাঁকে দেখিয়ে নিতেও বলেছিলেন। কিন্তু আমি বিনয়ের সঙ্গে তাঁর দাবি পুরণে অসম্মতি জ্ঞাপন করে বলেছিলাম—সেরা একজন প্রফেশনাল প্রুফ রিডার এই সংকলনের প্রুফ রিডিং করছেন। আমার পক্ষে সম্ভব নয় লেখকদের কাছে গিয়ে গিয়ে তাঁদের দিয়ে প্রুফ রিডিং করানো। তাহলে এইরকম একটি সংকলন প্রকাশ করতে আমার সময় লাগবে অন্তত এক বছর। আমার ওপর আপনার আস্থা না থাকলে শওকত ভাই, আমি অপারগ। আপনি এখন বলুন কবিতাটা আমি ছাপবো কী না। কয়েক মুহূর্ত নিরবতার পর তিনি বলেছিলেন—ঠিক আছে ভ্রাত। তোমার ওপর আস্থা রাখা হলো।

শুধুমাত্র পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলোর একটা স্তুপ দাঁড় করালেই তো হবে না। নতুন কিছু লেখাও যোগাড় করতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্যে জাহানারা ইমাম নামের অবিনাশী একটি ইতিহাসকে দুই মলাটের মাঝে নিয়ে আসার চেষ্টা আমার। রাতদিনের পরিশ্রমকে সেচ্ছায় বরণ করে নিলাম। কোনো সহযোগী নেই। সমস্ত দৌড়-ঝাঁপ একলা একাই করতে হয়েছে। যাকে বলে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ। আমি তখন আজিমপুর শেখ সাহেব বাজারের একটি গলিতে ভাড়া থাকি। সেখান থেকে বাংলাবাজারে আলমগীর রহমানের প্রেস টু পল্টনের গ্রাফিকস্ক্যান লিমিটেড। শাহবাগ চারুকলা ইন্সটিটিউট টু মতিঝিল বিচিত্রা অফিস। জাহানারা ইমামের বাসভবন এলিফ্যান্ট রোডের কণিকা টু বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। কিংবা প্রেসক্লাব টু মিন্টু রোড বিরোধীদলীয় নেত্রীর বাসভবন করতে করতে আমার চব্বিশ ঘন্টার দিন-রাত্রির অধিকাংশ সময় ফুরিয়ে যায় দ্রুত। আমার সম্পাদনায় প্রকাশিতব্য স্মারকগ্রন্থের জন্যে বিশেষ কিছু রচনা লিখে দিয়েছেন কয়েকজন সংস্কৃতিযোদ্ধা, লেখক ও রাজনীতিবিদ আমার বিরামহীন তাগাদা এবং তাঁদের অন্তর্গত তাগিদে। এই তালিকায় আছেন অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, নাট্যকার অভিনেতা আবদুল্লাহ আল মামুন, সৈয়দ হাসান ইমাম, বেগম মুশতারী শফী, মফিদুল হক, আনু মুহাম্মদ, লায়লা হাসান, কামাল পাশা চৌধুরী,কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা। মিলন লেখাটা নিজেই নিয়ে এসেছিলেন আলমগীর রহমানের অফিসে। চট্টগ্রামের বেগম মুশতারী শফীর লেখাটা পেয়েছিলাম ডাকযোগে। জননেত্রী শেখ হাসিনার লেখাটার প্রসঙ্গে একটু বলি।

- Advertisement -

Read More

Recent