
প্রতিবারই মেয়াদ পূর্তি করে ‘সামার’ নির্দিষ্ট সময়ে উত্তর গোলার্ধ ত্যাগ করে। অফিসিয়ালি দিন কুড়ি বাকি থাকলেও স্কুলগুলোর আর তর সয়না। সেপ্টেম্বরের পয়লা মঙ্গলবারই বাচ্চাদের ডাকতে শুরু করে। ভাগ্যিস আগেরদিন সোমবার সরকারি ছুটি থাকে । তা না হলে সোমবারই খুলতো। সোমবারটা শ্রমিক দিবস। সেও আরেক কাহিনী ! সারা দুনিয়ায় শ্রমিক দিবস মে মাসের ১ তারিখ হলেও এখানে সেপ্টেম্বরের প্রথম সোমবার। তাতে কী, আমিতো একদিন বেশি সামার কাটাই।
‘একদিন বেশি’ দিনটাই আবার শৈশবের ঈদের কষ্ট মনে করিয়ে দেয়। ঈদের দিন শেষ বিকেলে বুকটা ধড়াশ করে উঠতো। মনে হতো আল্লাহ দিনটাকে আরেকটু লম্বা করলেই পারতো! অথবা ঈদটা যদি পরের দিন হতো! কিংবা টাইম মেশিন দিয়ে ঈদের সকালটা ফিরিয়ে আনা যেতো! কোনটাই করা যায়নি। কেবল বিটিভির আনন্দমেলা দেখার আশায় সন্ধ্যাটা কোনোরকমে পার করতাম। মধ্যরাতে ঘুমাতে যেতাম চাপা কষ্ট বুকে নিয়ে। এখন সামার ভ্যাকেশনের শেষ রাতটিও কাটে বুকের হু হু বাতাসের শীতল কষ্টে।
সবার কি এমন হয়? হয়তো না। মানুষ কাজ পাগল। কাজের মাঝে আনন্দ খোঁজে। আমার হয় উল্টো। আনন্দের মাঝে কাজ খুঁজি। চাকরি জীবনে অফিসে মন বসেনা। বাইরে ঘুরতে মন চায়। সাইট ভিজিট পাঁচশো কিলোর উপরে হলে মন বেজায় খুশি। ‘লেডিবেলা মিস্ট’ মাখা শ্বেতাঙ্গি কলিগদের চেয়ে সাইটের পর্তুগিজ-ইতালিয়ান মিস্ত্রিদের স্প্যানিশ খিস্তি-খেউর বেটার মনে হয়।
নগর ছেড়ে যতো দূরে যাই ততই যেনো বাংলাদেশ দেখি। হাইওয়ে থেকে দুরের বনজঙ্গল ঘেরা কাউন্টিগুলোকে ঠিক ছায়াঢাকা গ্রাম বাংলা মনে হয়। রাস্তার পাশে সবজির বাগান দেখে মনে হয় সিরাজগঞ্জের কোনো গ্রাম। হঠাৎ কোনো ফার্ম হাউজে গরু চরানো দেখলে বাঘাবাড়ির আশেপাশের চরগুলির ছবি ভেসে ওঠে। সর্পিল কোনো নদীর বাঁকে দাঁড়িয়ে বারবার করতোয়ার কথা মনে পড়ে। হান্টসভিল বা হালিবার্টনের ঝোপের ভেতর কচুরিপানার পুকুর খুঁজে পাই।
কোলকাতার ছেলে সৌরভ চ্যাটার্জী’কে এবার এক ছোট্ট নদী দেখিয়েছিলাম। নদীর নাম মাসুইপ্পি। কুইবেকের তৃতীয় শহর শেরব্রুকের কাছে। অসম্ভব সবুজ দু’পাড়। গাছের ঘন ডালপালা নুইয়ে পড়েছে জলের উপর। আটলান্টিক পানে ধেয়ে চলা মাসুইপ্পি নদীর ঢেউ দেখে সৌরভ চিৎকার করে বলেছিলো, “দাদা, এতো আমাদের বর্ধমানের দামোদর নদী। ওপারেই নিধু জেঠু নতুন ঘর তুলেছে”। সবজি ক্ষেতের স্টিলফ্রেমে লাউ ঝুলতে দেখে ওর চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। আবেগে সাউথ ক্যালকাটার লোকাল টোন বেরিয়ে আসে, “ঠাম্মা দেখলে ঠিকঠাক বোঁয়াল মাছের ঝোঁল করে ছাঁড়তো’। সৌরভদের আদি নিবাস বর্ধমানে। দামোদর নদীর পাড়েই।
ঠান্ডা ভাব থাকায় সামার এবার তেমন জমেনি। আমার জন্য এটা এডভ্যানটেজ। ভিড় ভাট্টা ভালো লাগেনা। ভারমন্টের সবুজ পাহাড়, প্লাটসবার্গের সুদীর্ঘ ফ্রেশওয়াটার বীচ, কুইন অব আমেরিকানস লেক, আমেরিকার মঙ্গা পীড়িত(!) শহর মেসেনা, শার্লেভোয়ার তিমি, মন্টমরেন্সি ফলস, সেন্ট-এনি গিরিখাদ, ওকা বীচ, সেন্ট-স্যাভর ওয়াটার পার্ক এবং মন্ট্রিয়ল নিকটবর্তী নদী-নালা-খাল-বিল শেষ করে সামার প্রায় ফুরিয়ে এসেছিলো। তবে খতম করার আগে নতুন গন্তব্য খুঁজছিলাম। এ সময় ডাক পড়লো পেনসিলভেনিয়ার এরি (ইরি) শহর থেকে। অদ্ভূত সুন্দর প্রাকৃতিক উপদ্বীপ ‘প্রেস্ক পেনিনসুলা’ দেখার আমন্ত্রণ। ব্যাস, ফোন দিলাম বন্ধু সালাহ উদ্দিন শৈবালকে। সবে কানাডিয়ান পাসপোর্ট হয়েছে। পাসপোর্টের ডেব্যু হওয়া দরকার। বললাম, “টরন্টো আসছি। রেডি থাক। আমরা বাফেলো হয়ে পেনসিলভেনিয়া যাবো”। প্রথমে গোঁ গোঁ করলেও শেষমেষ রাজি। কবি মানুষ। পেনিনসুলা শুনে আর ঠিক থাকতে পারলোনা।
ফেরার পথে ভীষণ অবসাদগ্রস্ত ছিলাম। লম্বা ড্রাইভ জনিত কোনো ক্লান্তি নয়। সামার ভ্যাকেশনের নটে গাছটি মুড়োনোর কষ্ট। কানাডায় সামার মানে বাংলাদেশকে ফিরে পাওয়া। উইন্টার মানে সত্যিকারের প্রবাস জীবন। হাড্ডি এক্সরে করা কনকনে বাতাস, গাছের ন্যাড়া মাথা, এক হাঁটু তুষার আর বাড়ির চিমনির ধুসর ধোঁয়া। সামার ফুরোলেই বাচ্চাদের স্কুল। বাড়তি কাজের নতুন ফিরিস্তি। লাঞ্চবক্স রেডি, ভারী কাপড়-দস্তানা-স্নো’বুট, ডে-কেয়ার ড্রপঅফ/পিকআপ, হোমওয়ার্ক এইড, আফটার স্কুল টিউটোরিয়ালস, আরো কত্তো কী! আছে জীবিকার তাগিদ। ঝড়ো হাওয়া কিংবা তীব্র তুষারে রেড এলার্ট জারী হলেও সাদা বাবুরা অফিসে এসে বসে থাকেন। আমাদের না গিয়ে উপায় কি? পিঁপড়ের জীবন। শীতকালে সঞ্চিত অন্ন গ্রীষ্মকালে ভেঙ্গে খাওয়া।
ব্রাম্পটন, কানাডা
