
এক. ৭ই মার্চ নিয়ে বিএনপির চুলকানি নতুন না; আমার স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল করে ১৯৭৯ কি ৮০ সালের ৭ই মার্চ, তখন আমরা পঞ্চগড়ে ছিলাম এবং ৭ই মার্চে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মাইকে সেই ভাষণ বাজানো শুরু করলে পুলিশ এসে মাইক খুলে নিয়ে চলে যায়। আমার সখ্যতা তখন ছাত্রদলের জাকির-ইউনুসদের সাথে, বিএনপির অফিসে সেকি উল্লাস! আমি সেই উল্লাসের কারণ উদ্ধারে ব্যর্থ। পরে ১৯৮৩ সালে ঢাকা কলেজে আসার পরে ৭ই মার্চ নিয়ে আমার নিরলস প্রয়াস—কী এবং কেন? সেই সময় এম আর আখতার মুকুলের “আমি বিজয় দেখেছি” বইটি বাজারে এলে সেখানে প্রথম খুঁজে পেলাম ৭ই মার্চের ভাষণ। আরে, এ ভাষণ তো মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছে, এই ভাষণ তো স্বাধীনতার কথা বলছে! কোন ফাঁকে ক্যাসেটে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটিও পেয়ে গেলাম, আর যা হয়, শুনতে শুনতে মুখস্ত।
জামাত-বিএনপি’র জাতীয় সংসদে সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের ওপর জামাত উত্থাপিত শোক প্রস্তাবে বিএনপির সম্মতির নিন্দা জানাই। বিএনপির রাজাকার-প্রীতি গেল না। কয়লা ধুলে ময়লা যায় না–কথাটি মিথ্যে নয়।
দুই.বিশ্বের বহু জায়গার মতো কানাডার পাহাড়ঘেরা শহর ক্যালগারিতেও ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ পালিত হলো। ৫ই আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেকটা অনাড়ম্বর যদিও, তবে, মনের মধ্যে ডাক যে থাকলে এত এত মানুষ এসে হাজির হয়, তা বিস্ময়কর। আয়োজকদের আশা ছিল ৩০-৩৫ জন, সেখানে ৪৫ জন। রমজানের কারণে সময় সংক্ষিপ্ত, তবু কেমন করে জানি সময়ের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিলো ঐতিহাসিক দিনটি।
আমার কপালে জুটেছিল মূল প্রবন্ধটি লিখা ও তা পাঠ করার। শিরোনাম: “৭ই মার্চ: রাষ্ট্রের মানসিক জন্ম এবং আত্মত্যাগের ঘোষণা”। এখানে বলে রাখি, প্রবন্ধ পাঠে আমি জন্মগত অসহায়। এবারে তার ব্যতিক্রম হবে, সেটা আশা করি নি।
বায়েজিদ ভাই, তপু এবং আবির খন্দকার আবৃতি করে শোনালেন তিনটি কবিতা, এটিও বিস্ময়কর যে দুটো কবিতা নির্মলেন্দু গুনের, অপরটি মহাদেব সাহার। বলা বাহুল্য, কবিতা তিনটি পচাত্তরের পনেরই আগস্ট পরবর্তী বাঙালির সাংস্কৃতিক পুনর্জাগনের সময়ের। বর্তমানে বাঙালির সংস্কৃতি পচাত্তর-পরবর্তী সময়ের চেয়েও বড় সংকটে পড়েছে, একদল উন্মাদ নিজেদের আত্ম-পরিচয়কে ভুলে যেতে হিংস্রতায় মেতেছে।
বাঙালির যা কিছু গৌরবের, তাকে ধ্বংস অথবা অস্বীকারের এক প্রবল স্রোত এখন বহমান। সংগত কারণে বিপরীত যাত্রাও দৃশ্যমান হচ্ছে। অনাগত বাঙালি ও বাংলাদেশের নিজ গৃহে ফেরার তাগিদ যে ৭ই মার্চ, বঙ্গবন্ধুর কৌশলী ও তেজদ্বীপ্ত ভাষণের মতো সংস্কৃতি-সম্ভারের মধ্যেই লুকানো, তা স্পষ্ট হলো।
তিন. পাকিস্তান মিলিটারিতে কর্মরত বাঙালি সেনাদের মধ্যে যে এক তৃতীয়াংশ বিদ্রোহ করে মুক্তিযুুদ্ধে অংশ নেয়, মেজর জিয়া ছিলেন তাদের একজন। জিয়ার বাড়তি কৃতিত্ব হচ্ছে ২৭শে মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া। জিয়ার আগে আরও কয়েকজন বেসামরিক বাঙালি স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার ওই একই কাজ করেছিল।
পাকিস্তান মিলিটারিতে বাঙালিদের মধ্যে একজন লে. জেনারেল, কয়েকজন মেজর জেনারেল, কয়েকজন ব্রিগেডিয়ার ছিল; কিন্তু, বিদ্রোহে অংশ নেয় মেজর পর্যায়ের কয়েকজন অফিসার। বিদ্রোহে অংশ নিতে দ্বিধার কারণে চট্টগ্রামে ইবিআরসির কর্ণধার একজন বাঙালি কর্ণেল পাঁচ শতাধিক বাঙালি ক্যাডেট সমেত পাকিস্তানি আক্রমনে নিহত হন। একজন ব্রিগেডিয়ার, দুই জন লে. কর্ণেল আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়ার জন্য প্রথমে করাচি ও পরে লায়ালপুরে হাজির হন। বিদ্রোহে অংশ নেওয়া মেজরদের সকলকেই ১১টি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার এবং পরবর্তীতে তিনজন সিনিয়র মেজরকে পদোন্নতি দিয়ে ব্রিগেড কমান্ডার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বাঙালি সেনাদের অবদান জাতি স্মরণ করে, করবে; কিন্তু, বিশাল-বিপুল জনযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তাঁদের কারোরই ছিল না। এই মার্চ মাসে টেলিভিশনে বিএনপি জিয়াকে নিয়ে যা করছে, তাতে জিয়া ক্রমশ: হাস্যরসের পাত্র হয়ে উঠছেন মাত্র। ফেসবুকে অনেক ট্রল ভাসছে যেখানে রাজনৈতিক আন্দোলনের পুরোভাগে জিয়াকে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একজনকে তো দেখলাম লিখেছে, সালাম-বরকতদেরকে জিয়া হুমকি দিয়ে বলেছে: যান, ভাষা আন্দোলন করেন, আমি আছি।
ক্যালগেরি, কানাডা
