
শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের দেশে ‘শিক্ষা ‘ দেয়া হয়না। ছেলেবেলা থেকেই রেজাল্ট অরিয়েন্টেড পড়াশোনা আমাদের কেবল ‘ভালো রেজাল্ট’ করতে উদ্বুদ্ধ করে। প্রকৃত শিক্ষিত হওয়ার বাসনাকে দূরে ঠেলে দেয়। যে কোনো প্রতিযোগিতায় সাফল্য অবশ্যই কাম্য। একাডেমিক পরীক্ষাও একটি প্রতিযোগিতা। ভালো ফলাফল অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার। তাই বলে এই ফল’টি যেমন জীবনের শেষ সাফল্য নয়, তেমনি জীবনের চূড়ান্ত ব্যর্থতাও নয়। জীবনের প্রতি পদে পরীক্ষা দিতে হয়। কখনো সাফল্য কখনো ব্যর্থতা। কখনো ফলহীন কেবলি অপেক্ষা। জীবনের অনেক ব্যর্থতা পূরণ করা যায়না, কিন্তু একাডেমিক ব্যর্থতা পূরণের সুযোগ থাকে। আইনষ্টাইনের একটি মার্কশীট দেখেছিলাম। সর্বমোট নম্বর পেয়েছিলেন ৯০ (সম্ভবত ১০০০ বা ৮০০ নম্বরের পরীক্ষায়)। রবীন্দ্রনাথ সেভেন থেকে এইটে উঠতে ফেল করেছিলেন। নজরুলের কোনো ডিগ্রী নাই, তাঁর লেখা নিয়ে পিএইচ.ডি গবেষণা হয়।
ক’দিন আগেই শ্রদ্ধেয় সৈয়দ আবুল মকসুদ’র ‘বাঙালির বিদ্যাভ্যাস ও পরীক্ষায় পাস-ফেল’ লেখাটি পড়ছিলাম প্রথম আলো’য়। কিছু অংশ উদ্ধৃত করলাম। …..”কৌতূহলবশত একটি সমীক্ষা করে লিখেছিলাম। ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত কুড়ি বছরে ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েটে যাঁরা প্রথম ১০ জনের মধ্যে ছিলেন, তেমন ২০০ জন কর্মজীবনে কে কী হয়েছিলেন, তার অনুসন্ধান করেছিলাম। যাঁরা ম্যাট্রিক ও আইএ, আইএসসি ও আইকমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় হয়েছিলেন, তাঁদেরও খোঁজ করেছিলাম। ৩০০-এর মধ্যে ১১ জন জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন, যদি মন্ত্রণালয়ের সচিব বা পিডব্লিউডি/ সড়ক ও জনপথের প্রধান বা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হওয়া সাফল্যজনক বিষয় হয়ে থাকে। কেউ কেউ শিক্ষা বিভাগে গিয়েছিলেন, কিন্তু সমাজে তাঁদের দাম ছিল না। ……..বাংলা ভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গদ্যলেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলায় ফেল করেছিলেন। ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিএ পরীক্ষা প্রবর্তন করে। প্রথম বছর বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম ও বার্মা (মিয়ানমার) থেকে ১৩ জন পরীক্ষা দিয়েছিলেন। পাস করেছিলেন দুজন এবং ফেল করেছিলেন ১১ জন। টেনেটুনে দ্বিতীয় বিভাগে যে দুজন পাস করেছিলেন, তাঁরা হলেন যদুনাথ বসু ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্থান অধিকারী গ্র্যাজুয়েট যদুনাথ বাবু কোথায়? আর বঙ্কিমচন্দ্র কোথায়? ….. বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু প্রথমবার বিএ পরীক্ষায় ফেল করেন। তাঁর পরবর্তীকালের বিএসসি, এমএসসি, ডিএসসির কাজ ঈর্ষণীয়। বিশ শতকের উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক স্যার নীলরতন সরকার (আমাদের বাংলাদেশের মানুষ) কোনোরকমে বিএ পাস করে চাতরা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করছিলেন। তাঁর মনে হলো, মানুষের সেবা করতে ডাক্তারি পড়া দরকার। স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ১৮৮৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। শুনেছি, তাঁকে লন্ডনে গিয়ে এমডি পড়ার জন্য এক অজ্ঞাত হিন্দু বিধবা অর্থসাহায্য করেছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন।”
ইউরোপ আমেরিকায় অনেক বাংলাদেশী একাডেমিক ব্যক্তি (শিক্ষক বা গবেষক) আছেন, যাঁদের বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফল ছিলোনা। আমেরিকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গণিত ও পরিসংখ্যান’ বিভাগের একজন অধ্যাপককে (সদ্য অবসরে) আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি, যিনি মেট্রিক পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগ পেয়েছিলেন। খুব কাছ থেকে দেখা প্রকৌশলী বন্ধু বাংলাদেশে পলিটেকনিকে চাকরি নিয়েছিলো শিক্ষকতাকে ব্রত হিসাবে নেবে বলে। আজ সে কানাডার অন্যতম বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণকালীন শিক্ষক। আজীবন দ্বিতীয় বিভাগ পাওয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স বিহীন মাস্টার্স করা এক বড়ভাই আমেরিকার নামকরা ইন্সুরেন্স কোম্পানির সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট। এরকম ব্যক্তি উত্তর আমেরিকায় হাজারটা মিলবে। আমার বিশ্বাস দেশেও এরকম সফল ব্যক্তির সংখ্যা কম নয়। ৮০র দশকের শেষ ভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট এবং রসায়ন অধ্যাপক স্যারের মেট্রিক রেজাল্ট দেখে আঁতকে উঠেছিলাম। তৃতীয় বিভাগ। তবে তাঁর অনার্স-মাস্টার্স ছিলো অহংকার করার মতো। অতীতের ব্যর্থতা তিনি পুষিয়ে নিয়েছিলেন।
নামকরা সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদদের বেশির ভাগেরই নানা কারণে একাডেমিক সাফল্য থাকেনা। ছাত্র জীবনে ফেল করাটা তাঁরা ইতিহাসের অংশ বানিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের কথা তাই বাদই দিলাম। কিন্তু ঝানু আইনজীবি, সৎ ব্যবসায়ী, সফল শিল্পপতি, ডাকসাইটে সাংবাদিক, নির্ভুল একাউনট্যান্ট, প্রতিষ্ঠিত স্থপতি, প্রকৌশলী, চিকিৎসক এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনেকেই এ দলে আছেন। মেডিকেলে পড়াকালীন একাধিকবার ফেল করেছেন এমন ডাক্তারের সংখ্যা নেহায়েত মন্দ নয়। তাঁদের একটি বিরাট অংশ ডাক্তার হিসাবে সবচে’ সফল। কর্মজীবনে কাজের প্রতি নিষ্ঠা তাঁদের এ সাফল্য এনে দিয়েছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প আমাদের অর্থনীতির চেহারাটাই পাল্টে দিয়েছে। এ শিল্পে জড়িত উদ্যোক্তা, মার্চেন্ডাইজার, বিপণন কর্তাদের বড় অংশ খুউব বেশি একাডেমিক বিদ্যা অর্জন করেননি। কিন্তু উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও বিদেশী ক্রেতা আকর্ষণের জন্য মিটিং, প্রশিক্ষণ ও জার্নাল রিডিং করে তাঁরা যে শিক্ষা অর্জন করেছেন তাতো আর এইচ.এস.সি বা বি.এসসি’র সিলেবাসে থাকেনা।
এসএসসি বা এইচএসসি শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করবে সকল অভিভাবক এবং শিক্ষক সেটাই প্রত্যাশা করেন। দুর্বল প্রস্তুতি বা দুর্ঘটনার কারণে কেউ ফেল করলে আত্মহণনের পথ বেছে নেবে এটা মেনে নেয়া যায়না। শিক্ষা জীবনের দু’একটি ‘ফেল’ তাবৎ জীবন নষ্ট করে দেয় এমন ‘জীবন বিধ্বংসী’ ধারণা তাদের মধ্যে এলো কি করে? এটা কী গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা নয়?
ব্রাম্পটন, কানাডা
