আহা, ফারুক ভাই!

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিয়ানীবাজারের আজির মার্কেটে মাসুম আহমেদের লাইব্রেরিতে আমি ও কবি ফললুম হকের মাঝখানে ফারুক ভাই বস্তুত প্রকৃতপক্ষেও তিনি আমাদের হৃদয়ের মাঝখানে থাকতেন সর্বক্ষণ

এইমাত্র জানতে পারলাম আমাদের সবার প্রিয় ফারুক ভাই, অর্থাৎ বীর মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার, একজন অসাধারণ মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ আব্দুল মালিক ফারুক আর নেই। তিনি আজ সিলেটের মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নাল ইল্লা হি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজেউন। আহা, ফারুক ভাই! ও আমার প্রিয় ফারুক ভাই! আর আমাকে কে আদর করে ডাকবে – ও দেলওয়ার, ইলিশা কিনছি। আয়, বাড়িত গিয়া দুই ভাইয়ে খাইমু!

একটু পেছনে যাই। সময়টা আশির দশকের মাঝামাঝি। আমি আর আমার বাল্যবন্ধু জামিল সকাল হলেই বিয়ানীবাজারের চমচম মিষ্টিঘরে চলে যেতাম। সেখানে ইতোমধ্যেই এসে বসা থাকতেন বর্তমানে ইংল্যান্ড প্রবাসী আলম ভাই। মুখ ভরে পানের সঙ্গে চুন খেতে খেতে তার তর্জনীর ডগা লাল হয়ে থাকতো। আলম ভাই লাল হয়ে যাওয়া তর্জনী ঘুরিয়ে মীনা কুমারীর নাচের মুদ্রা দেখিয়ে কবি ও চিত্র পরিচালক কামাল আমরোহির কথায় চলে যেতেন। মীনা কুমারী কবিতার কথাও উল্লেখ করতেন সপ্রশংসায়। আমরা অপেক্ষা করতাম কখন কবি ফজলুল হক ও ফারুক ভাই আসবেন। ফারুক ভাই আসলেই গল্প চলে যেত সৈয়দ মুজতবা আলীতে। সৈয়দ মুজতবা আলী থেকে মধ্যযুগের সাহিত্যে৷ আমাদের বন্ধুমহলে ফারুক ভাই ছিলেন মধ্যযুগের সাহিত্যের গভীর অভিনিবেশে গবেষণা তৃষ্ণ পাঠক। ইতোমধ্যেই ফারুক ভাইয়ের গল্প পাঠক মহলে বিপুল সাড়া জাগিয়েছে। ফারুক ভাইও রবীন্দ্রনাথ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, কায়েস আহমেদ, হরিপদ দত্ত প্রমুখ গল্পকারদের গল্প পাঠ করে নিজের মতো করে গল্পটি লিখতে প্রবল উৎসাহী হয়ে উঠছেন৷ গল্পের পাশাপাশি ফারুক ভাই ছড়াও লিখতেন নিয়মিত। সাংবাদিকতাও করেছেন দায়িত্ব ভেবে৷

- Advertisement -

ফারুক ভাই ছিলেন [ আহা, ছিলেন শব্দটি এখন লিখতে হচ্ছে আমাদের প্রিয় ফারুক ভাইয়ের কথা বলতে! ] নরম মাটির মানুষ। ফজলু ভাই প্রায়শই মজা করে ফারুক ভাইকে খ্যাপানোর জন্য কতভাবে কপট রাগ দেখিয়েছেন। রাগাতে চেয়েছেন। কিন্তু ফারুক ভাই কখনোই রাগ করেননি। তিনি বুঝতেন ফজলু ভাইসহ আমরা সবাই তাকে কত ভালোবাসতাম। তাই তিনি রাগ না করে বরং আরো বেশী মায়া দেখাতেন৷ আরেক দফা চা মিষ্টি পান সিগারেট খাওয়াতেন।

বিয়ানীবাজারে চমচম মিষ্টিঘরের আড্ডার খ্যাতি বা বদনাম এলাকা ছাড়িয়ে সিলেটেও সাহিত্য মহলে গিয়ে পৌঁছালো। এমনকি গণমানুষের কবি দিলওয়ার-এর সিলেটের ভার্থখলার বাড়িতেও এর ঢেউ গিয়ে লাগলো। একবার আমি আর ফারুক ভাই দিলু ভাইয়ের ভার্থখলার বাড়িতে কবিকে দেখতে গেলে তিনি চমচম মিষ্টিঘরের আমাদের আড্ডার কথা উৎসাহী হয়ে জানতে চাইলেন। এমনকি তিনি বিয়ানীবাজার এসে দুইদিন আমাদের সঙ্গে থাকবেন বলেও আগ্রহ প্রকাশ করলেন৷ দিলু ভাই ফজলু ভাইকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। কবি পুত্র কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার কবি তমিজউদদীন লোদী ভাই ও ফজলু ভাইয়ের হরিহর আত্মার টুকরো ছিলেন। কিশওয়ার ভাই মাঝে মাঝে বিয়ানীবাজারে ফজলু ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। দিলু ভাই বলে দিলেন একদিন ফজলু ভাইয়ের বাড়িতে, আরেকদিন ফারুক ভাইয়ের বাডিতে থাকবেন। তখন ফারুক ভাই, অর্থাৎ আব্দুল মালিক ফারুক ও ফারুক জোশীর দ্বৈত সম্পাদনায় একটি গল্প সংকলনের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে দিলু ভাই দুই দিনের জন্য বিয়ানীবাজার এসেছিলেন৷ দিলু ভাই একদিন ফজলু ভাইয়ের বাড়িতে একদিন ফারুক ভাইয়ের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। ফজলু ভাই, ফারুক ভাই, লুৎফর ভাই, ফারুক জোশী ভাই ও আমি দিনরাত কবির সঙ্গে ছিলাম।

ফারুক ভাইয়ের বাড়িতে যেদিন নৈশভোজের আয়োজন করা হলো, সেই রাতে আমরা কবির গল্প শুনে শুনে রাত পোহালো। ফজরের আজান পড়ার পরে কবির ইচ্ছে হলো মুড়িয়া হাওরের উপরে উদিত সূর্যের প্রথম আলোকরেখা দেখবেন। আমরা ঘাসের উপরে জমে থাকা শিশির মাড়িয়ে কবিকে মন্টেকা মাঠে নিয়ে গিয়ে ভোরের প্রথম সূর্যোদয় দেখলাম।

আমার বাসায় অথবা ফারুক ভাইয়ের বাড়িতে ভালো কিছু খাওয়ার আয়োজন থাকলেই আমরা পরস্পরকে নিয়ে খেতে চাইতাম। আমি যেমন আপত্তি করতাম না, তেমনি ফারুক ভাইও কোন অজুহাতে আমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতেন না৷ আমার আব্বা আম্মা ফারুক ভাইকে খুব পছন্দ করতেন। কে না পছন্দ করতেন ফারুক ভাইকে!

আমি আর জামিল এমন হরিহর আত্মার টুকরো ছিলাম যে, জামিল আমেরিকা প্রবাসী হওয়ায় ফারুক ভাই, ফজলু ভাই ধরেই নিয়েছিলেন যে, দেলওয়ার এলাহীও যে কোন একদিন উড়াল দেবেই। আমি যেদিন আটাশ বছর আগে সত্যিই কানাডায় চলে এলাম, সঙ্গ হারালেও ফারুক ভাই খুব খুশি হয়েছিলেন। আমার আব্বা জানতেন ফারুক ভাই, ফজলু ভাই খুব খুশি হবেন। এই খুশির খবর জানানোর জন্য আব্বা ফারুক ভাইয়ের বড়দেশের বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন।

২০২১ সালে ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল। ফজলু ভাই, ফারুক ভাই ও আমি আবার তিরিশ বছর আগে ফিরে গিয়েছিলাম। মাসুম আমাদেরকে তার অফিসে বসার আয়োজন করে দিয়েছিল। চা-নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করেছিল।

আশির দশকের শেষ দিকে ফারুক ভাই একবার জাপান যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিয়েও হংকং থেকে ফেরত আসলেন। ঢাকায় আমি তখন তানসি ইন্টারন্যাশনাল নামে এক ট্র‍্যাভেলস এজেন্সিতে চাকুরী করি। ফারুক ভাই আমাকে খুঁজে বের করে দুইদিন ঢাকায় থাকলেন। বিদেশ যেতে না পেরে ফারুক ভাই আরো খুশিই ছিলেন। যদিও তখন তিনি আর্থিকভাবে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। আমরা ঢাকায় খুবই মজার সময় কাটিয়েছিলাম।

খচমচ মিষ্টিঘর আড্ডার আরেক সদস্য এনায়েত সারোয়ার উচ্চ শিক্ষার্থী হয়ে বিলাত চলে যাবেন। সারোয়ার ভাই ফজলু ভাইয়ের ঘনিষ্টতম বন্ধু৷ স্বভাবতই ফজলু ভাই বন্ধুর জন্য যুগপৎ খুশি ও বিষন্ন। অত্যন্ত প্রাণবন্ত, সুদর্শন, চৌকস, কৌতুকপ্রিয় সারোয়ার ভাইকে চমচমের আড্ডায় আসন্ন অভাব বোধ করে আমরা সকলেরই মন খারাপ। ফারুক ভাইকে সারোয়ার ভাই চাচা ডাকেন৷ ফারুক ভাই ও সারোয়ার ভাইয়ের স্নেহ-শ্রদ্ধার সম্পর্কটি অত্যন্ত গভীর। ফারুক ভাই সারোয়ার ভাইয়ের বিলাত যাত্রার আগের রাতে চমচম মিষ্টঘর থেকে বিদায় নেওয়ার মন কেমন করা অনুভূতির প্রকাশ করে একটি গল্প লিখলেন- ‘চমচমের আড্ডা’ নামে। সেই গল্প পরের সপ্তাহেই ছাপা হলো প্রাচীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা যুগভেরীর সাহিত্য পাতায়।

আহা, কত গল্প মনে পড়ছে ফারুক ভাই। প্রিয় ফারুক ভাই! এসব ভুলি কী করে! আপনাকে অভিবাদন জানাই, কমরেড!

সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে ফরিয়াদ জানাই, আমাদের প্রিয় ফারুক ভাইকে জান্নাতের শ্রেষ্ঠতম স্থানের অধিকারী করবেন। আমিন৷

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent