মন্ট্রিয়ালে তরুণীকে জোর করে দেহব্যবসায় ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় গৃহবন্দি দণ্ড

ভুক্তভোগীকে কখনো গ্যারেজে কখনো বাড়ির পেছনের উঠানে রাত কাটাতে বাধ্য করা হতো

কানাডার মন্ট্রিয়ালে এক চাঞ্চল্যকর মানবপাচার ও জোরপূর্বক দেহব্যবসায় বাধ্য করার মামলায় আদালত গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেছে। এই ঘটনায় এক তরুণীকে আশ্রয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধীরে ধীরে ভয়ভীতি ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেহব্যবসায় ঠেলে দেওয়া হয়। আদালত রায়ে জানিয়েছে, অভিযুক্ত তরুণী সরাসরি ঘটনায় জড়িত থাকলেও পুরো অপরাধচক্রের পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ ছিল তার মায়ের হাতে।

আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী তরুণীর সঙ্গে অভিযুক্ত ব্রায়ানা আব্রুজ্জোর যোগাযোগ হয়। সে সময় ভুক্তভোগী বাসস্থান সংকটে ভুগছিলেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্রায়ানা তাকে নিজের বাড়িতে থাকার প্রস্তাব দেন। প্রথমদিকে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ মনে হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।

- Advertisement -

ধীরে ধীরে ওই তরুণীর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। তাকে ঘরের নানা কাজ করতে বাধ্য করা হতো এবং তার স্বাধীনতা সীমিত করে ফেলা হয়। এরপর অর্থ উপার্জনের জন্য তাকে দেহব্যবসায় যুক্ত হতে চাপ দেওয়া শুরু হয়। আদালতে বলা হয়, এই পুরো ব্যবস্থার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ব্রায়ানার মা, সোনিয়া আব্রুজ্জো। তিনি পুরো কার্যক্রম সংগঠিত ও পরিচালনা করতেন, আর মেয়েও এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।

শুনানিতে উঠে আসে ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র। ভুক্তভোগীকে কখনো গ্যারেজে, কখনো বাড়ির পেছনের উঠানে রাত কাটাতে বাধ্য করা হতো। এমনকি প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও তাকে বাইরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে যা তার মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। কয়েক মাস এই পরিস্থিতিতে থাকার ফলে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। আইনি বিধিনিষেধের কারণে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

এই ঘটনায় সোনিয়া আব্রুজ্জোর বিচার আগেই সম্পন্ন হয়েছে এবং তাকে আট বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালত তাকে মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে, ব্রায়ানা আব্রুজ্জোর ক্ষেত্রে আদালত বলেছেন তার দায় তুলনামূলক কম হলেও সে পরিস্থিতি প্রতিরোধ করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি এবং অপরাধে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। রায়ে তাকে দুই বছর কম এক দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে : প্রথম এক বছর তাকে গৃহবন্দি থাকতে হবে, পরবর্তী এক বছরে নির্দিষ্ট সময়ের পর বাইরে থাকা যাবে না, চলাফেরায় কঠোর বিধিনিষেধ মানতে হবে এছাড়া, কয়েক বছর তাকে তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে।

আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে যে অভিযুক্তকে ২৪০ ঘণ্টা সামাজিক সেবামূলক কাজে অংশ নিতে হবে এবং মায়ের সঙ্গে একই বাসায় বসবাস করা যাবে না

এই ঘটনা মানবপাচার ও শোষণের একটি জটিল ও নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে, যেখানে দুর্বল অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে অপরাধীরা ফাঁদ পাতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি করে বিশ্বাস অর্জন এরপর ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ ও নির্যাতনের মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল করে তোলা এই কৌশল আধুনিক মানবপাচার চক্রে ক্রমেই বেশি দেখা যাচ্ছে।

এই মামলায় আদালতের রায় শুধু শাস্তি নয়, বরং একটি বার্তাও দেয় অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকলেও দায় এড়ানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে এটি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য সতর্কবার্তা, যাতে এমন অপরাধ প্রতিরোধে আরও কঠোর নজরদারি ও সচেতনতা গড়ে তোলা যায়।

- Advertisement -

Read More

Recent