
আমরা ছিলাম প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে উঠা কলকাকলি মুখর পাখির মতো। প্রায় প্রত্যেকেরই নিজস্ব একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুবলয় থাকলেও সকলের সঙ্গে একসাথে বৈকালিক আড্ডাকে কান ধরে গভীর রাত পর্যন্ত টেনে না নিয়ে বাড়ি ফিরলে আমাদের রাতের খাবার হজম হতো না। এই নিয়মের কোন ব্যত্যয় হওয়ার সুযোগ নেই। যদি না কেউ অনিবার্য কারণে দূর কোন গ্রাম গঞ্জ বা শহরে গিয়েছে। তাতেও প্রায়ই বন্ধু বলয়ের অন্তত দুই তিনজন একসাথে যাওয়া চাই।
কীসের কলেজ। কীসের পড়াশোনা। কীসের ছাত্ররাজনীতিতে মঞ্চ কাঁপানো বক্তৃতা। সবই যেন একই গন্তব্য। এর সবকিছুর কারণই একসাথে আড্ডা। হাসিখুশি মাখা উদ্দাম সময় ক্ষেপণ। আমাদের কেউ কেউ ছিলেন দুর্দান্ত রকমের মেধাবী। পরীক্ষার ভালো ফলাফলে। ছাত্ররাজনীতির দর্শন অনুযায়ী সাংগঠনিক নেতৃত্বের অগ্রগামীতায়৷ কিন্তু এইসব কিছু ছাড়িয়ে সারাক্ষণ দলবদ্ধ হয়ে আনন্দ আড্ডাই যেন আমাদের জীবনের পরম আরাধ্য। প্রতিদিনের জীবন যাপনের ব্রত।
তাহলে আমাদেরকে নিয়ে কি আমাদের অভিভাবকদের কোনই স্বপ্ন ছিল না? আমাদের উপর কি জীবন সংগ্রামের আগামী দিনের ভয়ংকর রূপের হুশিয়ারী ছিল না? আমাদের প্রত্যেকের অভিভাবকদেরই এরকম আশা ছিল। কিন্তু আমরা প্রায় প্রত্যেকেই তাঁদের সেই আশা পূরণে সচেষ্ট না হয়ে প্রায় সকলেই এক স্বপ্নের জগতে বাস করতে লাগলাম। যেন জীবন এক স্বপ্নের অনন্ত মহাসাগরে ভাসা আনন্দের সাম্পান। অতএব, আমাদের অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আমাদের অভিভাবকগণ আশাহত হয়েছেন ঠিকই। কিন্তু আমাদের কোন বন্ধুকে নিয়েই তাদের মাতাপিতা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেননি। এর মূলে আমাদের প্রত্যেকেরই ছিল মাতাপিতার সম্মান রক্ষার সাথে সাথে এক ধরনের ধ্রুব নৈতিকতার প্রতিদিনের চর্চা। অথচ উদ্দামতায় আমরা ছিলাম বেহিসেবী। বেহিসেবীপনায় আমরা ছিলাম চূড়ান্ত। সাহসিকতায় আমরা ছিলাম নির্ভীক। অথচ, আমরা নিজেরা যাই করিনা কেন, কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা, কাউকে ছোট করা, কারো অনিষ্ট করা, অপেক্ষাকৃত অগ্রজদের অসম্মান প্রদর্শন করা, ছোটদের অবজ্ঞা করা, আমাদের কোন বন্ধুর জীবন চর্চায় এর কোন ছিটেফোঁটাও ছিল না। বিয়ানীবাজারের আনাচেকানাচে আমাদের বন্ধুদের প্রভাব বিস্তারী বন্ধু থাকলেও কেউই বলতে পারবে না দলগত বা ব্যক্তিগত কোন বন্ধুর আচরণে কেউ অসম্মানিত হয়েছেন। বা আমাদের কোন বন্ধুর আচরণে কেউ আঘাত পেয়েছেন। অথবা আমাদের কোন বন্ধু কারো কাছ থেকে দুরভিসন্ধিমূলকভাবে কোন সুবিধা নিয়েছে।
আজ পেছন ফিরে তাকালে এক মধুর আনন্দস্মৃতি আমাদের প্রত্যেক বন্ধুর হৃদয়-মন উদ্ভাসিত করে দেয়। আমরা প্রত্যেকেই আমাদের অগ্রজদের হৃদয় প্লাবিত করা স্নেহ ভালোবাসা পেয়েছিলাম। আমাদের ছোটভাইবোনদের কাছ থেকে অবারিত সম্মান-শ্রদ্ধা পেয়েছিলাম। যা এখনো বর্তমান।
যা বলছিলাম, আমরা স্বপ্নের অনন্ত মহাসাগরে আনন্দের সাম্পানে ভেসে ভেসে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের তীরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছি। কেউ ইংল্যান্ডে। কেউ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে। কেউ কানাডায়। কেউ বা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়।
করোনার শাসনে আমরা ঘরে বসে থাকলেও প্রিয় বন্ধুদের সাথে আবার প্রাণখুলে আড্ডা দেওয়ার শাসন করার আগেও কেউ ছিলেন না। এখনো কেউ নাই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাপের সাধ্য নেই আমাদের বন্ধুদের আড্ডায় হস্তক্ষেপ করে আমাদেরকে থামাতে!
আমাদের সম্প্রীতির বন্ধন যে চিরকালের জন্য অটুট!
টরন্টো, কানাডা
