ইত্তেফাকের আলোকচিত্রি শামসুদ্দিন চারু ও একজন লিটনের গল্প

Man with a mustache and blue glasses sitting in an office chair, smiling at the camera in a relaxed pose.
লুৎফর রহমান রিটন

১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমীতে ছোটদের একটি গল্প বলা প্রতিযোগিতায় আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সাগর ভাই। ফরিদুর রেজা সাগর। কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার আহবায়ক তখন সাগর ভাই। আর আমি ছিলাম মেলার খুদে সদস্য। একা একা বাংলা একাডেমি পর্যন্তও যেতে পারি না। সে কারণেই সাগর ভাইয়ের হাত ধরে জীবনে প্রথম বাংলা একাডেমী যাওয়া। বিশাল প্যান্ডেল টানিয়ে অনুষ্ঠান হচ্ছিলো বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে। প্যান্ডেলে সারি সারি চেয়ার সাজানো। লোকে লোকারণ্য পরিস্থিতি। সাগর ভাই যখন আমার একটি হাত মুঠোয় ধরে আমাকে নিয়ে বাংলা একাডেমীতে প্রবেশ করলেন মাইকে তখন ভরাট কণ্ঠের আবৃত্তি চলছে—আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে…। আবৃত্তি করছেন শাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা ঝাঁকড়া চুলের একজন বিশালদেহী মানুষ। সাগর ভাই আমাকে জানালেন–এই লোকটার নাম কাজী সব্যসাচী। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বড় ছেলে। আহা কী গমগমে কণ্ঠ তাঁর! তখন আমি হিরন্ময় কণ্ঠ কাকে বলে জানতাম না। এখন জানি। কাজী সব্যসাচীর কণ্ঠটি ছিলো ‘হিরন্ময় কণ্ঠ’।

কিছুক্ষণ পর ছোটদের গল্প বলা প্রতিযোগিতা শুরু হলো। আমার নাম ঘোষণা করা হলে সাগর ভাই আমাকে মঞ্চে উঠিয়ে দিলেন। এতো মানুষ দেখে প্রথমে খানিকটা ঘাবড়ে গেলেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিলাম। গল্প বলতে শুরু করলাম। পিন পতন নিরবতায় সবাই আমার গল্প শুনছেন। আমার গল্পের মাঝখানে এবং শেষে তুমুল করতালি পেলাম। শেষ দৃশ্যে গল্পের প্রয়োজনে ধপাস করে পড়ে যাবার একটা ব্যাপার ছিলো। তো আমি পড়ে গেলাম। আমার অভিনয়টা নিশ্চয়ই ভালো হয়েছিলো। নইলে অজস্র মানুষের করতালি থামছিলো না কেনো?

- Advertisement -

কিছুক্ষণ পর প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা করা হলো। ভয়াবহ সংবাদ। প্রথম স্থান অধিকারকারী বালকের নাম লুৎফর রহমান রিটন!

আমি মঞ্চে পুরস্কার গ্রহণ করতে উঠলাম। পুরস্কার হিশেবে আমাকে দেয়া হলো বিশাল উঁচু একটা বইয়ের প্যাকেট! এতোই বিশাল যে আমি সেটা ধরে রাখতেই পারছিলাম না। এতো ভারী যে আমি টাল খেয়ে যাচ্ছি রীতিমতো। এসময় দৌড়ে মঞ্চে উঠলেন সাগর ভাই। আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে পুরস্কারটি গ্রহণ করলেন তিনি। তারপর একহাতে বইয়ের উঁচু বান্ডিল আরেক হাতে আমাকে ধরে মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। পুরস্কার হিশেবে যে বইগুলো পেয়েছিলাম তার মধ্যে—টলস্টয়ের সেরা গল্প, সরদার ফজলুল করিমের গল্পের গল্প, এবং ডাক দিয়ে যাই-এর কথা মনে আছে।

পুরস্কার বিতরণ পর্ব শেষ হলে টিঙটিঙে শরীরের একজন ফটোগ্রাফার আমাকে একটু দাঁড়াতে বললেন। সাগর ভাই আমাকে ফিসফিস করে বললেন—ইনি একজন সাংবাদিক। তোমার ছবি নেবেন। সেই ফটোগ্রাফার ভদ্রলোক আরো দুজন বালক বালিকাকে এনে আমার সঙ্গে দাঁড় করালেন। আমাকে সামনে দাঁড় করিয়ে আমার পেছনে মেয়েটাকে এবং মেয়েটার পেছনে ছেলেটাকে এমন ভাবে দাঁড় করালেন যাতে আমাদের তিনজনার চমৎকার একটা ফ্রেমিং হলো। পরদিন দৈনিক ইত্তেফাকের শেষের পাতার আগের পাতায় ছবিটা ছাপা হলো! কী চমৎকার ঝকঝকে ছবি! ছবিতে আমরা তিনটি হাস্যোজ্জ্বল ছেলেমেয়ে। আমাদের হাতে বই। আমার স্পস্ট মনে আছে ছবির ক্যাপশনটা ছিলো এরকম—‘গতকাল বাংলা একাডেমীতে আয়োজিত উপস্থিত গল্প বলা প্রতিযোগিতায় প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বালক-বালিকাত্রয়। ফটো—চারু।’

আমার জানা হয়ে গেলো টিংটিঙে স্বাস্থ্যের সেই ফটোগ্রাফারের নামটি। তিনি চারু। এরপর কতো অনুষ্ঠানেই না দেখা হলো চারু ভাইয়ের সঙ্গে! তাঁর পুরো নামটিও জেনে গেছি ততোদিনে। শামসুদ্দিন চারু। কচি-কাঁচার মেলার বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কতো ছবিই না তুলেছেন তিনি। বলাই বাহুল্য, সেইসব ছবিতে আমি থাকতামই থাকতাম। ছবি আঁকার ক্লাশে ইজেলে দাঁড়িয়ে আমি ছবি আঁকছি, রবীন্দ্র বা নজরুল জয়ন্তীতে ডুয়েট বা কোরাস গান গাইছি, আমি বক্তৃতা করছি কিংবা আবৃত্তি করছি চারু ভাইয়ের তোলা এরকম অনেক ছবিই সেই সময়ের ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছে। আমাকে দেখলেই সহাস্য চারু ভাই এগিয়ে আসেন—কি লিটন কেমন আছো তুমি? (আমাকে তিনি সারা জীবন লিটনই ডেকে গেলেন!)

দু’বছর আগে বাংলা একাডেমীর বইমেলায় আমাকে দেখে সেই আগের মতোই ছুটে এসেছিলেন চারু ভাই—আরে লিটন কবে আইলা? তুমি তো বিদেশে থাকো। তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে কুশল জিজ্ঞেস করলেন। তাঁর সঙ্গে আরেকজন ফটোসাংবাদিক ছিলেন। সেদিন চারুভাই খুব ফূর্তিতে ছিলেন। আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন—আসো লিটন তোমার সঙ্গে একটা ছবি তুলি। তারপর খুব আপনজনের মতো আমার কাঁধে মমতার হাত রেখে তিনি তাঁর আরেক সহযোগিকে বলেছিলেন—তোলো। অতঃপর ক্লিক। আমাদের চ্যানেল আইয়ের পাক্ষিক আনন্দ আলোর ফটোসাংবাদিকও সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত ছিলো বলে অসাধরণ সেই মুহূর্তের ছবিটা সেও তার ক্যামেরায় ধরে রেখেছিলো। আজ ছবিটা হঠাৎ খুঁজে পেলাম। চারু ভাইকে আজ খুব মনে পড়ছে। শৈশবে আমার বিকশিত হবার সময়টাতে চারু ভাইয়ের মতো মানুষগুলো আমাকে কতোই না ভালোবাসা দিয়েছেন! নেপথ্যে থাকা এই মানুষগুলোর নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় ঋদ্ধ হয়েছি আমি। আজকের আমাকে অজস্র সহস্র মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এঁরাই।

প্রিয় চারু ভাই, আপনার কাছে থাকা আমার সোনালি শৈশব কৈশোরের বর্ণাঢ্য গল্পগুলোকে আপনি অনেক যত্নে রূপকথার ফ্রেমে বন্দি করে রেখেছিলেন বলেই না আজ আমার স্মৃতির জোনাকিরা এতোটা উচ্ছ্বলতা আর ঔজ্জ্বল্য নিয়ে ডানা ঝাঁপটাচ্ছে! আপনার কাছ থেকে পাওয়া স্নেহের মণিমানিক্যসমূহের স্মৃতি আপনার ‘লিটন’ কোনদিন ভুলবে না চারু ভাই!

 

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent