
আমাদের হেয়ার স্ট্রিটের বাড়িটার ছিলো দুটো অংশ। দোতলা বিল্ডিং-এর সঙ্গে লাগোয়া বড় একটা টিনশেডের ঘর ছিলো আমাদের। ভবন নির্মাণের সময় আমাদের পুরো পরিবার সেই টিনশেডে থাকতো। সেই কারণেই ওটাকে দালানে রূপান্তরিত করা যায়নি। তো সেই টিনশেড টিনশেডই থাকলো। আমরা বিল্ডিং-এ ট্রান্সফার নিলাম। টিনশেডে ভাড়াটে উঠলো।
ভাড়াটে আসে ভাড়াটে যায়।
নদী যখন বছর চারেকের তখন সেখানে থাকতে এলো একটি হিন্দু পরিবার। পরিবারটা মোটামুটি বড়। ওদের দুইপুত্র এক কন্যা আর স্বামী স্ত্রী মিলিয়ে পাঁচজনের সংসার। কন্যাটির বয়েস তেরো চৌদ্দ। নাম টুনি। খুব একটা স্বচ্ছল ছিলো না ওরা। নিম্ন মধ্যবিত্ত স্বল্প আয়ের পরিবারটির প্রধান উপার্জন ছিলো ছানা ও মাঠা তৈরি এবং বিক্রি। মিষ্টিও বানাতো ওরা। টুনির দুই বড়ভাই টুনির বাবা মাকে তাদের পারিবারিক ব্যবসার কাজে সাহায্য করে। রাত তিনটার দিকে টুনির বাবা আর দুই ভাই মাঠা ও ছানা তৈরির কাজে লেগে পড়তো। তারপর ভোর বেলা, সূর্য ওঠার আগেই তৈরিকৃত ছানা-মাঠা নিয়ে ওরা তিনজন বেরিয়ে পড়তো।
টুনি নামের মেয়েটার সঙ্গে নদীর খুব ভাব হয়ে গেলো। টুনি সারাদিন নদীর সঙ্গে খেলে। নদীকে যখন তখন ওদের বাড়িতে নিয়ে যায়। আমি আর শার্লি নদীকে মামনি বলতাম বলে টুনিও ওকে মামনিই বলতো। টুনির দুই ভাই আর মা বাবাও নদীকে খুব আদর করতো। ওদের সমস্ত উৎসবে নদীকে ওরা সঙ্গে রাখতো। পূজোর সময় ওরা নদীর জন্যেও কিনে আনতো নতুন একটা জরিদার ওড়না কিংবা মালা অথবা বালা। পারিবারিক ভাবে দেবীকে ফুল-মিষ্টান্ন সমর্পণের কাজটা ওরা নদীকে দিয়েই শুরু করতো। পূজোর ছোট্ট ঘন্টাটা বাজানোর দায়িত্ব দিতো নদীকেই। ওদের সঙ্গে পূজোর উৎসবে অংশ নিয়ে ভরপেট মিষ্টি খেয়ে নদী যখন ফিরে আসতো তখন ওকে খুবই উৎফুল্ল দেখাতো। এইরকম পূজো শেষে ফিরে নদী একদিন শার্লিকে বললো–চলো না মা আমরা হিন্দু হয়ে যাই?
শার্লি তো হতবাক–কেনো রে মামনি?
–হিন্দু হলে পূজো করা যায়। ফুল দেয়া যায়। ছোট্ট ঘন্টি বাজানো যায় আর মিষ্টি খাওয়া যায়।
–মিষ্টি তো আমরাও খাই। ফুল তো আমরাও পছন্দ করি। তোর বাবা ফুল নিয়ে আসে না? বেলি কিংবা বকুল ফুলের মালা নিয়ে আসে না তোর জন্যে?
মায়ের কথায় খুব একটা কনভিন্সড হয় না নদী। রাতে আমি ফিরে এলে শার্লি আমাকে নদীর আকাঙ্খার বিষয়টা গোপনে জানিয়ে রাখলো। এরপর আমার সঙ্গে শুরু হলো নদীর কথপোকথন—–নদী মামনি?
–বলো বাবা
–তুই নাকি হিন্দু হতে চাস?
–হ্যাঁ বাবা চলো না আমরা হিন্দু হয়ে যাই?
–হিন্দু হলে কী হবে?
–হিন্দু হলে পূজো করা যায়। ফুল দেয়া যায়। ছোট্ট ঘন্টি বাজানো যায় আর মিষ্টি খাওয়া যায়। নতুন জামা ওড়না মালা পাওয়া যায়। আর অনেক মিষ্টি খাওয়া যায়।
–মামনি হিন্দুদের যেমন পূজো আছে আমাদেরও তেমনি ঈদ আছে তো! সেই ঈদে নতুন জামা কেনা হয়। ফুল কেনা হয়। পোলাও শেমাই মিষ্টিও খাওয়া হয়। এই জিনিসগুলোর জন্যে আমাদের তো হিন্দু হবার দরকার নেই মামনি। হ্যাঁ খালি ছোট্ট ঘন্টিটা নেই আমাদের। নো প্রবলেম। ঘন্টি একটা নিয়ে আসবো তোর জন্যে।
আমার যুক্তিতে আপাতত পরাভূত হলেও ওর আফসোস শেষ হয়না। আক্ষেপের সুরে নদী বললো–কিন্তু ঈদ তো মাত্র দুইটা বাবা!
–ঠিক আছে আমরা না হয় ঈদের সংখ্যা বাড়িয়ে নেবো! চারটা পাঁচটা ঈদ করবো!
নদী খুশি হয়ে গেলো। আর তাই সে যাত্রা আমরাও বেঁচে গেলাম হিন্দু হয়ে যাবার বায়নার হাত থেকে।
আমাদের ঈদের সময় টুনিকে নিয়েই ঈদ করতো নদী। ঈদের দিন সকাল সকাল সেজেগুঁজে চলে আসতো টুনি আমাদের বাড়িতে। টুনির সঙ্গেই শুরু হতো ওর ঈদের উৎসব। মায়ের সঙ্গে নানুবাড়ি যাবার আগে টুনির সঙ্গে পোলাও-মাংশ-শেমাই-মিষ্টি খেতো। তারপর টুনির মা বাবা আর ভাইয়াদের জন্যে নদী আর টুনি দুজনে মিলেই নিয়ে যেতো ঈদ উপলক্ষে রান্না করা আমাদের খাবারগুলো।
তখন একটাই টিভি স্টেশন ছিলো, বিটিভি মানে বাংলাদেশ টেলিভিশন। বিটিভির বিজ্ঞাপনগুলো খুব প্রিয় ছিলো নদীর। খুব দ্রুত মুখস্ত করে ফেলতো পছন্দ হওয়া যে কোনো বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনকে খুব বিশ্বাসও করতো নদী। ও যখন বছর তিনেক বয়েসী, তখন একটা বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো মেরিল বেবী লোশনের। বিজ্ঞাপনে নদীর সমান পিচ্চি একটা মেয়ে সেই বেবী শ্যাম্পু চুলে মেখে স্নান করে আর মাথায় ফেনাভর্তি চেহারা নিয়ে বলে—‘মেরিল শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করলে চোখও জ্বলে না কান্নাও পায় না।’ এই বিজ্ঞাপনটা দেখে নদী আমাকে বললো—‘বাবা আমার জন্যে মেরিল বেবী শ্যাম্পু নিয়ে এসো।’
–তাই নাকি? মেরিল বেবী শ্যাম্পু লাগবে?
–হ্যাঁ বাবা।
–কেনো?
–কারণ মেরিল শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করলে চোখ জ্বলে না কান্নাও পায় না।
ওর জন্যে বেবী শ্যাম্পুর ছোট্ট কিউট কৌটোটা কিনে আনলাম। পরেরদিন মহা উৎসাহে নদী লেগে পড়লো গোসলে। আমিও গভীর আগ্রহ নিয়ে ওর গোসল দেখছি। শার্লি ওর মাথায় চুলে ওই শ্যাম্পু মাখিয়ে দিলো। ফেনায় ফেনায় বোঝাই হয়ে গেলো ওর মাথা আর চুল। কিছুক্ষণ পরেই আমাদের অবাক করে দিয়ে প্রবল চিৎকারযোগে কান্নাকাটি শুরু করলো নদী। আমি আর শার্লি ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলাম–ঘটনা কী? কী হলো কী হলো মামনি?
হাপুস হুপুস কাঁদতে কাঁদতে নদী বললো—‘ওই মেয়েটা মিথ্যে বলেছে বাবা। আমার চোখ জ্বলছে আবার কান্নাও পাচ্ছে…!’
আমি যেহেতু বিটিভিতে অনুষ্ঠান করি সেহেতু নদীর ধারণা টিভি পর্দায় যাদের দেখানো হয় তাদের সবাইকেই আমি চিনি। কাঁদতে কাঁদতে নদী বললো—‘তুমি অই মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করবে বাবা ও মিথ্যে বলেছে কেনো?’
আমি কথা দিলাম ওই মেয়েটাকে আমি খুঁজে বের করবোই করবো এবং কষে একটা ধমকও দেবো–কেনো তুমি এরকম একটা মিথ্যে কথা বলে আমার মেয়েটাকে কাঁদালে!
মজার ব্যাপার হলো—এর বছর দেড়েক পরে সেই মেয়েটা আমার একটা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিলো। পিচ্চিটার নাম ছিলো সুধা। সুধাকে আমি বলেছিলাম নদীর ঘটনাটা। শুনে সুধা খুবই মজা পেয়েছিলো। বলেছিলো—আঙ্কেল আমারও তো চোখ জ্বলেছিলো কান্নাও পেয়েছিলো কিন্তু আমাকে বলা হয়েছিলো আমি যেনো ‘চোখ জ্বলে না কান্নাও পায়না’ বলি।
ছোট্ট বাচ্চাদের দিয়ে মিথ্যে বলাতে নেই এটা আমরা বড়রা বুঝতে পারি না। এমনকি সেটা বিজ্ঞাপন হলেও। এটা একটা অপরাধও। আমাদের স্ক্রিপ্ট রাইটার, নির্মাতা এবং প্রোডাক্ট মালিকরা সেটা কোনোদিন বোঝেও নি বুঝতে চায়ও না।
নদীকে আমি সুধার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার ঘটনাটা বলেছিলাম। সুধা নামের মেয়েটা নিজের থেকে মিথ্যে বলেনি জেনে আশ্বস্ত হয়েছিলো নদী।
বিজ্ঞাপনকে বিশ্বাস করার আরেকটা ঘটনা বলি। বিটিভিতে তখন জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী মায়াবড়ির বিজ্ঞাপন ‘আহা মিষ্টি কী যে মিষ্টি এই সুন্দর ছোট সংসার’ জোরেসোরে প্রচারিত হচ্ছে। নদী তখন অনেক ছোট। সদ্য কথা বলতে শিখেছে। সারাক্ষণ পুটুশ পাটুশ কথা বলতেই থাকে, বলতেই থাকে। প্রথমে ছোট ছোট বাক্য। তারপর ধিরে ধিরে ওর বাক্য বড় হতে থাকে। আর দশটা বাচ্চার চাইতে নদী খানিকটা আগেই শুরু করেছে কথা বলা। এর জন্যে ওর মা শার্লি দায়ি। শার্লি সারাক্ষণ কথা বলতে না শেখা ছোট্ট এইটুকুন মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতো। অফুরন্ত কথা। ওকে গান শোনাতো। অসংখ্য গান। রূপকথার গল্প শোনাতো। অজস্র গল্প। (এইরকম চলতে থাকলে কথা না শিখে উপায় থাকে!)
তো মায়াবড়ির বিজ্ঞাপনে নেপথ্য কণ্ঠে অদেখা এক নারী— ‘আপনিও মায়াবড়ি খান এবং নিরাপদ থাকুন’ টাইপের উপদেশ দিতেন মহিলাদের। আমাদের টিভিটা ছিলো ড্রয়িং রুমে। এক সন্ধ্যায়। দুজন গেস্ট ছিলো আমাদের ড্রয়িং রুমে। টিভিতে বিজ্ঞাপনটা দেখার পর বেড়াতে আসা দু’জন গেস্টের সামনে নদী ওর মাকে বললো—‘মা তুমিও এটা খেও তুমিও তাহলে নিরাপদ থাকবে।’
শার্লির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার যোগাড়!
পুটুর পুটুর কথা বলা আমাদের সেই পিচ্চি টুকটুকি মেয়েটা এখন কতো বড় হয়ে গেছে! অটোয়ার কার্লটন ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করা মেয়েটা এখন বিজ্ঞাপনের সত্যমিথ্যা বোঝে। হিন্দু মুসলমানের ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায় না। মানুষের প্রধান পরিচয় সে মানুষ। কে হিন্দু কে মুসলমান কে বৌদ্ধ কে খৃস্টান কিংবা কে এগুলোর একটাও নয়, কে আস্তিক কে নাস্তিক এইসব নিয়ে ওর কোনো চিন্তা বা দুশ্চিন্তা নেই। মানুষকে তার প্রধান পরিচয়—মানুষ হিশেবেই দেখতে শিখেছে নদী। আমরা তো এমন একটা নদীকেই চেয়েছিলাম।
আজ অক্টোবরের তিন। এই দিনটা শার্লি আর আমার কাছে খুব বিশেষ একটা দিন। এই দিনেই নদীর সঙ্গে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিলো! হ্যাপি বাড্ডে মামনি!
অটোয়া, কানাডা
