
কানাডার ফেডারেল ব্যয় ও আর্থিক নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সি.ডি. হাউ ইনস্টিটিউট। তাদের মতে, আসন্ন স্প্রিং ইকোনমিক আপডেট নবগঠিত লিবারেল সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ যেখানে সঠিক নীতিনির্ধারণ না হলে দীর্ঘমেয়াদে তরুণ প্রজন্মকে বিশাল ঋণের বোঝা বহন করতে হতে পারে।
২৩ এপ্রিল প্রকাশিত এক বিশদ প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ২৭ এপ্রিলের স্প্রিং ইকোনমিক আপডেটকে কেবল একটি নিয়মিত আর্থিক পর্যালোচনা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটিকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে সরকারকে চার বছরের একটি সুস্পষ্ট আর্থিক রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। এই রূপরেখায় অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত : ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য সঞ্চয় লক্ষ্যমাত্রা, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক কর সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট অর্জনের পরিকল্পনা। প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক আলেক্সান্দ্রে লোরিন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “এই পদক্ষেপগুলো রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে, কিন্তু এগুলো ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।”
সর্বশেষ ফেডারেল বাজেট অনুযায়ী, কানাডার বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৮৩ কোটি ডলার। তবে কীভাবে এই ঘাটতি কমিয়ে আর্থিক ভারসাম্যে ফেরা হবে সেই বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই বলে সমালোচনা করেছে সি.ডি. হাউ ইনস্টিটিউট। একই সঙ্গে প্রাদেশিক অর্থনীতির অবস্থাও উদ্বেগজনক। দেশের দশটি প্রদেশের মধ্যে ছয়টি ইতোমধ্যেই বাড়তি ঘাটতি ও ঋণের পূর্বাভাস দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যেসব প্রদেশ ২০২০ সালেও উদ্বৃত্তে ছিল যেমন ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, আলবার্টা ও নোভা স্কশিয়া তাদের আর্থিক অবস্থাও এখন চাপে।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকারের সম্মিলিত নিট ঋণ ২০২৮ সালের মধ্যে জিডিপির প্রায় ৮২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই মাত্রার ঋণ দেশের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সি.ডি. হাউ ইনস্টিটিউটের সমালোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো গত এক দশকে ফেডারেল ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি। তাদের মতে, সরকার ধারাবাহিকভাবে ব্যয় বাড়িয়েছে, কিন্তু সেই ব্যয়ের কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট জবাবদিহিতা দেখা যায়নি। এছাড়া, আগের বাজেটে ২০২৮ সালের মধ্যে বছরে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার সঞ্চয়ের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটিকেও অবাস্তব ও দুর্বল পরিকল্পনা হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার একটি কঠিন ভারসাম্যের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে রাজনৈতিক চাপ ও জনসেবামূলক ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে রয়েছে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জরুরি দাবি। সি.ডি. হাউ ইনস্টিটিউটের এই সতর্কবার্তা মূলত সরকারের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আসন্ন স্প্রিং ইকোনমিক আপডেট কানাডার জন্য শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক নথি নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ আর্থিক দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে এটি অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনতে পারে, আর ব্যর্থতা হলে ঋণের বোঝা আরও গভীর সংকটে ঠেলে দিতে পারে আগামী প্রজন্মকে।
