
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বিস্তৃত ও কঠোর ধাতব শুল্কের প্রভাব মোকাবিলায় কানাডার ফেডারেল সরকার ১৫০ কোটি ডলারের একটি বড় সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত ও কপার শিল্পকে আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকদের রক্ষা করা।
সোমবার অটোয়ায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি এবং ডিজিটাল ইনোভেশনমন্ত্রী ইভান সলোমন যৌথভাবে এই সহায়তা পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির কারণে সৃষ্ট চাপ সামাল দিতে এখন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
ঘোষিত সহায়তা প্যাকেজের সবচেয়ে বড় অংশ হচ্ছে বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব কানাডা (বিডিসি)-এর আওতায় ১০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি। এই তহবিল মূলত সেই সব কোম্পানির জন্য, যারা মার্কিন শুল্ক আরোপের কারণে সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
সরকার জানিয়েছে, অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত ও কপার শিল্পের ব্যবসাগুলো কম সুদে সর্বোচ্চ ৫ কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। বিশেষ সুবিধা হিসেবে এই ঋণের কিস্তি তিন বছর পর্যন্ত পরিশোধ করতে হবে না। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানগুলো তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ ছাড়াই নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে। এই উদ্যোগ শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, বরং উৎপাদন খাতকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের ফলে কানাডীয় ধাতব পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সহায়তা প্যাকেজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ৫০ কোটি ডলারের “রিজিয়নাল ট্যারিফ রেসপন্স ফান্ড”। এই তহবিলের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে তারা বিকল্প বাজার খুঁজে নিতে পারে এবং রপ্তানি নির্ভরতা কমাতে সক্ষম হয়। সরকারের ভাষ্যমতে, অনেক প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। নতুন তহবিল তাদের ইউরোপ, এশিয়া এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হবে।
সংবাদ সম্মেলনে মেলানি জোলি পরিস্থিতিকে সরাসরি “বাণিজ্য যুদ্ধ” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমরা এখন সম্মুখসারিতে অবস্থান করছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো শ্রমিকদের সুরক্ষিত রাখা এবং কোম্পানিগুলোকে টিকিয়ে রাখা।” তার ভাষায়, বর্তমান সংকট শুধু শিল্পখাতের সমস্যা নয়; এটি কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই সরকার চায়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যেন তাদের কর্মীবাহিনী ধরে রাখতে পারে এবং হঠাৎ করে ছাঁটাইয়ের পথে না যায়। ডিজিটাল ইনোভেশনমন্ত্রী ইভান সলোমনও বলেন, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে দ্রুত তারল্য নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যবসাগুলোকে নতুন বাজার খুঁজে বের করতে সময় ও বিনিয়োগ দুটোরই প্রয়োজন হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি কানাডার ধাতব শিল্পে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানি রপ্তানিনির্ভর, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ফলে সরকারের এই সহায়তা প্যাকেজকে অনেকেই “প্রতিরক্ষামূলক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ” হিসেবে দেখছেন। স্বল্পমেয়াদে এই তহবিল ব্যবসাগুলোকে টিকে থাকতে সহায়তা করলেও দীর্ঘমেয়াদে কানাডাকে নতুন বাণিজ্য অংশীদার খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও জোর দিতে হবে।
কানাডা সরকার স্পষ্ট করেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কচাপের মুখে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। বরং দেশীয় শিল্প, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি সক্ষমতা রক্ষায় আরও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে অটোয়ার।
