কথোপকথন

Woman with gray hair and a knit hat sits beside a bed of red and pink tulips in a park, wearing a pink jacket and black vest.
সুলতানা শিরিন সাজি

এক সন্ধ্যাবেলায় হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিল ওরা।না, সত্যি সত্যি পাশাপাশি হাঁটা নয়!তবু মনে হচ্ছিলো একই পথের ধুলো দুজনের পায়ে লেগে আছে।একজন এক সমুদ্রের ধারে, অন্যজন হয়তো কোন এক শহরের কোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে,তবু তাদের কথার ভিতর দিয়ে জোছনা নেমে আসছিল!

মেয়েটা লিখলো,আজ আকাশটা খুব ফাঁকা লাগছে।

- Advertisement -

ছেলেটা একটু থেমে উত্তর দিলো,ফাঁকা আকাশেই তো সবচেয়ে বেশি জোছনা জমে।

সব কথার উত্তর তোমার কাছে থাকে?

না। কিছু কিছু উত্তর শুধু তোমার জন্য বানিয়ে ফেলি।

মেয়েটা হাসলো!

হাসিটা দেখা গেল না, কিন্তু ছেলেটা যেন শুনতে পেলো!তারপর মেয়েটা লিখলো,জানো, আজ খুব বিষণ্ন লাগছে।

ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়ে কিছু বললো না বরং বিষাদের পাশে গিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে রইলো।

তারপর লিখলো,আচ্ছা, আমি যদি এখন চার্লি চ্যাপলিনের মতো হাঁটি?

মানে?

মানে এই যে, পা দুটো উল্টো দিকে ছড়িয়ে, মুখ গম্ভীর করে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে পৃথিবীর সব মানুষকে হাসানোর চেষ্টা করছি!

মেয়েটা একটু পরে লিখলো,তুমি এখন নিশ্চয়ই অভিনয় করে দেখাচ্ছো?

অবশ্যই।

আর আমি পড়েও গেছি।

মিথ্যে!

একদম সত্যি!

জোছনার ওপর পা পিছলে গেছে।

মেয়েটার মন খারাপের ভিতর ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।ছেলেটা তা বুঝতে পারলো!

সে আবার লিখলো,

দেখো, মুঠো ভরে জোছনা এনেছি তোমার জন্য।

জোছনা ধরা যায় বুঝি ?

যায়।

শুধু যাদের খুব মন খারাপ করে, তাদের জন্য ধরা যায়!

মেয়েটা অনেকক্ষণ আর কিছু লিখলো না।সমুদ্রের ধারে তখন বাতাস উঠেছে।বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে জোছনা গড়িয়ে পড়ছে।দূরে শালবনে বাতাস ঢুকে পাতাদের সঙ্গে আলাপ করছে।

অনেক পরে মেয়েটা লিখলো,বিষাদেরও কি রং হয়?

ছেলেটা লিখলো,হয় তো!

জোছনার মতো।

জোছনা তো সুন্দর।

বিষাদও কখনো কখনো সুন্দর।যখন কেউ তাকে বুঝতে পারে।

মেয়েটা চুপ।তারপর হঠাৎ লিখলো,তুমি পুরোনো সব কথা মনে রাখো কেমন করে?

কারণ কষ্টরা কখনো পুরোপুরি পুরোনো হয় না।

মেয়েটা আর কিছু লিখলো না!সমুদ্র তখন আরও নীল হয়ে উঠছে অন্ধকারে।

ছেলেটা আবার লিখলো,আচ্ছা, গিলগামেশের গল্প তোমার এত প্রিয় কেন?

কারণ সে অমরত্ব খুঁজতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের দুঃখ খুঁজে পেয়েছিল।

আর এনহেদুয়ানা?

সে প্রথম নিজের ভাঙাচোরা মন নিয়ে লিখতে পেরেছিল।ভাবো তো, হাজার হাজার বছর আগেও কেউ রাত জেগে নিজের কষ্ট লিখছিলো!

ছেলেটা লিখলো,তাহলে আমরা খুব আলাদা নই তাদের থেকে।

না।

যুগ বদলায়,

মানুষ বদলায় না!

একাকীত্ব বদলায় না!

বাতাসে তখন শালপাতার শব্দ।মনে হচ্ছিল বনও তাদের কথা শুনছে।

ছেলেটা লিখলোজানো, মজার ব্যাপার কী?

কী?

আমাদের কখনো দেখা হয়নি।তবু তোমাকে অনেকদিনের চেনা লাগে!

আমারও!

দূরত্বটা কোথায় তাহলে?

হয়তো মানচিত্রে!

আর কথোপকথন নয়!

এবার দীর্ঘ নীরবতা।

সেই নীরবতার ভিতরও ওরা পাশাপাশি হাঁটছিল!সমুদ্রের বালিয়াড়ি ধরে,শালবনের বাতাস পেরিয়ে,জোছনার রং মেখে!

কেউ দেখলে বুঝতেই পারতো না,ওদের মধ্যে এত দূরত্ব আছে!

 

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent