
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে এবার নিজ দেশের সরকারের ওপরই চাপ বাড়ালেন কানাডার প্রায় ২০০ সাবেক কূটনীতিক। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা ও লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির প্রতি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্তিশালী নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে ১৯০ জনেরও বেশি সাবেক কানাডীয় কূটনীতিক দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল উদ্বেগ প্রকাশ বা কূটনৈতিক বিবৃতি যথেষ্ট নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কার্যকর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। চিঠিতে বলা হয়েছে, কানাডা যেন অবিলম্বে ইসরায়েলের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করে। পাশাপাশি, যদি গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটে, তাহলে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাতিলের জন্য আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
সাবেক কূটনীতিকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নরম অবস্থানের সুযোগ নিয়েই ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণ, সামরিক অভিযান এবং কঠোর অবরোধ নীতি চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের ভাষায়, “শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়া ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারকে অবজ্ঞা করতেই থাকবে।”
চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে গাজা উপত্যকায় ত্রাণ প্রবেশে বিধিনিষেধ এবং বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধার বিষয়টি। সাবেক কূটনীতিকদের দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে গাজার প্রকৃত মানবিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পুরোপুরি তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে। বর্তমানে গাজায় খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির তীব্র সংকট চলছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বহুবার সতর্ক করেছে যে, দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ও সামরিক হামলার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের কিছু সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তারা কার্যত একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে অসম্ভব করে তুলতে চাইছেন।
শুধু গাজা নয়, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক কানাডীয় কূটনীতিকরা। তাদের মতে, লেবাননে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষের মৃত্যু আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয়। যদিও ইসরায়েল দাবি করছে, তাদের অভিযান মূলত হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি দেশের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয়। তবে চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা বলছেন, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার নামে পুরো শহর বা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক হামলা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তারা স্বীকার করেছেন যে, হিজবুল্লাহকে ঘিরে ইসরায়েলের “বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ” রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলেন, সামরিক অভিযানে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এই চিঠি কানাডার অভ্যন্তরে পরিবর্তিত জনমতেরই প্রতিফলন। গত কয়েক মাসে দেশটিতে মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের একাংশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি প্রথমবার নয়। এর আগেও ২০২৫ সালের জুলাই মাসে একই ধরনের একটি চিঠিতে কানাডার প্রতি ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের অস্ত্র বাণিজ্য বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই সময়ও সাবেক কূটনীতিক ও মানবাধিকারকর্মীরা অভিযোগ করেছিলেন যে, কানাডার নীরবতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার মানবাধিকারভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই উদ্যোগ পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নতুন ধরনের নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে কানাডা নিজেকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে এসেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে যদি কানাডা সত্যিই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তা পশ্চিমা বিশ্বে বড় ধরনের কূটনৈতিক বার্তা হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের অবস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কানাডা সরকার এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো কঠোর সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দেয়নি। ফলে সাবেক কূটনীতিকদের এই আহ্বান শেষ পর্যন্ত কতটা রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে।
