
কানাডার অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও নতুন অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থ সংগ্রহের অংশ হিসেবে সরকারি মালিকানাধীন কিছু সম্পদ বিক্রির সম্ভাবনার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। বৃহস্পতিবার পার্লামেন্ট হিলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন হলে ফেডারেল সরকারের মালিকানাধীন সম্পদ পুনর্বিন্যাস বা বিক্রির বিষয়ে সরকার ইতিবাচকভাবে ভাবছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন কিছু ক্ষেত্র খুঁজে দেখছে যেখানে বিদ্যমান সরকারি সম্পদকে “পুনর্ব্যবহার” করে নতুন অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। তার ভাষায়, “আমরা অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে বিষয়টি বিবেচনা করছি। যদি কোনো সরকারি সম্পদ নতুন সম্পদ তৈরিতে সহায়ক হয়, তাহলে সেটিকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হবে।”
গত বছরের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত ফেডারেল বাজেট এবং চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত স্প্রিং ইকোনমিক স্টেটমেন্টে প্রথমবারের মতো কানাডার ফেডারেল মালিকানাধীন বিমানবন্দরগুলোর জন্য নতুন মালিকানা কাঠামো বিবেচনার বিষয়টি উঠে আসে। সরকার সরাসরি “বিক্রি” শব্দটি ব্যবহার না করলেও, বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা দীর্ঘমেয়াদি লিজ মডেলের মতো বিকল্প কাঠামো পর্যালোচনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
কানাডার বড় বিমানবন্দরগুলো দীর্ঘদিন ধরেই স্বশাসিত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও জমি ও মূল মালিকানা ফেডারেল সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখন সরকার যদি নতুন বিনিয়োগকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে তা বিমানবন্দর পরিচালনায় বেসরকারি খাতের ভূমিকা আরও বাড়াতে পারে। কার্নি বিমানবন্দরকে সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করলেও তিনি স্পষ্ট করেন যে এটি কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং বিষয়টি এখনো নীতিগত ও কাঠামোগত পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে।
একই সময়ে কানাডার পরিবহন মন্ত্রণালয় বন্দর ও বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি বিস্তৃত আলোচনাপত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকার কিছু বন্দর বিক্রির সম্ভাবনা বিবেচনা করলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বন্দরকে একীভূত করার বিষয়েও ভাবছে। আলোচনাপত্রে শুধু মালিকানার প্রশ্ন নয়, বন্দর কর্তৃপক্ষগুলোর বর্তমান পরিচালনা কাঠামো কতটা কার্যকর সেটিও মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে।
বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, বাণিজ্য প্রবাহ এবং ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে কানাডা এখন তার পরিবহন ও লজিস্টিক অবকাঠামোকে নতুনভাবে সাজাতে চাইছে। সেই প্রেক্ষাপটে সরকার মনে করছে, কিছু সম্পদের পুনর্গঠন বা আংশিক বেসরকারিকরণ অর্থনৈতিক গতি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রধানমন্ত্রী কার্নি এও স্পষ্ট করেছেন যে বন্দর বিক্রি সরকারে “সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার” নয়। তার মতে, মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও আধুনিক করে তোলা। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের হাতে থাকা সব উপকরণ কাজে লাগাতে চাই, যাতে অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হয়। ফেডারেল সরকারের কোনো সম্পদ যদি সেই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে, তাহলে অবশ্যই তা বিবেচনায় আনা হবে।” এই বক্তব্যে বোঝা যায়, সরকার সরাসরি সম্পদ বিক্রির পথে হাঁটছে না; বরং অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নের আলোকে সম্ভাব্য বিকল্পগুলো মূল্যায়ন করছে।
এদিকে কানাডার পরিবহনমন্ত্রী স্টিভেন ম্যাককিনন গত ২৯ এপ্রিল বলেন, বিমানবন্দর বিক্রির ধারণাটি এখনো “একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে” রয়েছে। স্প্রিং ইকোনমিক আপডেট প্রকাশের আগের দিন তিনি এই মন্তব্য করেন। ম্যাককিননের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে সরকার এখনো নীতিগত আলোচনা এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়নের ধাপে রয়েছে। ফলে শিগগিরই বড় কোনো বিক্রি বা মালিকানা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা কম।
সরকারের এই অবস্থান ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গন ও অর্থনৈতিক মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সমর্থকদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগ আনা গেলে সরকারি ব্যয়ের চাপ কমবে এবং দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব হবে। অন্যদিকে সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ বেসরকারি হাতে গেলে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং পরিষেবার খরচ বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরকে জাতীয় নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। তাই এসব খাতে যেকোনো মালিকানা পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে যে কানাডা সরকার এখন অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নতুন অর্থায়ন মডেল খুঁজছে। সরকারি সম্পদ বিক্রি বা পুনর্বিন্যাস সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হতে পারে, যদিও এখনো বিষয়টি আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।
