লা পুদ্রে পাস। স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ কিংবা ইংরেজি উচ্চারণে কারো হয়তো দাঁত ভাঙতে পারে। আর জায়গাটিতে উঠতে গেলে হাত পা ভাঙলেও কিছু করার নেই। এটাতো আর চট্টগ্রামের টাইগার পাস নয়! সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৩ কিলোমিটার উঁচু খোলা জায়গা। ইঞ্জিনিয়ারিং স্কেলে সঠিক উচ্চতা ৩ হাজার ১ শত ৪ মিটার অথবা ১০ হাজার ১ শত ৮৪ ফুট। রকি মাউন্টেইনের দক্ষিণদিকের অন্যতম উচ্চ শৃঙ্গ এটি। শৃঙ্গের উপরে একটি প্রাকৃতিক হ্রদ বা লেক রয়েছে। লেকটি সাধারণ মানুষের কাছে তেমন পরিচিত না হলেও এর প্রসবিত সন্তান কলোরাডো নদীকে সবাই চেনে। হ্যাঁ, উত্তর আমেরিকার বিখ্যাত কলোরাডো নদীর উৎস লা পুদ্রে পাস লেক।
জন্ম যার পাথুরে পাহাড়ে, সেকি আর সবুজ ঘাসের উপর হাঁটে? কলোরাডো নদীর হয়েছে সে দশা। দুপাড় জুড়ে হরিদ্রাভ আর পীত বর্ণের মাটি। খা খা শূন্যতায় মনে হয় সাহারার বুক চিরে বয়ে যাওয়া নীল নদ। নীল নদ না হলেও জলের রং বেশ নীল। কখনো পরিচ্ছন্ন টলটলে স্বচ্ছ নীল। পাথুরে গিরিখাদের তলা দিয়ে কুল কুল করে গড়িয়ে যাওয়া জল। অসংখ্য বাঁক। জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো রাজ্যে হলেও সীমানা পেরিয়ে ঢুকেছে মেক্সিকোতে। মেক্সিকো যাবার পথে মিলিত হয়েছে বেশ কয়েকটি নদী এবং লেকের সাথে।
কলোরাডো নদী নিজ রাজ্য ছেড়ে প্রথমে বেড়াতে গিয়েছে ইউটাহ অঙ্গরাজ্যে। প্রকৃতির লীলাভূমি ইউটাহ। খানা খন্দ আর জঙ্গলে বোঝাই। মানুষজন এখনো কম। রাজ্য জুড়ে কনজারভেশন ভূমি। ভূমির রূপ দেখলে ভূগোল পড়া অধ্যাপক নড়েচড়ে বসবেন। লম্বা এলাকা জুড়ে ক্যানিয়ন। দক্ষিণে আরিজোনা বর্ডারের আগে বিশাল গ্লেন ক্যানিয়ন। যুক্তরাষ্ট্র সরকার পর্যটকদের বিনোদন দিতে বানিয়েছে গ্লেন ক্যানিয়ন রিক্রিয়েশন এরিয়া। বিনোদন প্রকল্পের মধ্যখান দিয়ে বিপুল বিক্রমে বয়ে চলছে রিভার কলোরাডো।
এবার ইউটাহ পেরিয়ে নদী এলো আরিজোনায়। আরিজোনায় প্রবেশ মুহূর্তে দেখা হয় সুন্দরী লেক পাওয়েলের সাথে। ইউটাহ রাজ্যের শেষ প্রান্তে। এরপর বাঁক নিয়ে আবার মেক্সিকোর উদ্দেশ্যে যাত্রা। কিন্তু প্রকৃতির নদী বাঁধা পেলো প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মানুষের কাছে। কৃষির ফলন আর বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে মানুষ বারবার বাধা দেয় নদীকে।
কলোরাডো নদীও বাঁধা পেলো ইউটাহ আরিজোনা বর্ডারে এন্টিলোপ আইল্যান্ডের কাছে। ঘোড়ার খুর আকৃতির দ্বীপ পেরিয়ে কলোরাডো যাচ্ছিলো দক্ষিণে। ক্যানিয়নের তলদেশ দিয়ে। সুউচ্চ গিরিখাদ। পানির উপরিভাগ থেকে গিরিখাদ ভূমির উচ্চতা ৭০০ ফুট। সমুদ্র পাড়ে ৭০ তলা ভবনে দাঁড়িয়ে যেমন জলরাশি দেখা যায়, এখানকার ভূমিতলে দাঁড়িয়ে তেমন নদীর জল উপভোগ করা যায়।
সুউচ্চ গিরিখাদ আঁকাবাঁকা হয়ে বেশ কয়েক মাইল পার হয়েছে। এর ভেতর কলোরাডোর নদীর গতি পথের ১৬৯.৬ মাইল বা ২৭২.৯ কিলোমিটার সর্পিল বাঁকে তৈরী হয়েছে বিশাল ক্যানিয়ন। এর নাম গ্লেন ক্যানিয়ন। প্রায় পুরোটাই ইউটাহ রাজ্যে। শেষ প্রান্তের কিছু অংশ আরিজোনাতে। এ অংশেই যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম বাঁধ দ্য গ্রেট “গ্লেন ক্যানিয়ন ড্যাম।”
কলোরাডো নদীর গ্লেন ক্যানিয়ন অংশে বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাবনা এবং গবেষণা শুরু হয় ১৯২৪ সালে। তবে হুভার ড্যাম নির্মাণের পরিকল্পনা সক্রিয় থাকায় গ্লেন ক্যানিয়ন ড্যাম এজেন্ডা থেকে বাদ পড়ে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের সাত রাজ্যে জনসংখ্যা হু হু করে বেড়ে যায়। কৃষি কাজের পানি আর শিল্প উৎপাদনে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়তে থাকে অতি দ্রুত। ১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাঁধ কর্তৃপক্ষ ব্যুরো অব রিক্লামেশন গ্লেন ক্যানিয়নে বাঁধ দেবার জন্য যুতসই জায়গা খুঁজতে থাকে। অবশেষে এ যুগের লেক পাওয়েলের এই লোকেশনে বাঁধ নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়।
পানির তোড় বিবেচনায় গ্লেন ক্যানিয়নে আর্চ গ্রাভিটি ড্যাম ডিজাইন করা হয়। উজান থেকে ভাটির দিকে স্রোতের কারণে পানির চাপ অত্যন্ত বেশি। বাধে আটকাতে হলে পর্যাপ্ত শক্তির প্রয়োজন। প্রকৌশলীরা পানির গতি, চাপ, উচ্চতা ইত্যাদি হিসাব কষে নকশা করলেন বক্রাকার কংক্রিট দেয়ালের। এরই নাম আর্চ গ্রাভিটি ওয়াল। ওয়াল যাতে পানির অতিরিক্ত চাপে না ভাঙে সেজন্য প্রয়োজনীয় শক্তির চেয়ে বেশি শক্তির কংক্রিট মিক্স ডিজাইন করা হলো। অতঃপর শুরু হলো বিশাল কংক্রিট বাঁধ নির্মাণের কর্মযজ্ঞ।
সেই ছাপান্ন সালের কথা। গত শতাব্দীর ছাপান্ন অর্থ্যাৎ ১৯৫৬ সাল। আইজেনহাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি। হোয়াইট হাউজে বসে টেলিগ্রাফ মেশিনের বোতাম টিপলেন। ক্যানিয়নের খড়খড়ে শক্ত মাটি। মানুষ দূরে থাক, মেশিনেও কাটা যায়না। মাটি কাটা কন্ট্রাক্টর সাহায্য চাইলেন রাষ্ট্রের কাছে। রাষ্ট্রপতির নির্দেশনা দরকার। আইজেনহাওয়ার বোতাম টিপে টেলিগ্রাফ বার্তা দিলেন। বোমা ফাটাও। সেনা সহায়তায় ডিনামাইট দিয়ে উড়ানো হলো মাটি। হাফ ছেড়ে বাঁচলো খনন কন্ট্রাক্টর মাউন্টেইন স্টেট কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। বানানো হলো ডাইভারশন চ্যানেল। কলোরাডো নদীর পানিকে বিকল্প পথে চালিয়ে পূর্ণোদ্যমে চলতে লাগলো বাঁধ নির্মাণ কাজ।
মূল বাঁধের কাজ পেলো মেরিট চ্যাপম্যান এন্ড স্কট কর্পোরেশন। তৎকালীন সময়ে ১০৮ মিলিয়ন ডলারে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো সরকারের সাথে। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দর ছিলো এরচেয়ে ৩০ মিলিয়ন ডলার কম। এতোবড় পার্থক্য থেকেই বোঝা যায় সর্বনিম্ন দরদাতার হিসাবে গলদ ছিলো। লাভের আশায় কোম্পানি স্বল্প মজুরির শ্রমিক খোঁজা শুরু করে। কেউ কেউ রাজি হয়। কিন্তু সাইট সার্ভিস শুরুর পরই শ্রমিকেরা বুঝতে পারে তাঁদের ঠকানো হচ্ছে। সরকারি নিয়মের তুলনায় তাঁদের কম মজুরি দেয়া হচ্ছে। মূল নির্মাণ কাজের প্রারম্ভে ৭৫০ জন শ্রমিক কাজ থামিয়ে ধর্মঘটে নামে। ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে বেতন বাড়িয়ে দিনে ৪ ডলার করা হয়। হয়তো সরকারি নীতির সাথে সেদিন বেতনের সামঞ্জস্য হয়েছিলো। কিন্তু কাজের গুরুত্ত্ব, চ্যালেঞ্জ এবং কষ্ট বিবেচনায় এ বেতন ন্যায্য মনে হয়নি শ্রমিকদের কাছে। তবুও কাজে নামতে বাধ্য করা হয়।
বিরাট কংক্রিট প্ল্যান্ট তৈরী করা হলো। ৫০ এবং ২৫ টন ক্ষমতার টাওয়ার করেন বানানো হলো। যাতে প্ল্যান্ট থেকে লোহার দড়িতে ঝুলিয়ে কংক্রিট নীচে নামানো যায়। একসঙ্গে ৯ ঘনমিটার কংক্রিট ঢালাইয়ের ক্ষমতা তৈরী হলো। উল্লেখ্য বর্তমান কালের কংক্রিট ট্রাকগুলো সাধারণত ৯ ঘনমিটার কংক্রিট বহন করে। খাড়া ওয়াল বানানোর জন্য কাঠের ফর্ম বা সাটারিং ব্যবহার করা হয়। কাঠের সাটারিং বানাতে সাড়ে ৭ ফুট উচ্চতার কাঠের ব্লক কাটা হয়। এই ব্লক দিয়ে সর্বোচ্চ ৬০ ফুট বাই ২১০ ফুট ক্ষেত্রফল সম এলাকায় কংক্রিট ঢালা হয়। এরকম ৩০০০ হাজারের বেশি ব্লক দিয়ে পর্যায়ক্রমে ১৫৬০ ফুট লম্বা এবং ৭১০ ফুট উচ্চতার এই বাঁধ বানানো হয়।
প্রকল্পে কাজ চলাকালীন একত্রে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার শ্রমিক কাজ করেছে। কিন্তু বাড়ি ফিরেছে আঠারো জন কম। তাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন নির্মাণ কালে। যদিও বলা হয়ে থাকে এই প্রকল্পে জ্যান্ত কোনো শ্রমিক উত্তপ্ত কংক্রিটে গলিত হয়ে মারা যায়নি। উত্তর আমেরিকার অনেক বড় বড় কংক্রিট স্ল্যাবের মাঝে প্রাণ লুকিয়ে আছে। অনেক জায়গার বেদীতে তাঁদের নাম লেখা আছে। অনেক জায়গায় নাম লেখা না থাকলেও সম্মান জানানোর বিজ্ঞপ্তি খোদাই করা আছে। এখানে পা রেখোনা। আমাদের বাসযোগ্য কাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে তাঁরা চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন শক্ত কংক্রিটের ভেতরে। ওঁদের জাগিও না। অসম্মান করোনা।
১৯৬৬ সালে এ বাঁধ নির্মাণ শেষ হয়। শেষ পর্যন্ত খরচ হয়ে যায় ১৩৫ মিলিয়ন ডলার। সেটি অবশ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ সহ। এখন থেকে বিদ্যুৎ আসে ১৩২০ মেগাওয়াট। আজকের নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় এটি হয়তো তেমন কিছু নয়। তবে ঐ সময়ে এটা ছিলো বিদ্যুৎ প্রাপ্তির অন্যতম বৃহৎ উৎস।
ব্রামটন, অন্টারিও, কানাডা

