আবদুল গাফফার চৌধুরীও চলে গেলেন

আবদুল গাফফার চৌধুরী

কালের স্বাক্ষী যারা ছিলেন তারা একে একে চলে যাচ্ছেন ।আমরা তাহলে আমাদেরও  জন্মের আগে যে সব ইতিহাস ছিল, ঘটনাপ্রবাহ ছিল তা জানবো কাদের কাছ থেকে ?সেই সুযোগ মনে হয় শেষ হয়ে এসেছে।

আবদুল গাফফার চৌধুরীও চলে গেলেন। তিনি দীর্ঘ সাত দশক ধরে লেখালেখি করেছেন ।তবে একটি মাত্র গানের রচয়ীতা হিসাবে তিনি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে অমর হয়ে থাকবেন । আর যত দিন বাংলাদেশ থাকবে তত দিন তার এই গান প্রতি বছর ফিরে ফিরে আসবে।গানটি যতবার ফেব্রুয়ারী মাস আসে ততবার বাংলা ভাষাভাষীদের মুখে মুখে গীত হয়। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি?’ ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের বিচারে যে সর্বকালের সেরা বাংলা গান বলে যে ২০টি গানকে নির্বাচিত করেছিলেন, তার তিন নম্বরে ছিল এটি।

- Advertisement -

তবে তিনি জীবিত থাকা অবস্তায় সব সময় একটি অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন আর তা হচ্ছে, তিনি যদি দেশকে এতই ভালবাসতেন  তবে তিন কেন দেশে থাকেননি, তিনি কেন দেশ স্বাধীন হবার পর পরই চার বছরের মাথায় প্রবাসী জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন? এর উত্তর খুজতে গেলে কিছু তথ্য পাওয়া যায় ।যেমনঃ

 “শেষ কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়ার সময় তাঁর স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। কোন চিকিৎসা বাংলাদেশে করা যাচ্ছিল না। তখন বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন, লন্ডনে নিয়ে যাও। এরপর ১৯৭৪ সালে তিনি স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য লন্ডনে আসেন। কিন্তু এরপর ১৯৭৫ সালে যখন বঙ্গবন্ধু নিহত হন, তারপর আর তাঁর দেশে ফিরে যাওয়া হয়নি,” বলছিলেন সুলতান শরিফ।

বঙ্গবন্ধুকে তিনি খুব ভালবাসতেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডেকে মেনে নিতে পারনেনি । খুব সম্ভব এই অভিমান থেকেই তিনি আর দেশে ফিরে যাননি । সেই অভিমানটা আসলে কি রকম ছিল ? এই প্রশ্নের উত্তর হয়ত এই রকমই হবে, যে দেশকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন করেছিলেন সেই দেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে।এমন একটি অকৃতজ্ঞ জাতি যে দেশে থাকে সেই  দেশে থাকার কোন অর্থ হয়না।  তাই তিনি অভিমান করে আর দেশে ফিরে যাননি।তার দীর্ঘ ৮৭ বছরের জীবনের অনেকটা সময়ই তিনি লন্ডনে কাটিয়ে দিয়েছেন।তার লন্ডনের জীবন সম্পর্ক খুব একটা কিছু জানা যায় না।কেমন ছিলেন, কিভাবে এই দীর্ঘ সময় শিকড় থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন , সেই সম্পর্কে অন্তত আমার দৃষ্টিতে তেমন কোন  লেখা পড়েনি। হয়ত তার ঘনিষ্ঠ কেউ এই বিষয়ে লেখে থাকতে পারেন কিন্ত তেমন কোন  গভীর লেখা আমার চোখে পড়েনি।তার প্রবাস জীবন সম্পর্কে যেটুকু লেখা  পেয়েছি তা অসীম,দীর্ঘ প্রবাস জীবনে গাফফার চৌধুরী আসলে কেমন ছিলেন তার খুব একটা তথ্য পাওয়া যায় না।তবে তার প্রবাস জীবন সম্পর্কে কিছু কিছু লেখা চোখে পড়েছে ।অসুস্থ স্ত্রী, এবং পাঁচ সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে তাঁকে যেরকম হিমসিম খেতে হয়েছে, সেটি তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের লেখায় এসেছে।ছড়াকার দিলু নাসের গাফফার চৌধুরী সম্পর্কে লেখেছেন  “আবদুল গাফফার চৌধুরীর মতো একজন সাংবাদিককে তখন গ্রোসারি শপে পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে’’।

গাফফার চৌধুরীকে কেউ তার প্রবাস জীবন নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি সব সময় বলে এসেছেন, তোমরা যারা দেশে থাকো,তোমাদের অনেকের চেয়ে আমি দেশের বিষয়ে ভালো জানি।দেশের বিষয়ে জানার জন্য দেশে থাকা জরুরী না।পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে দেশকে জানা যায়।

তিনি মূলতঃ রাজনৈতিক লেখাই বেশি লেখেছেন। তার সব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ যে সঠিক হয়েছিল তা কিন্ত নয় । যেমন ,তিনি ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬০ টি আসন পেয়ে জয়ি হবে বলে ভবিষ্যৎ বানী করেছিলেন কিন্ত সেটি সঠিক হয়নি ।

তিনি তার অনেক লেখাতেই আওয়ামী লীগকে কি করা উচিত এবং কি করা উচিত নয় বলে উপদেশ দিয়েছেন। সেই উপদেশগুলি অবশ্যই তিনি আওয়ামী লীগের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে দিয়েছিলেন। সেই উপদেশগুলির কতটুকুই বা আওয়ামী লীগ গ্রহন করেছে সেটি পরের কথা । তবে তিনি সব সময় বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। সেটি তিনি এই পরিবারের একজন অভিভাবক তুল্য ব্যক্তি হিসাবে করতেই পারেন।

তবে গাফফার চৌধুরী সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তাতে করে মোটা দাগে বলা যায় কয়েকটি বিষয়ে তিনি ছিলেন আপোষহীন ।

১) বঙ্গবন্ধু

২) মুক্তিযুদ্ধ

৩) বাংলাদেশ

তিনি আজীবন এই তিনটি বিষয়ের প্রশ্নে কোন আপোষ করেননি ।তিনি দীর্ঘ দিন দেশে না থেকেও দেশকে ভালবেসে গেছেন। তিনি অভিমান করে দেশে না থাকলেও প্রতিটি মুহূর্তে তিনি অশারীরিক উপস্থিতিতে দেশে থেকেছেন। এক মুহূর্তেও দেশকে ভুলে যাননি।

গাফফার চৌধুরী যে কথাটা সবসময় বলতেন, আমি পৃথিবীর যে দেশেই থাকি না কেন, আমি তো বাংলা ভাষাতেই কাজ করে যাচ্ছি।

স্কারবোরো, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent