সেই ওল্ড জিপসি


বলা হয় time is a great healer! কথাটি মিথ্যে নয়। তাই বলে রোগ মুক্তির জন্যে কি আমরা সেই ওল্ড জিপসি ম্যানের পেছনেই ছুটবো? বোরাক নাকি বিমানে মহাশূণ্যে? এই আকাশে আমার মুক্তি! কল্পনায় সেই মুক্তি মিললেও, রোগ মুক্তির জন্যে আমাদের হাসপাতালেই ছুটতে হয়।
বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক এবং বিলাস বহুল হাসপাতালগুলোর মধ্যে Vejthani Cardiac Center অন্যতম। রিসেপশন থেকে শুরু করে OPD, IPD সব জায়গায় মনোরম পরিবেশ। দেয়ালে ঝুলছে মন প্রশান্ত করা রঙিন চিত্রকলা। দেয়ালচিত্র ছাড়াও, রঙ, সহনীয় আলোছায়ার খেলা আর উত্তরাধুনিক আসবাবের বৈভব চোখের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। বলা হয়, 3H এর সমন্বয়ে নিরাময়ের উপাদানের সন্নিবেশ ঘটানো হয়, নীরবে, অজান্তে এবং নিভৃতে!
সেই যুগ কি আমরা পেরিয়ে এসেছি যখন হাসপাতালে ঢুকলেই ডেটল আর ফিলাইলের কটু গন্ধ, নিরবিচ্ছিন্ন অজানা ভয়, অনিশ্চয়তার করিডোর পেরিয়ে যেতে হয়?? তারপর দূরু দূরু বক্ষে দেখা মেলে ডাক্তার কিংবা নার্সের? এখনো কি নেই অব্যবস্থাপনা? ডাক্তারের সাক্ষাতের জন্যে দীর্ঘ অপেক্ষা? নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেই সব বিপত্তি অতিক্রম করার জন্যেই তো এসেছে আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় কাজ করার সূত্রে অনেক জায়গা থেকে সৌভাগ্যক্রমে আমন্ত্রণ পেয়েছি। একবার সিওল থেকে আমন্ত্রণ এলো। দক্ষিণ কোরিয়ার hyundai গ্রুপের বিশাল হাসপাতাল। তাঁরা আগ্রহ নিয়ে দেখালো অত্যাধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা। কিভাবে সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। কিভাবে রোবোটিক সার্জারী করা হয়। ডিজিটাল হেলথ কেয়ার নিয়েও চলছে ব্যাপক গবেষণা।
আবার বিশ্বের অনেক নামকরা হাসপাতালে নিজের তাগিদে গিয়ে ঘুরে এসেছি। সেইসব হাসপাতালে আমন্রন ছিলো না, তবে অবহেলাও ছিল না।
সিওল, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, টরোন্টো, এথেন্স, লিসবোয়া, বার্লিন, ক্লিভল্যান্ড – অনেক ঘুরেছি আমি। তবু ক্লান্ত হই নি! রোগী, ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল ব্যাবস্থাপকদের সাথে কথা বলেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অনেক সময় অতিবাহিত করেছি অপারেশন থিয়েটারে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে, এমার্জেন্সিতে।
আমার প্রচন্ড কৌতূহল প্রবণতাই আমাকে শিখিয়েছে অনেক কিছুই। জেনেছি সফল ব্যক্তিরা সহজে ধরা দেন না! যেচে গিয়ে সাক্ষাৎ করতে হয়। তবে শেখার ইচ্ছা থাকলে তাঁরা এগিয়ে আসেন।
অনেকজনকেই বলতে শুনেছি হাসপাতাল হলো রোগের চিকিতসার জন্য, সেখানে কেনো এতো বিলাসিতা! এর জবাব আমি পরে বলছি।
তার আগে সিঙ্গাপুরে khoo teck puat (কো টেক পোয়া) হাসপাতালের গল্পটা একটু বলি। কয়েক বছর আগে সিঙ্গাপুর ভিত্তিক স্থাপত্যকলা প্রতিষ্ঠান CPD র আমন্ত্রণে সেখানকার কয়েকটি নাম করা হসপিটাল দেখতে গেলাম। মাউন্ট এলিজাবেথ এবং বেশ কয়েকটি প্রিমিয়াম হাসপাতাল দেখার পর কিছুটা পরিশ্রান্ত। দুপুরে মধ্যান্হ ভোজনের পর CPD র প্রতিনিধি নিয়ে গেলেন kotekpoya হাসপাতাল দেখার জন্যে। যেয়ে দেখি সুদৃশ্য জলাধারের পাশে একটা ক্যাফেটেরিয়া এবং তার পাশে গাছপালাঘেরা লন, পাখির কলরব, ঝর্ণার হিল্লোল। সেখানে কয়েকজন হুইল চেয়ারে বসা রোগী আর পাশে নার্স বা রোগীর অ্যাটেনডেন্ট বসে গল্প করছে। কেউ কেউ আবার বৈকালিন চা পান করছে। অপূর্ব দৃশ্য।
আধুনিক হাসপাতালে প্রথাগত চিকিৎসা যেমন সার্জারী, মেডিসিন এবং নার্সিং সেবার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে নিরাময় সহায়ক প্রাকৃতিক উপাদান। কেবলমাত্র অস্রপচার, প্রসিডিওর কিংবা ঔষধ রোগাক্রান্ত মানুষকে পুরোপুরি রোগ মুক্ত করতে পারে না। রোগ মুক্তির জন্যে প্রয়োজন হয় প্রিয়জনের সান্নিধ্য, প্রার্থনা এবং ধ্যান। প্রয়োজন কাউন্সেলিং এবং রোগ প্রতিরোধী পরামর্শ, ইতিবাচক জীবনাচরণ।
পরবর্তীতে একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রিমিয়াম হাসপাতাল ডিজাইন টিম এ কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তখন এই সঞ্চিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছিলাম। সেজন্যে আমি নবতর ধারণা নিয়ে আসা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দিকপাল আর স্হপতিদের কাছে অনেক অনেক ঋণী।

 

- Advertisement -

Read More

Recent