ভাসতে শুর করেছে টরন্টোর আকাশে

ছবিপ্রেসপিক

সুবোধ কুমার দাস ভাসতে শুর করেছে টরন্টোর আকাশে। টার্কিশ এয়ার ওয়েজ তাকে পাখির মত নিয়ে উড়াল দিয়েছে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে গিয়ে নামবে ইস্তাম্বুল শহরে। সুবোধের হাত কাঁপছে লার্জ ব্র্যান্ডির গøাস। গোটা শরীরের হাঁড়গোড় যেন নড়েচড়ে গেছে, ব্যথায় অস্থির সে। ব্র্যান্ডি এনে দিতে সে এয়ার হোস্টেজকে বল্লো দুইটি এক্সট্রা এস্ট্রেন্থ এডভিল ব্যথানাশক টেবলেট এনে দিতে। মা তার কোনো কথায় না করেন না। তবু এবার কানাডা যেতে মানা করেছিলেন।

কেন যাবে বাবা আমাদের ছেড়ে এতদ্দূরে। এতদিনে আমাদের দিন ভালো হচ্ছে। তুমি এম.এ পাশ করে চাকরী পেয়েছো ভালো, টাকা-পয়সা জমাচ্ছো। তোমার ছোট তিন ভাই-বোন পড়াশুনায় ভালো এগুচ্ছে। মা ভালো কিছু পেতে হলে কষ্ট সহ্য করতে হবে। আমি ক’বছরের মধ্যে তোমাদের সবাইকে নিয়ে যাবো, তোমার ইমিগ্রেশন হলে ছোটদের সবার হবে।

- Advertisement -

কী দরকার বাবা অত দূরে অচেনা দেশে যাওয়ার? এখানেইতো ওরা ভালো করছে।

মা আমি চাকরীটা পেয়েছি, যেহেতু বড় ব্যবসায়ী শ্রী গুনধর মন্ডল স্বপ্ন দেখছেন তার মেয়েকে বিয়ে দিবেন। সে তোমার তিন সন্তানদের আমি কতদূর পড়াতে পারবো মা! তোমার একটা বড় অসুখ হলে আমি তো সবার মত সিঙ্গাপুর ব্যাংকক নিয়ে যেতে পারবো না মা! শুধু হাত কামড়াবো। আমি মা অনেক আগে থেকে স্বপ্ন দেখি এমন একটা দেশে আমরা থাকবো যেখানে সবাই মিলে-মিশে শান্তিতে থাকে শুধু ধর্মের জন্য মানুষ মানুষের শান্তিতে আগুন ধরিয়ে দেয় না। দিতে চাইলেও পারে না।

ছোট বেলা সুবোধ অনেক দেরীতে বুঝেছিলো হিন্দু বলে নিজেদেরকে অনেক নিয়ন্ত্রণে রাখতে  হবে। স্কুলে মুসলিম কোনো বন্ধুর সঙ্গে মারা-মারি ঝগড়া-ঝাটি করা চলবে না। বাবা বুঝিয়েছিলেন সামনে এগিয়ে যেতে যেমন গাড়ি চালাতে হয় সাবধানে যেন কোনো গাড়ির সঙ্গে এক্সিডেন্ট না হয়; ঠিক তেমনিভাবে জীবন চালাতে হবে। বাবা অকালে পাঁচ সন্তান রেখে মারা যেতে তার স্কুল শিক্ষিকা মা-ই তাদের খুব কষ্টে মানুষ করেছেন।

তিনি প্রথম ধাক্কা খেলেন কলেজ পড়–য়া তার বড় বোন যখন বাড়ি থেকে পালিয়ে তার ছোটবেলা জানা মুসলিম বন্ধুকে বিয়ে করলো। খুব দ্রæত মাকে চোখের সামনে এমন ভেঙ্গে যেতে দেখে সুবোধ ঘাবড়ে উঠেছিলো। তবে মা আত্মহত্যা করতে যাননি। তবে যখন ছেলেটির বাবা ও আত্মীয়স্বজন এসে মাকে তাদের সামনে অসম্মান করে বল্লোÑ এই মহিলা আমার ছেলের পেছনে নিজের মেয়েকে লেলিয়ে দিয়েছে। তখন মা গিয়েছিলেন আত্মহত্যা করতে।

ভাগ্যিস তারা সব ভাই-বোন দেখে তাকে জড়িয়ে তুমুল কান্নাকাটি শুরু করতে তিনি নিজেই ঘাবড়ে গিয়ে টের পেলেন এ তিনি কী করতে যাচ্ছিলেন! তার বাকি চার সন্তানদের কার হাতে দিয়ে যেতে চাইছিলেন! মূলত সেদিনই সুবোধ নিজের অজান্তে নিজের সঙ্গে অঙ্গীকার করে বসেছিলো সে এমন দেশে সবাইকে নিয়ে যাবে যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজের সম্মান নিয়ে নিজের মত শান্তিতে থাকতে পারে।

তিন বছর চাকরী করে সে টাকা জমিয়েছে, স্বপ্নের দেশও খুঁজে পেয়েছে। ভাগ্য ভালো বলে তার অফিসের সঙ্গে কানাডিয়ান অফিসের অনেক কাজ হয়, সে সুবাধে তার যাওয়ার সুযোগ অর্থাৎ ভিসা পেয়ে গেছে। মাকে ছোটদের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা বুঝিয়ে বলতে, অনেক কেঁদে তাকে ক’বছরের জন্যে ছাড়তে রাজি হয়েছেন। সে অনেক দিন থেকে সার্ভে করে বুঝতে পেরেছে যে, এখান থেকে ইমিগ্রেশন চেয়ে পাওয়া সম্ভাবনা খুব কম।  সেখানে গিয়ে হাত তুলে প্রাণে ভিক্ষা চাইলে ফিফটি-ফিফটি চাঞ্চ। হিন্দু হলে সম্ভাবনা একটু বেশি। তবে বাঙালি খ্রিস্টানদের মত অতটা নয়। তবু সে আশায় বুক বাঁধে। টরন্টোর ভারতীয় বংশদ্ভূত নামী আইনজীবী বাসানিও রয়কে তার আইনজীবী হিসেবে পেয়ে গেছে। উনার হাতের কেস রিজেক্ট হয় খুবই কম। সব শুনে তিনি আশাবাদ জানিয়েছেন। কেসটা তিনি গুছিয়েছেন খুব ভালোভাবে। তাকে প্রায় গুলি করে মেরে ফেলার প্ল্যান থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে সে পালিয়ে এসেছে। সব ঠিকঠাক শুধু সমস্যা হচ্ছে তার নিজকে নিয়ে। এক হলো খুব বিশ^াসযোগ্যভাবে মিথ্যা সে বলতে পারে না। দ্বিতীয় হচ্ছে তার ছোট থেকে ভয়ে-ভয়ে বড় হওয়ায় নিজের ওপর কনফিডেন্টস না থাকা। তবে তার কেস হিয়ারিং যাওয়ার আগে এক অভিনব ঘটনা ঘটে গেল তার জীবনে। সারা নামের মেয়েটি তার জীবনে এসে তোলপাড় করে তুললো সব। সারার জন্যেই সে মা-ভাই-বোনদের এক সুন্দর জীবনের স্বপ্নের দিকে পা ফেলে-ফেলে এগুচ্ছিল তা থেকে বেরিয়ে গেল। প্রচÐ মার খেতে হলো টরন্টোর ম্যাক্সিকান গ্যাং লিডারের কাছে। তবে তাতে তার আফসোস হচ্ছে না। সে ভেঙ্গেছে তার ভীতু জীবন, সে নিজকে অদম্য করে তুলেছে। যা সারার সঙ্গে এ ঘটনায় না জড়ালে তার হতো না। তার নিজের থেকে বন্ধু সেলিমের জন্যে আর সারার জন্যে বেশি কষ্ট হচ্ছে। এয়ার হোস্টেজ দু’টো এডভিল ট্যাবলেট ছোট গøাসে পানি এগিয়ে দিলেন। এক সঙ্গে দু’টো এক্সট্রা এস্ট্রেন্থ এডভিল তাকে দ্রæত ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। ব্র্যান্ডিতে আবার চুমুক দিয়ে সুবোধ পেছনে সিটে হেলান দিয়ে ভাবে সিনোর মার্তিনো আমি সহসা আবার আসছি। বুঝেছি আপনারা পড়ে ঠিক বুঝতে পারছেন না ঘটনা আসলে কী? কেনোইবা সুবোধ অদম্য আবার টরন্টো ফিরে আসতে চায়। তাহলে একটু খুলেই বলি।

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent