নায়াগ্রার জন্মকথা

আমরা কানাডাবাসী বা দেশ-বিদেশের পর্যটক নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখতে যাই। অনেকে বারবার যান— চমৎকার, শক্তিশালী, মাধুর্যময়, দুর্দান্ত, অত্যাশ্চর্য, স্বর্গীয় এবং সম্মোহনী কয়’টি বিশেষণ প্রয়োগ করলে স্মরণীয় উপায়ে মেইড অফ দ্যা মিস্টে দাঁড়িয়ে জলপ্রপাতের সত্যিকার বর্ণনা হয় সেটি জানতে। এখানে উল্লেখযোগ্য মেইড অফ দ্যা মিস্টের বিশেষ নৌকোগুলো ১৮৪০ সাল থেকে দর্শনার্থীদের জলপ্রপাতের গোড়ায় নিয়ে যাচ্ছে। উপরোক্ত বিশেষণগুলোর যে কোনও একটি নায়াগ্রা জলপ্রপাতকে বর্ণনা করতে পারে না—যেটিকে উত্তর আমেরিকার নায়াগ্রা অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের রত্ন বলা হয়। আমরা বিস্মিত হই, মনে যখন প্রশ্ন জাগে—নায়াগ্রা জলপ্রপাতের বয়স কত হতে পারে? কিভাবে জলপ্রপাত শুরু হয়েছিল? নায়াগ্রা এস্কার্পমেন্ট কি? নায়াগ্রা জলপ্রপাতের চিত্তাকর্ষক প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য এবং জায়গাটির রহস্যময়তা জানতে কার না আগ্রহ জন্মে! সেই আবেদন মেটাতে অবশ্যই নজর দিতে হবে নায়াগ্রার ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের দিকে। তারই প্রয়াসে এই অনুচ্ছেদের অবতারণা—লক্ষ লক্ষ বছর ধরে কিভাবে প্রাকৃতিক ক্রমবিকাশ বায়ু, জল, স্থল ও বরফ নায়াগ্রার ভূমিকে বর্তমানের মহিমায় এনে দাঁড় করিয়েছে!

- Advertisement -

প্রকৃতির এই অত্যাশ্চর্য দর্শন করতে প্রতি  বছর ৩০ মিলিয়ন পর্যটক আসেন সারা বিশ্ব থেকে। এ এক অপার্থিব সৌন্দর্যের লীলাভূমি, জীবনে অন্তত একবার যা চাক্ষুষ করা চাই সম্ভব হলে—আত্মহারা হতে হয় যার অনুপম মাধুর্যে।

নায়াগ্রার বরফ যুগের কিছু  ঘটনাবলী :

প্রথমেই দেখা যাক নায়াগ্রা ও নায়াগ্রা অঞ্চলের তুষার যুগ ও সেই সময়ের কিছু ঘটনাবলী।পুরো উত্তর আমেরিকা যখন তুষারাবৃত ছিল, তখন নায়াগ্রা অঞ্চলের বরফের ঘনত্ব ছিল গড় অনুমানিক ৩০০০ ফুট। এক হাজার ফুট বরফের ঘনত্ব পৃথিবী পৃষ্ঠে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে যে চাপ প্রয়োগ করত তা ২৮ টন ওজনের সমান।

শেষ তুষার যুগের সমস্ত গলে যাওয়া বরফের সমপরিমাণ জল আজ যদি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উত্তোলন করা যায়—তবে সমুদ্রপৃষ্ঠ ২০০ ফুটেরও (৬০ মিটার) বেশি নিচে চলে যাবে।

নায়াগ্রা জলপ্রপাতের দক্ষিণে এক তেলের কূপ থেকে যে শিলা পাওয়া গেছে তাতেও ৩০০০ ফুট ঘনত্বের শিলা স্তর দেখা যায়।

নায়াগ্রার ভৌগোলিক অবস্থান :

নায়াগ্রা অঞ্চলটি একটি বিশাল সমভূমির অংশে অবস্থিত যাহা পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রলম্বিত। লরেন্টিয়ান হাইল্যান্ডস (কানাডিয়ান শিল্ড বা উত্তর-পূর্বাংশের প্রাচীন শিলা গঠিত ক্ষয়প্রাপ্ত মালভূমি) থেকে দক্ষিণে এবং টরন্টো থেকে ৬৯ কি.মি. দক্ষিণ-পূর্বে নায়াগ্রা জলপ্রপাত অবস্থিত। অন্টারিওর নায়াগ্রা অঞ্চল এবং আমেরিকার নিউ ইয়র্ক স্টেটের মাঝখানে জলপ্রপাতটি স্থিত। এই সমভূমি গ্রেট লেক অঞ্চলের নিম্নভূমির একটি ছোট অংশ। যেখানে লেক সুপিরিয়র, লেক মিশিগান, লেক হুরন, লেক এরি এবং লেক অন্টারিও এই পাঁচটি লেককে সমষ্টিগতভাবে গ্রেট লেক বলা হয়।

নায়াগ্রার জলবায়ু বিগত ৫০০০ বছর ধরে প্রায় বর্তমান আবহাওয়ার মত রয়েছে।গ্রেট লেকগুলোর রয়েছে বিশ্বের প্রায় ২০% বিশুদ্ধ জল সরবরাহ করার সক্ষমতা। এই জলের উৎস (৯৯%) হিমবাহ থেকে গলিত লেকে আটকে পড়া বিপুল জলরাশি।

নায়াগ্রা উপদ্বীপ বস্তুত একটি ‘ইসথমাস’, যাকে দুই পাশে বড় লেকসহ ভূমির এক সংকীর্ণ স্ট্রিপ বলা যায়—দুটি বৃহত্তর ভূখন্ডের মাঝে সংযোগ সৃষ্টিকারী এই অংশেই জলপ্রপাতের প্রবাহ।

নায়াগ্রার এস্কার্পমেন্ট :

নায়াগ্রা এস্কার্পমেন্টের (একটি মালভূমি যার একপাশ দীর্ঘ খাড়া ঢাল, আর অপরপাশ নিম্ন উচ্চতা বিশিষ্ট) ওয়াটারটাউন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক স্টেটে শুরু হয় এবং কানাডার অন্টারিও প্রদেশের ম্যানিটুলিন দ্বীপ বরাবর পশ্চিম দিকে প্রলম্বিত হতে থাকে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্টের উইসকনসিন এবং ইলিনিয়স পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। দৈর্ঘ্য ১৬০৯ কিলোমিটার এবং সমুদ্র তলদেশের মত শীতল পরিবেশযুক্ত প্রান্ত বলে মনে করা হতো। অন্টারিওর হ্যামিলটন থেকে নিউ ইয়র্ক স্টেটের ওয়াটারটাউন পর্যন্ত এই অংশে এস্কার্পমেন্টটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬০০ ফুটেরও বেশি উপরে ছিল।

নায়াগ্রা এস্কার্পমেন্টের সৃষ্টি জলপ্রপাতের জন্ম বা উত্থানের চূড়ান্ত অগ্রগতি দিয়েছিল। প্রাকৃতিকভাবে এটির সূচনা ছাড়া নায়াগ্রা জলপ্রপাত কখনও বাস্তবায়িত হতে পারত না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে নায়াগ্রা এস্কার্পমেন্ট দক্ষিণ দিক থেকে ক্ষয়িত হতে থাকে।ভূতাত্ত্বিকদের মতে এস্কার্পমেন্টটি হিমবাহের আগে গঠিত ও বিদ্যমান ছিল। যে ভূমিটি দক্ষিণ অন্টারিওতে অন্তত ২৪৫ মিলিয়ন বছর বা তারও আগে প্যালিওজোয়িক যুগের সমুদ্র থেকে উদ্ভূত হয়েছিল।এই অঞ্চলের অর্ডোভিসিয়ান এবং সিলুরিয়ান শিলাগুলো ৪৩০-৪১৫ মিলিয়ন বছর আগে নায়াগ্রায় পাওয়া প্রাচীনতম শিলা বলা হয়।

এস্কার্পমেন্ট একটি ফাটল লাইন নয়, ক্ষয়ীভবনের পরিণামে এর সৃষ্টি । এটিকে ভূতাত্ত্বিকভাবে “কিউয়েষ্টা” বলা হয়, একদিকে মৃদু ঢাল এবং অন্য দিকে উঁচু খাড়া ঢালসহ একটি সেতুবন্ধ তৈরী হয়েছিল।

নায়াগ্রা অঞ্চল অতি প্রাচীনতম সমুদ্রের এক অংশ :

বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর সৃষ্টি হয় ৪,৬০০ মিলিয়ন বছর আগে। তৎকাল থেকে প্রকৃতি সুনিপুণভাবে নায়াগ্রা নামে পরিচিত ভূদৃশ্য যেটি সমুদ্র তলদেশের দৃশ্যের বিবর্তনের দ্বারা একটি অভাবনীয় শিল্পকর্ম তৈরি করে চলেছে।

কয়েক শত মিলিয়ন বছর আগে নায়াগ্রা অঞ্চলটি একটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় নোনা জলের সমুদ্রের তলদেশে ছিল বলেও অনুমান। প্রাচীনতম নমুনাগুলো আজ নায়াগ্রার মাটির গভীরে পাওয়া যাচ্ছে যার নিদর্শন আজও আমাদের মহাসমুদ্রের তলদেশে দেখতে পাওয়া যায়।

প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে ক্রিটেসিয়াসের (জুরাসিক সময়কাল) শেষের দিকে এবং টারশিয়ারি (শিলা সৃষ্টির সময়কাল) পিরিয়ডের শুরুতে—বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন যে মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপ এলাকায় একটি বিশাল গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই সংঘর্ষের ফলে প্রচুর পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে এক বিপর্যয়কর পরিবর্তন ঘটায় জলবায়ুতে। যার ফলে ডাইনোসরসহ অন্যান্য অনেক জীবজন্তুর বিলুপ্তি ঘটে।

এই ঘটনাচক্র নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে—তবে এতে সামান্য সন্দেহ নেই যে জলবায়ু বরফ যুগের পর একটি নাটকীয় পরিবর্তন দেখিয়েছে।

নায়াগ্রায় উইসকনসিন হিমবাহ :

২৩,০০০-১২,০০০ বছর আগে নায়াগ্রা এস্কার্পমেন্টেটি  ২-৩  কিলোমিটার পুরু উইসকনসিন হিমবাহ নামে বরফের চাদরে আবৃত ছিল।

প্রথম দিকের উইসকনসিন হিমবাহ ৬৫,০০০ বছর আগে নায়াগ্রা অঞ্চল এবং উত্তর আমেরিকার বেশিরভাগ অংশ জুড়ে ছিল। এই হিমবাহটি ৫০,০০০ বছর আগে পশ্চাদপসরণের সময় থেকে প্রায় ১৫,০০০ বছর ধরে চলছিল।

ক্ষয়িষ্ণু হিমবাহটি ২০,০০০ বছর পূর্বে আবার কিছুটা অগ্রসর হলেও—বার হাজার বছর আগে চূড়ান্ত পশ্চাদপসরণ শুরু হয় এবং প্রায় ৪,০০০ বছর ধরে ধীরে-ধীরে সর্বাংশে শেষ হয়ে গিয়েছিল।

হিমবাহ পিছিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে গলিত পানির স্তর ক্রমশ নিচু স্থানে নেমে চারটি হ্রদ তৈরি করেছিল:

হিমবাহী হ্রদ অ্যালগনকুইন – (লেক সুপিরিয়র,লেক মিশিগান এবং লেক হুরন সহ বর্তমান এলাকা)

হিমবাহী হ্রদ ওয়ারেন – আকারে ছোট, বর্তমান লেক এরি নামে পরিচিত

হিমবাহী হ্রদ ইরোকুয়েস – কানাডার বর্তমান লেক অন্টারিও

হিমবাহী টোনাওয়ান্ডা –  আমেরিকার নিউ ইয়র্ক স্টেটের পশ্চিম এলাকা

হিমবাহগুলো কোথাও কোথাও ৪.৮ কিলোমিটার পর্যন্ত পুরু ছিল। ১.২ কিলোমিটার (১ মাইল ) ঘনত্বের বরফ প্রতি বর্গফুট ভূমিতে ১৫০ টন চাপ প্রয়োগ করে। অনুমান করা হয় যে এসব হিমবাহের ওজন ভূপৃষ্ঠকে ২০০ ফুট অবনমিত করেছিল। হিমবাহ পিছু হটলে ভূমি উত্থিত হতে শুরু করে যাকে হিমবাহের রিবাউন্ড বলা হয়।

উইসকনসিন হিমবাহ উত্তর দিকে পিছিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পরিণামে জলের বেশ কয়েকটি নির্গমদ্বার তৈরি হয়েছিল:

লেক অ্যালগনকুইন (হুরন লেক) থেকে লেক ইরোকুইস (লেক অন্টারিও) পর্যন্ত একটি নির্গমদ্বার

লেক অ্যালগনকুইন (হুরন লেক) থেকে নিপিসিং লেক হয়ে অটোয়া উপত্যকায় একটি নির্গমদ্বার

লেক ইরোকুয়েস (লেক অন্টারিও) থেকে মোহাক ভ্যালি (রচেস্টার) হয়ে হাডসন নদী পর্যন্ত একটি নির্গমদ্বার

হিমবাহের রিবাউন্ড থেকে জমির ক্রমাগত উত্থান শেষ পর্যন্ত (নায়াগ্রা নদী বাদ দিয়ে) এই সব নির্গমদ্বারগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

হিমবাহের সময়কালে এবং তার পরেও কিছুটা সময়, নায়াগ্রার জলবায়ু ছিল আর্কটিক। গাছপালা ছিল তুন্দ্রা এবং আর্কটিক প্রাণীজগত সম্বন্ধীয়।

হিমবাহী লেক ইরোকুয়েস :

লেক ইরোকুয়েস (লেক অন্টারিও) ও  লেক ইরি প্রায় একই গভীরতা ছিল দীর্ঘ সময়। মধ্য উইসকনসিন হিমবাহের পশ্চাদপসরণে প্রাচীন হ্রদ যাহা বর্তমান লেক অন্টারিও অববাহিকা দখল করে তৈরি হয়েছিল। এই লেকটিকে লেক লুন্ডিও বলা হত। হিমবাহ সরে গেলে জমির রিবাউন্ড প্রক্রিয়ার কারণে লেক লুন্ডির পানি কমে যাওয়ার পর এটি লেক ইরোকুয়েস অধুনা লেক অন্টারিও নামে একটি ছোট হ্রদে পরিণত হয়।

লেক অন্টারিওর জল পূর্বে সেন্ট লরেন্স উপত্যকা জুড়ে থাকা বিশাল হিমবাহের বরফ দ্বারা আটকে ছিল। তখন এই হ্রদের একমাত্র নির্গমদ্বার ছিল রোম এবং ইউটিকা, নিউ ইয়র্ক স্টেট যেখানে জল মোহাক এবং হাডসন নদী উপত্যকার মাধ্যমে সমুদ্রে প্রবাহিত হয়েছিল।

যখন উইসকনসিন হিমবাহ সেন্ট লরেন্স ভ্যালির উত্তরে পিছু হটেছিল, তখন কয়েক বছরের মধ্যে লেক অন্টারিওর পানির স্তর সমুদ্রপৃষ্ঠে নেমে আসে।

গত দশ হাজার বছরে হ্রদের জলের স্তর বর্তমান স্তরে বেড়েছে কারণ লেক অন্টারিওর পূর্ব প্রান্তে তার হিমবাহের রিবাউন্ডে ভূমির উত্থান অব্যাহত ছিল।

হিমবাহী লেক লুন্ডি :

পঞ্চাশ হাজার বছর আগে একটি বিস্তৃত হিমবাহ নায়াগ্রা এস্কার্পমেন্টটের উপর স্থাযী হয়েছিল এবং দক্ষিণে গলিত জলকে আটকে রেখেছিল। এটি লেক লুন্ডি নামে একটি বিশাল হিমবাহী হ্রদ তৈরি করেছিল।

হিমবাহটি উত্তর দিকে পিছিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে রোম, নিউ ইয়র্ক স্টেটে একটি নিম্ন জলের নির্গমদ্বার তৈরি হয়েছিল যার ফলে লেক লুন্ডির দ্রুত নিষ্কাশন হয়েছিল। হিমবাহটি এতটা পরিমাণ গলিত জলকে বড় স্তরে আটকে রেখেছিল যে নায়াগ্রা উপদ্বীপ এবং এস্কার্পমেন্ট একটি বড় হ্রদ দ্বারা আচ্ছাদিত হয়েছিল—প্রকৃত পক্ষে লেক অন্টারিও, হুরন এবং লেক এরি তিনটি মিলে তখন একটি হ্রদ ছিল।

হিমবাহের ধারাবাহিকভাবে পশ্চাদপসরণে ও ক্রমবর্ধমান ভূমির উত্থানে লেক অন্টারিও, লেক এরি ও হুরন হ্রদ পৃথক হয়ে যায়।

হিমবাহী লেক টোনাওয়ান্ডা ও নায়াগ্রার জন্ম :

শেষ উইসকনসিন হিমবাহের পশ্চাদপসরণ দিয়ে হিমবাহী লেক টোনাওয়ান্ডা সৃষ্টি হয়েছিল। হ্রদটি নায়াগ্রা নদীর পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল এবং পশ্চিম নিউ ইয়র্কের বেশিরভাগ এলাকা রচেস্টার পর্যন্ত জুড়ে ছিল। আয়তনে বড় হলেও অগভীর ছিল। নিউইয়র্কের রচেস্টারে পূর্ব উপকূল বরাবর পানি ছিল মাত্র চার ফুট গভীর।

প্রথমে লেক টোনাওয়ান্ডার একমাত্র জলের নির্গমদ্বার ছিল রোম, নিউ ইয়র্ক স্টেটে লেক লুন্ডির মতো। ক্রমবর্ধমান ভূমির উত্থান এই নির্গমদ্বারটি কেটে দিলে জলকে অন্য দ্বার খুঁজতে হয়েছে।

টোনয়ান্ডা হ্রদ ৪০০ মাইল নায়াগ্রা এস্কার্পমেন্টটে পাঁচটি ছোট-বড় জলের নির্গমদ্বার সৃষ্টি করেছিল। তবে  প্রধান নির্গমদ্বারটি ছিল অন্টারিওর কুইন্সটনে এবং নিউ ইয়র্ক স্টেটের লুইস্টনে। এখানেই নিষ্কাশিত জল নায়াগ্রা এস্কার্পমেন্টের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল—মহান নায়াগ্রার জলপ্রপাতের জন্ম হয়েছিল। এই জলের প্রবাহ আজও প্রধান নির্গমদ্বার হিসাবে অব্যাহত রয়েছে।

লেক এরি তখন অনেক বড় ছিল এবং নায়াগ্রা নদীর প্রস্থ আজকের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। পিছিয়ে যাওয়া হিমবাহ বর্তমানে নায়াগ্রা নদী নামে পরিচিত একটি ছোট এবং অগভীর নদীও সৃষ্টি করেছিল। আজ আমরা যেখানে প্রপাতের জল বহনকারী নদীটি বয়ে চলতে দেখছি।

হিমবাহটি উত্তরে পিছিয়ে যাওয়ার সাথে-সাথে, উন্মোচিত অনেক নিচু জমিতে জল অনুসরণ করে— এর ফলে লেক এরি অববাহিকা এবং টোনাওয়ান্ডা হ্রদ নিষ্কাশন হতে থাকে। এই জল নিষ্কাশনের ফলে নিউ ইয়র্ক স্টেটেও ভূমি উন্মোচিত হয়ে জলপ্রপাতের সৃষ্টি করে। কানাডার অন্টারিওতে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের নিকটে বর্তমান গ্র্যান্ড আইল্যান্ড এবং থ্রি সিস্টার দ্বীপপুঞ্জ এবং কুইন ভিক্টোরিয়া পার্কও উন্মোচিত হয়েছিল।

কুইন্সটন-লুইস্টনে নায়াগ্রা এস্কার্পমেন্টে :

বারো হাজার বছর আগে নায়াগ্রা নদী শেষ পর্যন্ত নায়াগ্রা এস্কার্পমেন্টের প্রধান জলের প্রবাহে পরিণত হয়েছিল।লেক এরির জল এস্কার্পমেন্টের উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে আরো বৃহত্তর লেক অন্টারিওতে নেমে আসে।

এই সময়ে অন্টারিওর কুইন্সটন থেকে নায়াগ্রা পর্যন্ত লেক অন্টারিওর জলে নিমজ্জিত ছিল। লেকের উচ্চতা  কুইন্সটনে নায়াগ্রা এস্কার্পমেন্টের গড় স্তরের ১১ মিটারের (৩৫ ফুট) মধ্যে ছিল। জল এস্কার্পমেন্টের উপর দিয়ে নিচে প্রবাহিত হওয়ার সাথে সাথে হিমবাহের উপাদান এবং নায়াগ্রা এস্কার্পমেন্টের চুনাপাথরের  মধ্য দিয়ে নায়াগ্রা গর্জের গঠন শুরু করেছিল।

নায়াগ্রা জলপ্রপাতের জন্মস্থানটি ড. রয় স্পেন্সার নামে একজন ভূতাত্ত্বিক আবিষ্কার করেছিলেন। আজ সেই স্থানটি ‘রয় টেরেস’ নামে পরিচিত।

তখন পানির প্রবাহের হার ছিল বর্তমান প্রবাহ হারের মাত্র পঁচিশ শতাংশ। বিজ্ঞানীরা গণনা করেছেন যে জলপ্রপাত দিয়ে প্রবাহিত জলের পরিমাণ ছিল প্রতি সেকেন্ডে ৩৭,৫০০ ঘনফুট।

হিমবাহটি আরও উত্তরে পিছিয়ে গেলে জলের প্রবাহ বিভিন্ন স্থানে পলির বাধা খুলে দেয় যাহা জলকে সমুদ্রে সরে যেতে দেয়, ফলে লেক অন্টারিওর জলের স্তর কমে যায়।

বিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিয়েছেন যে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের পূর্ব অংশ এখনও হিমবাহের পিছু হটার প্রতিফলনের অংশ হিসাবে বিবর্তনের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। পূর্ব সমুদ্র তীর বরাবর পৃথিবীর ভূত্বক উত্থিত হওয়ার সাথে সাথে গ্রেট লেক সিস্টেম থেকে জলের প্রবাহ সেন্ট- লরেন্স অববাহিকার দিকে ধীরে চলতে থাকে।

লেক এরি :

আনুমানিক দশ হাজার – পাঁচশত বছর আগে, এরি হ্রদের জলস্তর বর্তমান জলস্তরের থেকে ৩ – ৪ মিটার ওপরে ছিল। সেই সময় আপার গ্রেট লেকগুলোর জল নর্থ বে হয়ে মাতাওয়া নদী ও অটোয়া নদীর মধ্য দিয়ে সেন্ট লরেন্স নদী উপত্যকায় প্রবাহিত হয়েছিল। এর ফলে নায়াগ্রা নদীর পানি নিষ্কাশন বর্তমান প্রবাহের মাত্র এক দশমাংশেরও কম ছিল—শুধুমাত্র এরি হ্রদের নিষ্কাশনের প্রবাহ নিয়ে চলেছিল নায়াগ্রা নদী। প্রায় ছয় হাজার – পাঁচশত বছর পরে আপার গ্রেট লেকগুলোর প্রবাহ গতি পরিবর্তন করে নায়াগ্রার প্রবাহে ফিরে আসে অন্টারিওর উত্তরে ভূতাত্বিক উত্থানের কারণে।

আইসোস্ট্যাটিক (পৃথিবীর ভূত্বকের অংশের মধ্যে বিদ্যমান ভারসাম্য) রিবাউন্ড নর্থ বে এর আশেপাশের ভূমিকে উত্তোলন করে নিপিসিং হ্রদ সৃষ্টি হলে পানির প্রবাহ অটোয়া নদীর দিকে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হুরন হ্রদের দক্ষিণ তীরে ক্রমবর্ধমান জলরাশির পুরো প্রবাহটি লেক ইরি অববাহিকায় প্রবাহিত হয়। প্রবাহের এই নতুন দিকটি প্রাথমিকভাবে বর্তমান মিশিগান হ্রদের দক্ষিণ তীরে একটি প্রবাহের সাথে সহভাগ হয়েছিল। কয়েকশ বছর ধরে লেক এরি বেসিনের জলস্তর ৩ – ৪ মিটার বেড়ে নায়াগ্রা নদীর মধ্য দিয়ে প্রবাহ বৃদ্ধি করেছিল। এই বর্ধিত প্রবাহ বর্তমান নায়াগ্রার একটি সরু উপত্যকার দক্ষিণে গর্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু হয়েছিল।

নায়াগ্রায় এত অপরিসীম জলের উৎস কোথায়?

কানাডার গ্রেট হ্রদ হল ভূপৃষ্ঠে বিশ্বের বৃহত্তম মিঠা জলের জলাধার, যাহা বিশ্বের মোট মিঠা জল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ।গ্রেট লেকগুলোর জলের পরিমাণ এতটা বিপুল যে তা—পুরো  উত্তর আমেরিকাকে প্রায় এক মিটার (৩.৫ ফুট) জলে নিমজ্জিত করার ক্ষমতা রাখে।

বিস্তৃত এই কানাডার অসংখ্য নদীর জলের স্রোত প্রবাহিত হয়ে  গ্রেট লেকে এসে মিলিয়ে যায়, উত্তরে সুপিরিয়র লেক থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন লেক অতিক্রম করে জলের প্রবাহ নায়াগ্রা হয়ে লেক অন্টারিওতে এসে পড়ে।এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে তারপর সেন্ট লরেন্স নদীর অববাহিকা অতিক্রম করে  আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়ে নিষ্পন্ন হয়। জল সর্বদাই সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়, এবং কানাডার ভূমি পশ্চিম থেকে পূর্বে গ্রেট লেক বেসিনের মধ্য দিয়ে নীচের দিকে ঢালু, কিন্তু নায়াগ্রা নদী যদিও আসলে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়।

সত্যিকারভাবে গ্রেট লেকগুলোর এক শতাংশেরও কম জল বার্ষিক ভিত্তিতে পুনর্নবীকরণযোগ্য, বর্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ জল দ্বারা। বাকিটা শেষ বরফ যুগের বা “জীবাশ্ম” জলের উত্তরাধিকার। গ্রেট লেকগুলোতে সব সময় জল স্থায়ীভাবে রয়েছে কারণ তারা বৃষ্টিপাত, তুষার পাত, শিলাবৃষ্টি এবং ভূগর্ভস্থ জল থেকে পুনরায় পূরণ বা নবীকরণের উপর খুব বেশি নির্ভর করে।

নায়াগ্রা জলপ্রপাতের ভবিষ্যৎ কী?

নায়াগ্রা জলপ্রপাত ক্রমাগত ক্ষয় হতে-হতে বিগত বার হাজার পাঁচশত বছরে ৭ মাইল পিছিয়ে গেছে। বর্তমান ক্ষয়ের হারে নায়াগ্রার অবস্থান থেকে এরি হ্রদ পর্যন্ত অবশিষ্ট ২০ মাইল অবক্ষয় হতে আরো কত যুগ লাগবে সেটি নিয়ে ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানীগণও সম্ভাব্য অনুষঙ্গ নিয়ে অংক কষে যাচ্ছেন। অংকের অনেক ফল এমনটাই দেখাতে চায়—সেখানে আর জলের প্রপাত হবে না, এরি ও অন্টারিও লেকের মাঝে একটি নদী দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে।

তবে আনন্দের কথা এই যে, ক্ষয়ের হার বর্তমানে ধীর লয়ে নেমে এসেছে—দুটি প্রধান কারণে ক্ষয় মন্থর হয়েছে বলে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ বলছে। প্রথমত চুনাপাথরের বিশেষ শিলা যেটির উপর দিয়ে বর্তমানে পানি প্রবাহিত হচ্ছে এটির বৈশিষ্ট্য অনেকটা ক্ষয় প্রতিরোধী। দ্বিতীয়ত জলপ্রপাতকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং ডাইভারশনের কারণে প্রবাহের ক্ষিপ্রতা কমেছে, ক্ষয়ের হারটিও তাই হ্রাস পেয়েছে ব্যাপকভাবে।

বস্তুত জলপ্রপাতের প্রবাহের ফলে যে ক্ষয় হয় সেটি শতভাগ অনুমান করা বিজ্ঞানীদের পক্ষেও সম্ভব নয়। তবে ক্ষয়ের যে পরিণাম সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব আন্তর্জাতিক যৌথ কমিশনের। আন্তর্জাতিক সীমানা জল চুক্তিতে দিনের সময়, রাতের সময় ও পর্যটন মৌসুমে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের উপর ন্যূনতম প্রবাহের পরিমাণ কমিশন নির্ধারণ করে।

ক্ষয়কারী শক্তিগুলোর মধ্যে প্রধানত রয়েছে পতিত চুনাপাথর দ্বারা নরম শেলগুলোর জল প্রবাহের সাথে ঘর্ষণ ক্রিয়া।

আমরা আজ যে হর্সশু জলপ্রপাত দেখে অভিভূত হই তা নিয়েও ভূবিজ্ঞানীদের গবেষণার অন্ত নেই। যে শিলার উপর দিয়ে খাড়া হয়ে জল ৫০ মিটারেরও বেশি উচ্চতা থেকে নিচে পড়ছে— পরবর্তীতে কখনো এই ৭৯০ মিটার চওড়া প্রধান শিলার পতনও ঘটতে পারে তবে তার সময়কাল বা আদৌ ধসে পড়বে কী না সঠিক অনুমান সহজ নয়। তবে কখনো সেটি ঘটলে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের অবস্থান নিশ্চয়ই পরিবর্তন হবে এ আশংকা সকলের। শিলার পতন বা ধসের প্রভাবে ক্ষয় দ্রুত হতে পারে। বর্তমান অবস্থানের বদল হয়ে তখন নূতন এক রূপরেখার সৃষ্টি হবে। পুনরায় স্থিতিশীল অবস্থানের বিকাশ বা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত জলপ্রপাত তুলনামূলকভাবে দ্রুত পিছিয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

গ্রেট লেক বেসিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নায়াগ্রা নদীর ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তনের ওপরও নির্ভরশীল। এমন কী  ভূবিজ্ঞানীদের মডেলগুলোর মাঝে বেসিনের শুকিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতও রয়েছে—আইসোস্ট্যাটিক রিবাউন্ড গ্রেট লেক অববাহিকায় নায়াগ্রা নদীর মধ্য দিয়ে পানির প্রবাহকে সব সময়ই অল্পবিস্তর প্রভাবিত করে চলছে। সমস্ত বিষয় বিবেচনা করে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে সম্ভবত এখন থেকে ২,০০০ বছর পরে নায়াগ্রায় আমেরিকান দিককার জলপ্রপাত শুকিয়ে যেতে পারে।

এখন থেকে ২৫,০০০ – ৫০,০০০ বছর সময়কালের মাঝে জলপ্রপাত বর্তমান ক্ষয়ের হারে চললেও, পিছিয়ে চলতে চলতে এরি হ্রদ পর্যন্ত অবশিষ্ট ২০ মাইল অবক্ষয় হয়ে একটি খরস্রোতা নদী দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতেপরে, এমন ধারণাও রয়েছে। সেখানে জলপ্রপাত হারিয়ে যাবে তখন।লেক এরি ও লেক অন্টারিওর মাঝের সেই খরস্রোতা নদীতে তখন পর্যটকরা নৌযানে চড়ে প্রমোদ বিহারে মত্ত হবে হয়তো।

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent