আমাদের জীবনে প্রতিটি লোক থেকে শিক্ষামূলক পাঠ নেয় সম্ভব, এমন কী বৈশিষ্ট্যহীন আমার অপছন্দের লোক হলেও। সুখ-দুঃখ উদাসীন কোন নেতিবাচক ব্যক্তির জীবন বিশ্লেষনেও শিক্ষণীয় থাকতে পারে, শুধু চাই প্রচেষ্টা, ইহ ভুবনে আত্মোন্নতির শরণস্থলের।
এমন কাজ সাফল্যের সাথে সম্পাদন করার পথ নির্দেশনা রেখে গেছেন দ্বিতীয় শতাব্দীর রোমান সম্রাট ম্যারকাউস এ্যাউরেলিয়াস। যিনি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা রেখে গেছেন তার লেখা ‘ধ্যান’ বইটিতে যেখানে রয়েছ জীবনের প্রতিফলন।
ম্যারকাউস বলে গেছেন, “ দিনের শুরুতে নিজে নিজে ধরে নাও, আমার আজ হয়ত অকৃতজ্ঞ, অরুচিকর, ঔদ্ধত্য, কুটিল ও পরশ্রীকাতর কাউর সাথে দেখা হতে পারে”, তারপর নিজেরা ভাব, “এসব নেতিবাচক সব কিছু এদের জীবনে ঘটে তারা বুঝতে পারে না কী ভাল ও কী মন্দ বা তাদের অজ্ঞানতা ও মূর্খতার কারণে ”।
তথাপি এদের সব চারিত্রিক গর্হিত বৈশিষ্ট্য লক্ষ করে ম্যারকাউস বিবৃত করেন যে, আমাদের বুঝতে হবে নেতিবাচক ব্যক্তি দুর্বল আচরণ করলেও সে-ব্যক্তি আমাদের মতই এক মানুষ, “ তার বুদ্ধিমত্তার বিকাশ হয় নি, তবে ঈশ্বর প্রদত্ত সবকিছুই হয়ত রয়েছে”।
কারো নেতিবাচক দিক আমাদের নিকট বিরক্তকর বা বিব্রতকর হতে পারে কিন্তু হঠাৎ বল প্রয়োগের দ্বারা পরিবর্তন করতে পারি না যেটি তার অন্তর্গৃহ স্বভাব। আমাদের অন্তর্গৃহ ব্যক্তিগত গুণ, মৌলিক মানসিক শক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে, এসব বিশ্লেষণ করে ম্যারকাউস ব্যাখ্যা দিয়েছেন, “ আমার মাঝে যে অসুন্দর বা অপ্রীতিকর দিক রয়েছে তা রাতারাতি পরিবর্তন করতে পারবে না অন্য কেউ, আমিও সাথীদের নেতিবাচক দিক থাকলে একদম ঘৃণা করে দূরে সরিয়ে দিতে পারব না”।
মানব জীবন, যেমনটা দেখেছি গড়ে উঠেছে আমাদের একে অপরের সাথে সহযোগিতা করার নিপুণ দক্ষতার উপর। সহযোগী হয়ে সুন্দর এক পারিপার্শ্বিকতা সৃষ্টি করতে পারি, নচেৎ বিরক্তি কিংবা বিতর্কপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে মুখ ফিরিয়ে যার যার পথে চলে যেতে পারি।
ইতিবাচক শিক্ষার পাঠ নেয়া:
একটু ভাবুন আপনার জীবন সান্নিধ্যে প্রতিটি লোকের প্রতিফলন আপনার নিজের উপর, যেমন আপনার মাতা-পিতা, পিতামহ-মাতামহী, ভাই-বোন, নিকট আত্মীয় স্বজন, শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব বা অন্যরা। প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে ভাবুন। কারো ইতিবাচক সহানুভূতি পাবেন, কারো নেতিবাচক অসহনীয় দিকও পাবেন, তাই নয় কী? ইতিবাচক সহানুভূতির দিক থেকে নিশ্চয়ই স্পষ্ট রূপে সুনির্দিষ্ট শিক্ষনীয় পাঠ পেতে পারেন। কিন্তু যাদের নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য তাদের কাছ থেকে কী শিক্ষা নিতে পারবেন?
ম্যারকাউসের লেখায় কে ইতিবাচক বা কে নেতিবাচক তাহা জানা সম্ভব নয়, কারন তিনি শুধু জানিয়েছেন কী কী ইতিবাচক শিক্ষা পেয়েছিলেন। তিনি পিতামহের কাছ থেকে শিক্ষা পেয়েছিলেন, “ নীতিশাস্ত্র এবং বিগড়ে যাওয়া মেজাজের শাসন পদ্ধতি”।মায়ের কাছ থেকে শিখেছিলেন ধর্মানুরাগ,পরোপকারিতা ও নিজেকে সংযত রাখা অসৎ কর্ম এমন কী অসৎ চিন্তা থেকে। সরল স্বাভাবিক জীবন হতে হবে এমন,যার মাঝে থাকবে না ধনীর আড়ম্বরের প্রভাব। অন্যেরা তাকে শিখিয়েছে বিনয়, শিষ্টতা, অকিঞ্চিৎকর কিছুতে সময় ব্যয় না করা, সত্যকে ভালোবাসা ও ন্যায়পরায়ণতাকে প্রাধান্য দেয়া। আমাদের জীবনে এক অসাড় চিন্তা থাকে যে নিজ ভ্রান্তির জন্য অপরকে দায়ী করা। এই নেতিবাচক অনুভব রেখে কোন কিছুর সুরাহা হয় না, তবে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এখানে ম্যারকাউস আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, “ আমি নেতিবাচকদের অশুভ চারিত্রিক দিক লক্ষ্য করে আমার মাঝে ঐ ধরণের কোন অসাধু দিক থাকলে দূরীভূত করার প্রচেষ্টা করি”। তার এই সাধারণ অভিপ্রায় আত্মোন্নতির স্বার্থে এবং নিজেকে অটল সংকল্পে নিবেদিত করতে, চারপাশের বিভ্রান্ত লোকদের প্রভাব যেন তাকে বিচলিত করতে না পারে। এমন শিক্ষণীয় পাঠ ম্যারকাউস আমাদের জন্য রেখে গেছেন।
আমাদের বেষ্টনিতে যে বিশ্ব তাকে আমরা সহজে বদলে দিতে পারি না, অপরকে পরিবর্তন করা কঠিন কাজ, তবে আমরা নিজেদের প্রণোদিত করতে পারি পরিস্থিতি অনুসারে, নিজেদের কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব যাতে সুফল হয়ত আসতে পারে। সাথে এটি ও লক্ষ রাখা চাই যেন নেতিবাচকদের কোন প্রকার অসন্তোষজনক দিকে আমরা ঝুঁকে না পড়ি বা আমাদেরও নেতিবাচক প্রভাবে ফেলে দেয়। এভাবেই আমরা যা কিছুর মুখোমুখি হই না কেন, নিজ নিজ নৈতিক উৎকর্ষের গুণে সুখী থাকতে পারি।
প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিকভাবে চলা:
ম্যারকাউস তার জীবনে অনেক সুশীল ও গুণীজনদের সান্নিদ্ধে ছিলেন, তাদের সাহচর্যে চলার পথে প্রশংসনীয়ভাবে সমৃদ্ধ থেকেছেন, তাদের জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। তিনি বলে গেছেন, আমরা মনে দুঃখ অনুভব করি যে কোন প্রকার বিচ্ছেদ, পরাজয় বা ক্ষয়ক্ষতি হলে, কেননা আমরা স্বীকার বা গ্রহণ করতে চাই না পরিবর্তনশীল এ জগতে কোন কিছুই স্থায়ী নয় বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলে কিছু নেই। ম্যারকাউসের দর্শনের সাথে অনেক নিরপেক্ষ বা সুখ-দুঃখে উদাসীন ব্যক্তি একমত পোষণ করেছেন। তারা বলতে চেয়েছেন সত্যিকারভাবে জীবনতো আদতে সাময়িক, আনন্দ, নিরানন্দ কিংবা আকাঙ্ক্ষা, নিরাশা সবার জীবনে ঘটে, ঘটে চলে যায়। সংযত হয়ে সবকিছু সহজভাবে নেয়াটাই সুখময় হতে পারে।
ম্যারকাউস উপলব্ধি করেছেন জীবনে সবই পরিবর্তনশীল, এমন কী প্রকৃতিও হাত ধরাধরি পরিবর্তিত হচ্ছে অনবরত, আজ যে ফুল সুগন্ধ ছড়াচ্ছে কাল সে-মলিন। আমরা জীবনে কখনো সিদ্ধকাম হতে পারবো না যদি প্রাকৃতিক রীতি বিরুদ্ধ গতিধারা অতিক্রম করে চলি। আমরা অবশ্যই সুখী হতে পারবো না যদি অনাদি ও অনন্ত উল্লাস, আনন্দই শুধু চাই এবং চেষ্টা করি সব আমাদের ইচ্ছানুরূপ আনন্দের হবে।
অন্যদিকে আমরা যদি এর বিপরীতে নিজ সামর্থ্যের দ্বারা জীবনের যে কোন পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে একাত্ম হতে সক্ষম হই তবে আমরা স্থায়ী সুখ পেতে পারি।
এমন সুখী জীবন হতে পারে বাহ্যিক কামনা-বাসনা, তীব্র আকাঙ্ক্ষা, বিরক্তি ও অসন্তোষ দ্বারা মনকে নিয়ন্ত্রনের অতীত।
ম্যারকাউস আমাদের উৎসাহ দিতে চেয়েছেন পারিপার্শ্বিক জগৎকে নিগূঢ়ভাবে বুঝতে, সমাজ, সম্প্রদায়, পরিবার সকলের মাঝে অপ্রত্যাশিত ঘটনা বহুল জীবনে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে। আমাদের প্রণিধান করা চাই, আজকের দিন ক্ষণে যে কোন দুর্ঘটনায় বিমর্ষ হতে পারি বা আপ্লুত হতে পারি চমৎকার, মনোরম, আনন্দঘন পরিবেশে, তবে সব দিন ক্ষণই ক্ষণস্থায়ী। এর মর্মার্থ বা গুরুত্ব বিশ্লেষণ করলে বলা যায় প্রলোভন, প্রতিযোগিতা করে লাভ নেই, জীবন সমুদ্রের তীরে প্রতিটি ঘটনা অন্তহীন বালু রাশির মাঝে এক একটি কণিকা মাত্র। ক্ষণকালীন সব ঘটনা প্রবাহের মাঝে, আমরা বিরক্তির মাঝে ভগ্নহৃদয়ে থাকতে পারি। পরন্তু ম্যারকাউস আশ্বস্ত করে বলেছেন, বিরক্তি জীবনে আসবে প্রত্যাশিত কী অপ্রত্যাশিতভাবে যাহা জীবনেরই অংশ, মনের স্বেচ্ছায় এসব গ্রহণ করতে হবে। আমরা প্রত্যেকে অনেক সময় অপরের বিরক্তির কারণ হতে পারি, নিজ ভুল ভ্রান্তির ফলে, কিন্তু অন্যের বেলায় এমনটা ঘটলে সুবিবেচনায় নিয়ে সহানুভুতিশীল হতে চেষ্টা করি না।
ম্যারকাউসের উক্তি, “ কেহ আমাকে ঘৃণা করলে সেটি তার ব্যাপার বা বিষয়।কিন্তু আমি সকলের প্রতি সদয় ও কল্যাণময় হতে চেষ্টা করব”।
তিনি বলেন আমাদের ঘিরে অনেক কিছু অহরহ ঘটছে, লক্ষ রাখা প্রয়োজন তাৎক্ষণিক কার কেমন প্রতিক্রিয়া হচ্ছে একক ঘটনায়, ব্যক্তিগতভাবে সবাই নিজের অন্তরীণ বহিপ্রকাশ কেমন দেখাচ্ছে, কে কতটা অকৃত্রিম।
তিনি আরো বলেন, আমরা প্রাত্যহিক জীবনের অনেক ঘটনা থেকেই শিক্ষা নিয়ে আত্মোন্নতির চেষ্টা করতে পারি, নিজের আত্মবিশ্লেষনের মাঝে দৃঢ়সঙ্কল্প রেখে ভাল কিছু করার চেষ্টা করতে পারি। আমাদের প্রত্যেকের নাগালের মাঝে হয়ত রয়েছে সততা, উৎকর্ষের আকর, শুধু হৃদয়ঙ্গম করা চাই।
টরন্টো, কানাডা

