বিপর্যস্ত অনুভব

কালঘুম থেকে জেগে উঠে দেখল সব ফাঁকা, চারপাশ শূন্য। আবীর রাঙা আকাশ, নীচু হয়ে যেন গিলে খেতে আসছে। হাত-পা-শরীর অবশ, নড়নের শক্তি নাই। চক্ষু দুটি খোলা শুধু আকাশের পানে। চোখ ছাড়া যেন সব মরে গেছে। ধীরে ধীরে কয়েকটা লম্বা শ্বাস নেয় ভেতরটা যেন নড়ে উঠে একটুখানি। হাতটা তুলে আস্তে আস্তে। অনেক কষ্ট হয়। ফর্সা সুডৌল বাহু কালসিটে রক্তজমাট, কাদালেপা চিত্র আঁকা। দু’হাতের আঙ্গুলে আঙ্গুলে জড়িয়ে মাথার উপর হাত দুটো তুলে আড়মোড়া ভাঙতে চায়, চেষ্টা করে। অনেকক্ষণ সময় লাগে, একসময় সমর্থ হয় আড়মোড়া ভাঙার, নড়ে উঠে ভেতর থেকে শরীর ব্যথায়। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে। কোমরের নীচ থেকে যেন নিঃস্বাড় হয়ে গেছে। আরো ধীরে আরো সময় নিয়ে উঠে বসে একসময়। মাটির ভিতর গেঁথে যাওয়া অর্ধেক শরীর টেনে। লোহুর ধারায় ভিজে গেছে মাটি। রক্ত জমে তামার মতন কালো হয়ে গেছে জমিন। ফর্সা পা দুটোর অবস্থা হাতের চেয়েও খারাপ। আকাশের রঙিন আলো কালো মেঘে ঢেকে যেতে থাকে।

- Advertisement -

কোনো কাপড় নাই গতরে। এইহানে এই উলঙ্গ অবস্থায় ঘুমাইয়াছিলাম কেন? রোজ কেয়ামত হইয়া গেছেনি?

─আশেপাশে তাকায়, কোথাও কেউ নাই। বামপাশে চোখ যায়। গর্ত মতন জায়গায় লাশের উপর লাশ। এতক্ষণে নাকে লাগে পচা বিশ্রী গন্ধ। ইন্দ্রিয়গুলো জাগছে আস্তে আস্তে। শরীরের নখ, দাঁতে কাটা চামড়ার ছিলা জায়গাগুলো জ্বলে জ্বলে উঠছে। ঘাড়, বুক, ঠোঁট, তলপেট সব ভারি, মোচড় দিয়া উঠে ঈশাণ কোণের কালবৈশাখী ঝড়ের মতন মাথার মাঝে ঝড়। ওরে আল­¬ারে… এক চিৎকার দিয়া..উ..উ..উ বিলাপ করতে থাকে। খানিক পরে নিজেই মাটি, রক্তমাখা আঙ্গুল মুখে চাইপা নিজের কান্দন থামায়। ভয়ে শিউরে উঠে, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে কেউ নি আছে। দুশমনের দুশমন হারামীর বাচ্চা সব ছারখার করছে। শেষ কইরা দিছে এক্কেবারে। মনে পড়তে থাকে, আল­ার গজব না, ঝড় তুফান না, কেয়ামত না। হারামীর বাচ্চা মানুষ, ভিনদেশী মানুষ। বন্দুক লইয়া, আগুন জ্বালাইয়া, বুটে লাত্থি মাইরা, খুঁচাইয়া খুঁচাইয়া মানুষ মারতাছে পাখির লাহান। আর…আর কুলসুম বিবির মতন তরতাজা মাইয়াদের জ্যান্ত খাইয়া ফালাইতাছে। যেমনে পারে তেমনে যতজনে পারে ততজনে। জানোয়ারের অধম ব্যবহার। কামড়াইয়া খামচাইয়া, দাঁত বসাইয়া শরীলটারে খাইয়া ফালাইছে। একতিল শক্তি নাই। কেউ কি বাঁইচা আছে? একজন মানুষও? এত বড় গাঁওয়ের একজন মানুষও নাই? কোনোখানে কোনো সাড়া-শব্দ নাই। আমি কেন বাঁচলাম? এই পোড়াকপাল লইয়া কই যামু এখন? ধীরে ধীরে চিন্তাশক্তি কাজ করে আর শরীরের কষ্ট বাড়ে অসহ্য রকম।
মনে হইতে থাকে ভাত খাইয়া পান মুখে দিয়া ফুলির বাপের লগে বিছানায় গেছিল। পান খাইয়া রঙ্গ-তামাশা করতাছিল ফুলির বাপ। মানুষটার বড়ই রসের শরীল। তামাসা, ফুর্তি ছাড়া থাকতে পারে না একদম। কখনো মন খারাপ করে না। রাগারাগি করে না আর বউ-ঝি গো সোয়ামীর মতন। পান-খাওয়া লাল ঠোঁটে হাসি লাইগা থাকে মানুষটার।

─ কয়দিন ধইরা শুনতাছি, দেশের অবস্থা ভালা না, শহর থাইক্কা মানুষ আইতাছে এই গাঁওয়ে আর এই গাঁওয়ের মানুষ যাইতাছে আরো কুনোহানে, এমন বিপদ মাইনষের, তোমার হাসি তো থামে না ফুলির বাপ? আমাগো কোনো বিপদ হইব না তো ফুলির বাপ?
─ মুখ কালা কইরা থাকলে কি যমে আইব না, আগে এই শোলক ভাঙ্গাও। তার বাদে হাসি থামামু।
কথা ঠিক। কি আর কইব কুলসুম, লগে লগে হাসে।
হাসো হাসো, মরতে হইলে হাসতে হাসতেই মরমুনে। কে জানত মরণ খাঁড়াইয়া আছিল, দরজার বাইরে হেই সময়।

ফুলি ঘুমাইয়া ছিল দাদীর গলা জড়াইয়া ডানপাশের ভিটার ঘরে। ঘুমাইতে যাওনের আগে কইতাছিল, আইজ দাদীর লগে ঘুমামু, কাইল তোমার লগে ঘুমামু মা।
একলা বিছানায় তাই কুলসুমরে বুকে জাপটাইয়া ধরতে এত্তটুকু বাধা আছিল না। পুরুষালী শইলের গন্ধে উথাল-পাথাল কুলসুমও লোমশ বুকে মুখ ঘষতাছিল আরামে। জৈষ্ঠ্যি মাসের মাঝামাঝি সময় আম-কাঁঠালের পাকা গন্ধে ভুরভুর আর গরম ঘরে আরো গরমে মাখামাখি দুই জোয়ান শরীল ঘামে ভিইজ্যা দক্ষিণের ছোট্ট খিরকীর খানিক বাতাসে অবসন্ন হইয়া ঘুমাইয়া পড়ছিল আরামে। হঠাৎ খিরকীর ছরকাকাটা বেড়াখান উইড়া আইসা পড়ল দুইজনের উপর, সাথে অজানা ভাষার চিৎকারে কাঁইপ্পা উঠল বুকের ভিতর। থরথর কাঁপছে কুলসুম সোয়ামিরে জড়াইয়া ধইরা। লাত্থি দিয়া দরজা ভাইঙ্গা ঘরে ঢুইকা পড়ছে বেগানা পুরুষ একজন না, কয়েকজন। শরীলে কাপড় দেয়ারও সময় হইল না। পাঁচ ব্যাটারি টর্চের আলো সরাসরি কুলসুম বিবির মুখে, সেখান থেকে ঘুরে ঘুরে সারা শরীলে পড়ল টর্চলাইটের আলো। একজন আইসা টান মাইরা লইয়া গেল ফুলির বাপরে কুলসুম বিবির দুই হাতের আগল ছুটাইয়া ঘরের বাইরে। না…আ … আ কইরা এট্টা চিক্কুরই শুধু দিতে পারছিল আর সেই চিক্কুরের সাথে মিইলা গেছিল বাইরে গুলির আওয়াজ। ডানের ভিটায় ফুলি আর ফুলির দাদীর খবর কিছুই জানে না কুলসুম বিবি। খালি মনে আছে, ওর উদাম শরীর টাইনা হ্যাঁচড়াইয়া একখান গাড়ির ভিতর ফ্যালাইয়া লইয়া গেছিল ইস্কুল ঘরে। ওই লইয়া যাওনের সময় দেখছিল উঠানের মাঝে চিৎ হইয়া পইড়া রইছে ফুলির বাপ, উঠান ভাইসা যায় লোহুর ধারায়। কুলসুম বিবির বুকের সুখগুলান বানের পানির লাহান ভাসাইয়া লইয়া যায় লোহুর ধারা।
ঝকঝকা জৈষ্ঠ্যি মাসের ভরা পূর্ণিমার রাত সাদা দুধের লাহান সর পইড়া রইছে দুনিয়ায়। মনে হইতাছিল যেন বেহেস্তের বিচরায় বইসা আছিল যখন ফুলির বাপে হাসি-তামাশা করতে আছিল। দক্ষিণের খিরকীর ফুরফুরা বাতাস আর চান্দনী জীবনের সব-সুখ সব-আয়েস লইয়া আইছিল। ফুলির বাপ তুমি তো সুখ লইয়া হাসতে হাসতে চইলা গেলা। আমি কেন গেলাম না তোমার লগে? এত আজাবের বাদেও কেমতে আমার মরণ হইল না? ফুলি আমার জান কলিজা, মাগো তুই কই ? দাদীর লগে আছনি? আম্মা, আমার ফুলিরে দেইখা রাইখেন, আম্মাগো। বুক মুচড়াইয়া ফুঁপাইয়া উঠে কুলসুম বিবি আবার। বুক ফাইটা যায়, চোখে পানি আসে না। শব্দ করতে পারে না।

চারপাশে ঘাড় ঘুরাইয়া কুলসুম বিবি চিনতে চায় কোথায় আছে? গাঁওয়ের কোনো সীমানা এইডা? এমন অচেনা মনে হয়। ঘাড় ঘুরাইতে, হাত নড়াইতে জানটা বাইর হইয়া যাইতে চায়।
শরীরে যেন শিকড় গজাইয়া গেছে মাটির মাঝে।

অনেকক্ষণ চেষ্টা কইরাও উঠতে পারে না কুলসুম বিবি। গড়ান দিয়া আবার পইড়া যায় মাটির মাঝে। দেখে রাঙ্গা আসমান আন্ধার হইয়া গেছে। কালামেঘ ভিড় করতাছে হেইখানে। নিথর নীরব দুনিয়া একটা পোকারও শব্দ নাই কুনোহানে।

শরীর, স্নায়ু, মুখ, তালু, জিহŸা, গলা বুক শুকাইয়া কাঠ। থুতুও নাই একফোঁটা। পানি পানি পানি খামু। মাথার ভিতর এই কথা ঘুরে কুলসুম বিবির। প্রাণ আনচান, পানির তিষ্ঠায় বুক ফাটে কারবালার প্রান্তরে যেন পানির অভাবে মইরা যাইতাছে কুলসুম বিবি। গভীর অতলে ডুবতে থাকে চেতনা; মৃতদের ভিড়ে মৃতের মতোই পড়ে থাকে কুলসুম বিবি অচেতন।

ঝমঝম বৃষ্টি অঝরে ঝরছে, ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে চারপাশ। অচেতন কুলসুম বিবির চেতনা আসে আবার বৃষ্টির ধারায় ভিজতে ভিজতে। চোখ মেলে দেখে আকাশের কান্না। হাঁ করে মুখে নেয় বৃষ্টির পানি। ধুয়ে যায় শরীর অঝর ধারার বৃষ্টিতে।
আল­াহ আসমান থাইকা পানি ঢালতাছে। কুলসুম বিবি ভাবে, আসমান যেন পয়স্বিনী। দুধের ধারায় গতর ধুয়ে দিতাছে, শইল্যের সকল ময়লা ধুইয়া লইয়া যাইতাছে। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায় কুলসুম বিবি। বহুত কষ্ট হয়। দুই ঊরুর মাঝে যেন আগুন জ্বলতাছে। লোহুর ধারায় ভাইসা গেছে পাও। বৃষ্টির পানিতে সাফ করে নিজেকে। আর পান করে বৃষ্টির পানি অঞ্জলি ভরে। হাঁটে কুলসুম বিবি, কোনোদিকে যাবে কিছু জানে না। কোনো পথের দিশা নাই। শরীরে একখান কাপড় নাই। উলঙ্গ কুলসুম বিবি কোথায় যাবে, কতদূর কিছু জানা নাই। এই ধরণীর বুকে যেন সব মৃত। শুধু এক মানবী প্রকৃতির একটা অংশ হয়ে হাঁটে অন্ধকারে ফিকে ধূসর আলোয় ধীরে ধীরে। বৃষ্টি ধরে আসে, স্থির হয়ে থমকে যায় যেন শূন্য চরাচর পৃথিবী। শুধু হেঁটে চলে কুলসুম বিবি আর আকাশে কালো মেঘ উড়ে যায়। একসময় কালো মেঘের ফাঁকে উঁকি দেয় ভাঙা চাঁদ।

পানি থেকে উঠে আসে কলিম, হারুন, ইসরাত। বৃষ্টি থাকতে থাকতে ওরা পার হতে চায় এই গ্রাম। ধুম ঝড়-তুফানের শব্দের সাথে ওদের গুলি আর গ্রেনেডের শব্দ মিশে গেছে। ওরা তিনজন শেষ করে দিয়েছে পাশের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পাতা ক্যাম্পের শেষ বেঁচে থাকা খান সেনাটিকেও। আর অন্য দলের দুইজন উড়িয়ে দিয়েছে সাবডিভিশনের সাথে যোগাযোগের বড় সড়কের ব্রীজটি। ওদের দলের পাঁচজনের মধ্যে তিনজন ফিরে চলেছে। সবুর আর পলাশকে ভাসিয়ে দিয়েছে নদীর জলে।
মাইল পাঁচেক দূরে ব্রীজ গ্রেনেড দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার জন্য সাদেকীন আর শিবু গিয়েছিল। ব্রীজের উপর পাহারায় থাকা মিলিটারির গলাটা ক্যাচ করে কেটে ফেলে শিবু। ছুরি দিয়ে কাজ করতে ও সবচেয়ে ওস্তাদ। পূজাপার্বণে পাঁঠা বলি করত শিবু। ওর কাজ শেষ হয় আর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র সাদেকীনের মাইন পোঁতাও শেষ হয়। দু’জনে খানিক দূরে গিয়ে অপেক্ষায় থাকে ব্রীজ উড়ে যাওয়ার। ওদের কাজ না হলে অন্য দল অপারেশন চালাতে পারবে না। সময়ের মাপমতো ঠিকঠাকভাবে ওদের কাজটা হয়। মাইন ফাটার শব্দ শুনে ক্যাম্প থেকে অপ্রস্তুতভাবে ছুটে বের হয় কিছু মিলিটারি। পাঁচজনে মিলে স্কুলটাকে ঘিরেছিল অর্ধ বৃত্তাকারে, তৈরি হয়েছিল থ্রী নট থ্রী, চাইনিজ স্টেনগান, এসএমজি ও গ্রেনেড হাতে। জনা বিশ পাকসেনা ছিল ক্যাম্পটায়। প্রথম অবস্থায় পড়ে যায় পাঁচজন। বাকিরা পাল্টা আক্রমণে কেড়ে নেয় ওদের দুজনকে কিন্তু একজনও শেষ পর্যন্ত টিকতে পারে না, অসীম সাহসী জীবনবাজি রাখা বীরদের কাছে। ব্রীজ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় কিছুটা নিরাপদ। এক্ষুণি মিলিটারি আসতে পারবে না জেলা শহর থেকে। আর ঝড়ো হাওয়া বৃষ্টির কারণে ওরা দিশা পাবে না তাড়াতাড়ি, এই ভরসায় এগিয়ে চলে মুক্তিযোদ্ধা দল, শিবু আর সাদেকীনের নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করার কথা খাল পাড়ে।
মাথায় গামছা বান্ধা, তাও ভিজা আর সারা শরীর ভিজা জবজবে। রাত প্রায় ভোর হয়ে আসছে। প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির পর চান্দী পহর শান্ত নিথর চরাচর। মাথার গামছা খুলে পানি চিপে গা মুছে কলিম।
─ একটু খাড়ান ইসরাত ভাই। মাথাটা মুইছা কাপড়টা বদলাইয়া লন।
─ আবার বৃষ্টি নামবে তো?
─ নাহ, আসমান সাফ হইয়া গেছে, আর নামব না।
─ নৌকায় গিয়া বদল করলে হইত না?
─ হয়, তয় জার লাগতাছে খুব।
─ ঠিক আছে চটপট করো। কলিম পলিথিনের পুঁটলিতে পেঁচানো দুইখান শার্ট একখান চাদর, একটা লুঙ্গী আর দুইটা প্যান্ট বের করে। গাছের আড়ালে নিজেদের আড়াল করে ঝটপট বদলে নেয় পোশাক। তিনজনে আবার হাঁটা দেয়। কাপড় পালটে হাঁটতে থাকে ওরা নীরবে।
─ এই গ্রামে মেলেটারি আইছেনি? একসময় কলিম জানতে চায়।
─ আসছিল, তবে ক্যাম্প ঐ একটাই। ওখান থেকে চারদিন আগে গ্রাম মিসমার করে গেছে, দুই প্ল্যাটুন মিলিটারি আরো ভিতরের দিকে গেছে। ব্রীজ পাহারার জন্য এইখানে অল্প কয়েকজনকে রেখে গেছিল। কলিমের প্রশ্নের উত্তরে ইসরাত জানায়।
─ ব্রীজও শেষ, পাহারাদারও শেষ। এখন এরা আর বের হতে পারবে না। দু’একদিনের মধ্যে এদের খেদা দিয়া ধরতে হবে যে কয়জন ভিতরের দিকে গেছে।
─ ঠিক কইছুন ইসরাত ভাই, শালাগোর একটারেও বাইর হইতে দিমু না। আঁটঘাট বাইন্ধা আইতে হইব। উৎসাহে টগবগ করে কলিম। ফিসফিস করে কথা বলতে বলতে হাঁটতে থাকে ওরা।

হারুন এক্কেবারে চুপ। পলাশ ওর পাশ থেকে নীরব হয়ে যাওয়ার পর ও যেন একটা ঘোরের মাঝে ঢুকে পড়েছে। অস্বাভাবিক উন্মাদনায় দুই হাতে দুই বন্দুক নিয়ে বুকে ক্রলিং করে ঢুকে পড়েছিল মিলিটারির আস্তানায়। এমন উন্মাদনায় হতচকিত ওরা প্রতিরোধের আগেই পড়ে যায় জনা-সাতেক পাক সৈন্য। হারুণের ভাগ্য ভালো, সরাসরি গুলি থেকে বেঁচে যায় আর ফেলে দেয় একের পর এক পাকসেনা। হারুণের হঠাৎ উন্মাদনা বিপদে ফেলে দিতে পারত সবাইকে বরঞ্চ ত্বরান্বিত করেছে ওদের অপারেশন।

এই মাঠের পরেই খালপাড় খুব আর দূরে নয়, শিবু আর সাদেকীন নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছে। ওরা নিশ্চয়ই চলে এসেছে, না এলেও নৌকা বাঁধা আছে ওখানে। হঠাৎ তিনজন একসাথে থমকে যায়। সামনে এটা কি? ওদের থেকে খানিক দূরে ওদের দিকে হেঁটে আসছে সম্পূর্ণ উলঙ্গ এক মানবী। নিশুতি রাতে এমন দৃশ্য প্রথম অবস্থায় বুকের মাঝে শিরশির এক ভয়ের উদ্রেক করে। জ্বীন, পরী নয়তো? পর মুহূর্তে ভয় ভেঙে বদলে যায় চিন্তা। রাগে ফুঁসে ওঠে─শূয়োরের বাচ্চাদের কাম। কোনো গ্রাম থেকে ধরে এনেছে ?

উন্মাদের মতন বেঘোরে হেঁটে যাচ্ছে কুলসুম বিবি, ধীরগতি খুঁড়ায়ে খুঁড়ায়ে হাঁটছে, মাথা নীচু করা। কোনো কিছুরই খেয়াল নাই, ঘোরের ভিতর নিশিধরা মানুষ যেন। কোথায় যায়, কেন যায়? জানে না, শুধুই হাঁটে। সামনে তিনজন জলজ্যান্ত মানুষ কিছুই চোখে পড়ে না। পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় কলিম ডাকে─

─ বইন গো, ও বইন কই যান? শুনতে পায় না কুলসুম। হারুন এগিয়ে যায়, দ্রুত গায়ের চাদর খুলে জড়িয়ে দেয় কুলসুমের গায়। কুলসুম থামে, চেতনা ফিরে পায় যেন। ভয়ে শিউরে উঠে দৌড়ে পালাতে চায় কিন্তু পারে না, পা চলে না। কলিম এগিয়ে এসে বলে, ভয় পাইয়েন না বইন। আমরা আফনার ভাই।
ভরসার চোখে তাকায় কুলসুম
─ কই যাইতাছেন?
─ জানি না। এই প্রথম মানুষের সাথে কথা বলে কুলসুম। আতঙ্কগ্রস্ত ভাঙ্গা গলার স্বর।
─ আইয়েন আমরার লগে। কুলসুম হাঁটে ওদের সাথে। ওর গতি খুব ধীর। এভাবে চললে আলো ফুটে যাবে ইসরাত বলে। কলিম বলে,
─ আমি কান্ধে তুইলা লই?
─ পারবে?
─ হ পারুম। বইন গো আইয়েন আপনারে আমি লইয়া যাই। কুলসুম কিছুই বলে না। কলিম কাঁধে তুলে নেয় কুলসুম বিবিকে। মাইলখানেক পথ চলে ওরা এভাবে। কুলসুম মনে হয় অচেতন হয়ে গেছে। কোনো সাড়া শব্দ নাই।
নৌকায় সাদেকীন আর শিবু ঘাঁপটি মেরে বসে আছে। ওদের সাড়া পেয়ে আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে নৌকা নিয়ে। কুলসুম সত্যি অচেতন হয়ে গেছে। নৌকার ভিতর ওকে শুইয়ে দিয়ে, রওনা দেয় ওরা দ্রুত।

ওদের ছক করা রাস্তা অনুযায়ী ওরা এগিয়ে চলে অপারেশন শেষে। ব্রীজ উড়িয়ে দেয়া হয়েছে সদরের দিক থেকে মিলিটারি আসতে পারবে না, তাই বড় একটা উত্তেজনা অপারেশনের ধকলের পর কিছুটা নিশ্চিত হয়েই চলছিল ওরা। ঘণ্টা তিন যেতে পারলেই ভোরের আগে পৌঁছে যাবে ক্যাম্পে। অন্ধকারে নিঃশব্দে পানি কেটে এগিয়ে যাচ্ছে ওদের নৌকা।

পলাশ আর সবুরের জন্য মনটা খারাপ হয়ে আছে। হারুন বেশি ভেঙ্গে পড়েছে। এমন চুপ হয়ে থাকাটা ঠিক না। সাদেকীন কথা বলানোর চেষ্টা করেছে কয়েকবার কিন্তু নির্বাক হয়ে গেছে যেন হারুন। মহিলাটির করুণ অবস্থা বুকের ভিতর আগুন জ্বেলে দিচ্ছে। পাকিস্তানি হারামীর বাচ্চারা নারীর ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলছিস। জুতার নীচে পিষে মারতে ইচ্ছা করছে। সবুর মোটে পনের বছরের কিশোর। অল্প ক’দিন হয় যোগ দিয়েছিল ক্যাম্পে। এত তাড়াতাড়ি চলে গেল কিন্তু মায়াময় মুখটা চোখে ভাসবে আজীবন। কি সাহসিকতায় ছুটে গিয়ে মিলিটারির ঘাঁটির ভিতরে ছুড়ে দিল গ্রেনেড। যার ফলে ওরা ছত্রখান হয়ে গেল আর ভয় পেয়ে বেরিয়ে আসার সাথে সাথে একেকটাকে ধরাশায়ী করতে পারল ছোট্ট ওদের দল। একটুখানি অমনোযোগী হয়ে খুশিতে বলে উঠেছিল, ব্যাটাদের ছ্যারাব্যারা কইরা দিছি। মাথাটা একটু উঁচুতে উঠতেই কোথা থেকে একটা গুলি লেগে গেল। চোখের উপর দৃশ্যটা ভেসে উঠছে বারবার। সাদেকীন ভাবতে চায় না। এমন ভয়াবহতা সারাক্ষণই দেখতে হচ্ছে তবু আজ কেন যেন খুব কষ্ট হচ্ছে। ছোট ভাইটার বয়েসি সবুর প্রথমদিন থেকেই ওর দৃষ্টি কেড়েছিল। হঠাৎ শিবু হিসহিস করে উঠে, সাবধান। খানিক দূরে রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে মিলিটারির দুটো ট্রাক। এ দুটো কোনোদিক থেকে এল? কলিম বলে,
─ দিমু নি উড়াইয়া।
─ না, ইসরাত বলে আমাদের এখন অ্যাটাক করা ঠিক হবে না। ওদের সঠিক সংখ্যা অবস্থা জানা নাই। আমাদের সাথে গোলাবারুদ অল্প পরিমাণ। তাছাড়া একজন রোগী আছে সাথে।
দ্রুত তীরের একটা ঘন ঝোপের ভিতর ওরা নৌকা নিয়ে লুকিয়ে থাকে। খানিক পরে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়, সাথে মানুষের চিৎকার। অসহায়ভাবে ওরা ফুঁসতে থাকে। সামনের গ্রামের অসহায় মানুষগুলোর উপর গুলি ছুড়ছে। ঘণ্টাখানেক পর সব চুপচাপ। ট্রাকের শব্দ দূরে চলে যায়। ভোর হয়ে আসছে। এ সময়ে নদী পার হওয়া নিরাপদ না। তাই ওরা এই গ্রামে আশ্রয় নেয়ার জন্য নৌকা থেকে নেমে আসে।

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent