প্রথম দিন, দাওয়াতে

ছবিলুকাস জর্জ ওদান্ত

শুরুর জন্য জানুয়ারি মাসের একেবারে প্রথম দিনটিকেই বেছে নিলাম। তার আগের দিন ৩১ ডিসেম্বর রাতে পরিচিত এক বড় ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত। সেখানে ইলিশ মাছের পাতুরি, সাদা পোলাও থেকে শুরু করে নানা জাতের খাবার, সেগুলো খেতে খেতে ভবিষ্যতের কথা ভাবছিলাম। এই ভাত ছাড়া থাকবো কীভাবে? “এই তো কয়েক মাসের ব্যাপার, তারপরে ইচ্ছে মতো খাবো” বলে মনকে প্রবোধ দিলাম।

সকালে ঘুম ভেঙে দেখি বুলেটপ্রæফ কফি রেডি। বাদামি রঙের ফেনা দেখে কে বলবে এটাতে দুধ বা ক্রিম নেই।

- Advertisement -

“এই বাদামি রঙ কীভাবে?” জানতে চাইলে ব্যাটারিচালিত একটা যন্ত্র দেখিয়ে বউ বলল, “এসব ঘুটনি এখন ওয়ালমার্টে পাওয়া যায়।”

কফিতে বাদামি রঙ আমার দরকার হয় না। অফিসে অনেক দিন থেকেই বøাক কফি খাচ্ছি, স্বাদ বা বাহারের কথা ভেবে কী হবে, চিনি-দুধ দিয়ে বানানো কফি বা চা যে ক্ষতিকর সেটা সেই কতদিন থেকেই তো জানা। তা সত্তে¡ও বাহারে বিভ্রম জাগানো বাটারমেশানো সেই কফি খেতে একদম খারাপ লাগলো না। বরং ভিন্ন স্বাদের কারণে একটু মজাই পেলাম।

দুপুরে ডিম ভাজি, মানে ওমলেট, আর সে কারণে ডিমের সাথে লাল পেঁয়াজ এবং কিছু মাশরুম। বাটার তো আছেই, দেখলাম সাদা লবণের পরিবর্তে গোলাপি রঙের লবণ। কাঁচের বোতলে নাম লেখা হিমালয়ান সল্ট।

এটা আবার কেন?

হ্যাঁ, এটাই। কারণ, সাদা লবণ রাসায়নিকভাবে পরিবর্তিত, দেখতে গৌর হলেই সাধু হয় না, তলে তলে সে সাদা চিনির মতোই শয়তানের হাড্ডি। আর মিনারেল বলতে তাতে আছে সোডিয়াম এবং ক্লোরিন। কিন্তু হিমালয়ান সল্টে আছে ৮২ রকমের মিনারেল।

হিমালয়ান পিংক লবণে ৮২ রকমের মিনারেল! কারখানায় পরিশোধন করার সময় সমুদ্রের জলে পাওয়া লবণে থাকা ৯২ রকমের মিনারেলের বেশিরভাগই বিদায় করে দেয়। একই ঘটনা ঘটে চিনির বেলায়। পরিশোধন করে সাদা করতে গিয়ে গুড়ের মিনারেল সব বিদায় করে দেয়া হয়, তাতে করে এটা আর খাবার থাকে না, হয়ে পড়ে শয়তানের হাড্ডি। চিনি যে শয়তানের হাড্ডি সেটা নিয়ে বিস্তর কথা আকাশে-বাতাসে। পরে না হয় সেটা নিয়ে বিস্তারিত বলা যাবে। আপাতত, হিমালয়ান সল্ট দিয়ে বানানো ডিমের ওমলেট খাওয়া যাক। খেতে মন্দ না, তবে সাথে পরাটা বা রুটি না থাকাতে প্লেটটাকে কেমন যেন অসহায় দেখাচ্ছে।

বললাম, “কিছু শাক-সবজি কি খাওয়া যেতো না? আর ডাল খেতে তো অসুবিধা নেই। নাকি আছে?”

: আছে, ডালে সমস্যা আছে। প্রোটিন থাকলে কী হবে ডালের মধ্যে কার্ব গিজগিজ করছে। শোনো, তোমার যতখুশি তত সবজি খাবে সন্ধ্যায়। লতার বাসায় দাওয়াত, সেখানে নানা পদের সবজি রান্না করেছে। আর সালাদ থাকবে, মাছ-মাংসও থাকবে। কাজেই ভুলেও ভাত বা পোলাও খাবে না।

: কিন্তু, ওই মাছ-মাংস কি ক্যানোলা তেল দিয়ে রাঁধেনি?

: সমস্যা তো সেটাই। কী আর করা, শাক-সবজি, মাছ-মাংস সবই তো ক্যানোলা তেলে রান্না। আচ্ছা, একদিন খেলে কিছু হবে না। আর লতাকে বলে দেব এরপর থেকে দাওয়াত দিলে আমাদের জন্য এক্সট্রাভার্জিন অলিভ অয়েল না হলে সরিষার তেল দিয়ে রান্না করা তরকারি রাখতে।

সন্ধ্যায় লতার বাসায়। লতা এক নারী যার প্রতি ভাগ্যদেবী হয়তো সুপ্রসন্ন ছিল না, ফলে যে ডালে সে বাসা বাঁধে সেই ডালই ভেঙে পড়ে। ষোল বছরের এক মেয়েকে নিয়ে এই প্রবাসে টিকে থাকার সংগ্রাম করে যাচ্ছে। আমাদের মতো যে কয়েকটি পরিবার প্রবাসের নির্মমতার ভেতর তাকে সাহস জোগায়, নানা ব্যস্ততার মাঝেও সময় করে তার খোঁজ নেয়, তাদের কয়েকজনকে সে নেমন্তন্ন করেছে।

বছরের প্রথম দিন। ছোটবেলায় শুনতাম, বছরের প্রথম দিনে ভালো কিছু খেলে কপালে সারাবছর ভালো খাবার জোটে। দাওয়াত মানে সেই ভালো ভালো খাবারের ডিপো, বিশেষ করে প্রবাসে বাঙালিদের বাসায় দাওয়াতে খাবার যেন উপচে পড়ে। কী থাকে না সেখানে? কয়েক পদের সালাদ থেকে শুরু করে ছোটবড় নানা মাছের কয়েক পদ, গরু-খাসি-মুরগির মাংসের কয়েক পদ, কাবাব কয়েক পদ, ভাত খিচুরি পোলাওয়ের কয়েক পদ, রুটি পরাটা নানের কয়েক পদ, শাক-সবজির কয়েক পদ, ভাজি-ভর্তার কয়েক পদ, তারপর দইমিষ্টি তো আছেই, সাথে শেমাই, জর্দা পোলাও, আইসক্রিম, কোক-ফান্টা, বোরহানি, আর পান যদি থাকে তো তাতে থাকে নানাজাতের মশলা।

সেই সন্ধ্যায় লতার আয়োজনও কোনোদিক থেকে কম ছিল না। মানুষজন দুই-তিনবার করে উঠে গিয়ে তাদের প্লেট ভরে আনছে। আমি বেছে বেছে সালাদ, মুরগির রোস্টের একটা টুকরা, লাউচিংরি থেকে তিন চামচ তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে খেলাম। অনেকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে, অনেকে ডায়াবেটিসের খবর জানতে চায়। বললাম, “অক্টোবরে সুগার মেপে ৮.৯ পাওয়া গেছে, ডাক্তার তাই অসুধের ডোজ বাড়িয়ে দিয়েছে।”

: হাঁটাহাঁটি করেন না? হাঁটলে তো সুগার কন্ট্রোলে থাকে।

: তা হয়ে ওঠেনা আসলে, শীতের দিনে বাইরে যাওয়ার উপায় আছে? তবে সপ্তাহে দুদিন ব্যাডমিন্টন খেলি, আর সামারে টেনিস। সেটা কি হাঁটার চেয়ে কম?

: তবুও। আর ম্যাটফরমিনের চেয়ে ভালো একটা মেডিসিন এসেছে। নামটা মনে করতে পারছি না। ওটাতে নাকি কাজ হয়।

এভাবে আলোচনা চলতে থাকে এবং দেশ-বিদেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে নানা বিষয়ের মধ্যে ঘুরে আসে। তারপর একসময় তা অসুখ-বিসুখে স্থির হয়। কার কত ঘুমের সমস্যা, কার কত উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা, এসব শুনতে শুনতে মন খারাপ হয়। ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপ যখন শরীরে বাসা বেঁধেছে, তখন আয়ু নিশ্চয়ই তরতর করে নিচে নামছে। ৫০ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে ৬০, তারপর কি সম্ভব হবে তাকে ৭০ পার করা? বাংলাদেশ ক্রিকেটের ব্যাটিং লাইনআপের কথা মনের আকাশে ভেসে ওঠে। কোনো ব্যাটসম্যান যদি কোনোরকমে ৫০ করতে পারে, ব্যাস, ধুমধাম পিটিয়ে ৬০ করতে না করতেই আউট। কিন্তু মানুষ ৫০ পার হয়ে ধুমধাম পেটাতে পারে না। তাদের শরীরে গতি কমে আসে, হাঁটতে দিলে ঘণ্টায় ২ কিলোমিটার গতিতে হাঁটতে পারে না।

ক্যালগেরি, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent