সুন্দরবন যাত্রা

ছবিমামুন সৃজন

যৌবনের বড়ো একটা সময় কেটেছে খুলনায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী চত্ত্বর ফেলে কোথাও যাবার ইচ্ছে ছিলোনা। তবু কি ভুতে ধরলো, মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্ন পূরণে প্রকৌশলী হতে খুলনা পাড়ি দিলাম। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে সগর্বে দাঁড়ানো এনেক্স ভবনের মায়া কাটিয়ে ফার্স্ট ইয়ার শেষে বিদায় জানাতে হলো প্রিয় পরিসংখ্যান বিভাগকে। স্যার সলিমুল্লাহ হলের ঠিকানা বদলে নতুন জীবন শুরু হলো লালন শাহ হলে।

জলের মাছ ডাঙায় তুললে যা হয় আমার অবস্থা তাই হলো। অপ্রত্যাশিত পড়ার চাপ আর বে-রোমান্টিক কাটখোট্টা পরিবেশ মেনে নেয়াটা ছিলো বিরাট চ্যালেঞ্জ! নস্টালজিক মন ঘুরে বেড়াতো শৈশবের বিজ্ঞান জাদুঘর মাঠ, তালতলা কলোনি, কল্যাণপুর খালের অধোয়া জল, ঢাকা স্টেডিয়াম পাড়া, রমনার বটমূল, শ্যামলী সিনেমা হল, পাবলিক লাইব্রেরির চওড়া সিঁড়ি আর নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানে।

- Advertisement -

বিশুষ্ক মরুতে বৃষ্টির ফোঁটার মতো একদিন এক ঘোষণা এলো। ম্যাকানিক্যাল ডিপার্টমেন্ট পিকনিকে যাবে। সুন্দরবন। তাও আবার সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জ এলাকায়। ছেলেবেলায় পড়েছি বাঘের আনাগোনা এখানে সবচে’ বেশি। আমি সিভিলে। তাতে কী? ম্যাকানিক্যালের বন্ধুরা যাচ্ছে। আমিও গেলাম সুন্দরবন।

জীবনে প্রথম সুন্দরী গাছ দর্শন। প্রথম গোলপাতা দর্শন। দেখতে লম্বা হলেও নাম গোলপাতা! সেই পাতায় ছাওয়া ছোট্ট একখানি ঘর। টি স্টল। নড়বড়ে বেঞ্চ বসানো। হুশ হুশ শব্দে দলবেঁধে চা খাচ্ছে সবাই। কে যেনো খবর দিলো পাশের ছোট্ট হোটেলে হরিনের মাংশ পাওয়া যায়। পড়িমরি করে দৌড়। গিয়ে দেখি ভুঁয়া।

নৌকা ভাড়া করলাম কজন মিলে। মনে আছে ‘সংগ্রাম’ ছিলো সে দলে। ৭১’এ জন্ম নেয়ায় মা ওর নাম রেখেছিলো সংগ্রাম। ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া তরতাজা ছেলেটি পাশ করার পর যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। ওর সাথে সুন্দরবনে তোলা ছবিটি আমার সুন্দরবন ভিত্তিক একমাত্র সংরক্ষিত স্মৃতি। আশ্চর্য! এরপর সুন্দরবনে অনেকবার গিয়েছি। অনেক লোকেশনে ঘুরেছি। অনেক ছবি তুলেছি। অথচ সংগ্রামের সাথে তোলা ওই ছবি ছাড়া একটিও সংগ্রহে নাই।

নৌকা ছেড়ে দিলো। দুজন মাল্লা। জব্বরের বলীর মতো নাদুশ নুদুশ শরীর। তবে সাথে কোনো অস্ত্র নেই। বনবিভাগের লঞ্চে ঘুরলে আগ্নেয়াস্ত্রসহ নিরাপত্তা কর্মী থাকে। সাধারণ মাঝিদের থাকেনা। সুন্দরবনের ভেতর অসংখ্য খাল। জনপদের কাছাকাছি নিরাপদ খালগুলিতে এরা পর্যটকদের ঘুরিয়ে আনে।

হঠাৎ গা ছম ছম করে উঠলো। শির দাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেলো। বিশাল কালো কুঁচকুঁচে সাপ। একটা হেলানো গাছ পেঁচিয়ে আছে। মাঝি অভয় দিলো।

চুপচাপ থাহেন।

এহন জোয়ার চলতেছে। সাপ নিচে নাববোনা।

এরা জলে বেশিক্ষন থাকবার পারে না।

বিশ্বাস করলাম মাঝিকে। ভয় কেটে গেলো। নৌকা আরেকটু ভেতরে ঢুকলো। জোয়ারের পানিতে ম্যানগ্রোভ বল্লমের খোঁচার মতো উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে। বল্লমের মাথায় আবার সবুজ পাতা। অদ্ভুত সুন্দর! শত শত ম্যানগ্রোভ একত্রে। হাজার হাজার! মিলিয়নস অব ম্যানগ্রোভ। তাইতো! ভুলেই গিয়েছিলাম সুন্দরবন বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট।

শুরুতে পাখিদের কাকলি ছিলো বেশ জোরালো। মনে হলো সেটা থেমে গেছে। বেশ নীরবতা। বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ ধ্বনি ছাড়া শব্দ নাই। আবার শির দাঁড়ায় শীতল স্রোত। মনে পড়লো বাঘ আসার আগে নাকি সব নীরব হয়ে যায়। পশু পাখির আনাগোনা থাকেনা। তাকিয়ে দেখি সবার মুখ শুকনো। নাদুশ নুদুশ মাঝি ভাইয়েরা বোধহয় টের পেয়ে গেলেন আমাদের ভয়।

‘ভাইডি, ভয়ের কিছু নাই। জায়গাডা এরমই। এট্টু বাদে সোন্দর জিনিস দ্যাখবার পারবেন।’

কথা শেষ না হতেই কে যেনো চিৎকার দিয়ে উঠলো, ‘হরিণ’!!

পরম বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখলাম হরিণ। চিত্রল হরিণ। কী যে সুন্দর! একটু আগে হরিনের মাংশ খেতে দৌড়ে গিয়েছিলাম মনে পড়তেই নিজের ওপর রাগ হলো। এতো সুন্দর প্রাণী কেউ খায়? অমানবিক ব্যাপার। এদের সৌন্দর্য শুধু দুচোখ ভরে দেখতে হয়। উপভোগ করতে হয়। খেতে নেই।

দল বেঁধে হরিনের পাল। আমাদের দেখে দৌড়ে পালাচ্ছে। দু একজন আবার অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। মাঝিকে বললাম, ওরা কি খায়?

‘এক রমের গাছ পাতা।’

পাওয়া যাবে?

‘হ.., আছে। কিন্তু খাওয়াতি পারবানে না। খাওয়াতি গেলি দৌড় দেবানে। কচিখালি যাতি পারলি অবশ্য হাতে ধইরা খাওয়াতি পারবানে।’

তাইলে সেখানে চলেন।

মাঝিরা হেসে খুন। ‘হে তো ম্যালা দূর……., সমুদ্দরের কাছে।’

আমরা আর কদ্দুর যাবো?

‘এহানেই ঘুরায়ে নেবানে। সামনের জাগাডা বালা না। বাঘ আসপার পারে।’

বন থেকে ফিরতে ফিরতে বাজলো সাড়ে চারটে। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। হায় পোড়া কপাল! খাবার শেষ। আমরা কজন বাইরে সেকথা কারো মাথায়ই আসেনি। ম্যাকানিকালের তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক মিহির স্যার কোত্থেকে যেনো সামান্য বিরিয়ানি বের করলেন। মাংশের লেশমাত্র নেই। সালাদ শেষ। উচ্ছিষ্ট লম্বা একটা শশা আর গোটা পাঁচেক কাঁচা মরিচ। তা দিয়েই চড়ুইভাতি সুন্দরবনে নবাগত কয়েক বান্দরের!!

ফেরার পথে শ্যামনগর হয়ে যেতে হবে। সে পর্যন্ত রাস্তা ভীষণ খারাপ। ড্রাইভার তাড়া দিচ্ছিলেন দিনের আলো থাকতে রওনা দিতে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নামাংকিত(!) বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা বাসটি ছাড়তে ছাড়তে পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে গেলো। শীতের সন্ধ্যায় গ্রামের রাস্তাগুলো মাটি থেকে প্রথম কয়েক ফুট ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকে। বেলা পুরোপুরি ডুবে গেলে ধোঁয়ার ভেতর আঁধার নামে। অদ্ভুত আঁঠালো আঁধার। এ আঁধার দেখতে আমি সবসময়ই জানালার পাশে বসি। সহজে জায়গা পেয়েও যাই। রাতের যাত্রায় জানালা নাকি আইল, এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।

ড্রিংকস ছাড়াই হঠাৎ এলকোহলিক ঝিম ধরে এলো। সুন্দরবনের দৃশ্যগুলো জাবর কাটছিলাম। বুকটা ভীষণ হালকা লাগছিলো। আবেগের ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ টের পাচ্ছিলাম। কুয়েট আসার ছয় সপ্তাহ পর প্রথম অনুভব করলাম আমি খুলনার প্রেমে পড়ে গেছি। কুয়েটের (KUET) প্রেমে পড়ে গেছি। সে প্রেমের নাম সুন্দরবন।

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent