
ছোটবেলায় একটি মজার গল্প শুনেছিলাম অগ্রজের মুখথেকে। কোনো এক নাবিক জাহাজডুবির পর ভাসতেভাসতে এক অজানা দ্বীপে গিয়ে ওঠেন। সেই অজানাদ্বীপের গাছে গাছে ঝুলে ছিল রুটিফল। নাবিক তাইখেয়ে প্রাণে বেঁচে যান সে যাত্রা। বড়ভাই অনেক বইপড়তেন এবং কল্পকাহিনী বানানোর ব্যাপারে দক্ষছিলেন। আমরা ছোট ভাই বোনেরা ধরেই নিয়েছিলামওটা বানানো গল্প। রুটি কি কখনো গাছে ঝুলতে পারে? বড়বেলায় ব্রেডফ্রুটের অস্তিত্ব জানতে পারলাম একদিন।বাংলা অনুবাদ করে বুঝলাম ওটাই রুটিফল। এতদিনেভাইয়ের গল্পের বাস্তবতা অনুধাবন করলাম।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় এই ব্রেডফ্রুট বা রুটিফলএকটি প্রধান খাবার। এ ফলের বাইরের দিক ও ভিতরেরদিক কাঁঠালের মতই। স্লাইস করে কেটে রুটির মতো সেঁকেখাওয়া যায় এই ফল। ভাত ও রুটির মতো কার্বোহাইড্রেটও সুগার সমৃদ্ধ এই ফল খেয়ে জীবন ধারণ করা সম্ভব।ফলের মাঝখানে কাঁঠালের দণ্ডের মতো একটারিসেপ্টেকল (ভুতি) রয়েছে যাকে ঘিরে থাকে বীচি। এটিএকটি যৌগিক ফল। কাঁঠালের আঠার মতো আঠাওআছে। ভিতরে কাঁঠালের মতোই কোষ আছে। ৫০ফুটেরও বেশি লম্বা হয় রুটিফল গাছ। গাছের পাতাডেউয়া গাছের মত বড় বড়। পাতাগুলো চিরল ও মসৃণ।শাখাগুলো বিস্তৃত, বড় আকারের সবুজ পাতায় ছায়াসুনিবিড় পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে এরা।
রুটিফল গাছ কাঁঠাল পরিবারের (Moraceae) গাছ। এইফলের বৈজ্ঞানিক নাম আরটোকারপাস আলটিলিস(Artocarpus altilis)। এদের আদি বাস দক্ষিন প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলে। এই ফল ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ১৮শতকের দিকে আনা হয় কৃতদাসদের জন্য সস্তা খাবারেরউৎস হিসেবে। এখন অনেকগুলো দ্বীপের প্রধান খাদ্যহিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই খাবার। এই সমস্ত অঞ্চলেরুটিফলকে রোস্ট করে খাওয়া হয়। এটাকে ফ্রিজ করেওরাখা যায়। ওরা একে নারকেলের তেলে ভেজেও খায় যাখুব তাড়াতাড়ি প্রস্তুত করা যায়। এদের ক্রিসপি করেভাজা টুকরো প্রায় সব কিছুর সাথেই খাওয়া যায়। ওভেনেবেক করলে অথবা তেলে ফ্রাই করলে, পাউরুটি বেককরার মত সুন্দর ঘ্রাণে ভরে যায়। সেই কারণেই এইফলের নামকরণ হয় ব্রেডফ্রুট এবং তার বাংলা অনুবাদকরলে হয় রুটিফল।
শ্রীলঙ্কা থেকে একটি ব্রেডফ্রুট বা রুটিফল গাছ নিয়েআসেন একজন সামরিক কর্মকর্তা। ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়কে উপহার দেন তিনি গাছটি। ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের বোটানিক্যালগার্ডেনে পরিপূর্ণভাবে বেড়ে উঠেছে রুটিফল গাছটি।ওশেনিয়া অঞ্চলের রুটিফলের গাছ এখন ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের বাগানে। ফল এসেছে গাছ ভরে। শিকড়থেকে জন্মানো আরও একাধিক চারা বড় হয়েছে। বিশালশাখা বিস্তৃত এই গাছ সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার স্বপ্নদেখছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটানিক্যাল গার্ডেনেআছে এই গাছ। বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরালডেভেলপমেন্ট (বার্ড) এর ক্যাম্পাসে একটি বেশ বড় সরগাছে ফলসহ। এই বাগানগুলো ছাড়াও বাংলাদেশেব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে কয়েকটি রুটিফল গাছ। গাছটিবাংলাদেশের পরিবেশের জন্যও উপযোগী বলে মনে করাহচ্ছে।
যদিও আমাদের দেশে এর ব্যাপক চাষ হতে সময় লাগবেতবুও এর সম্পর্কে জানা থাকা ভাল কারণ তা থেকেইআমাদের আগ্রহ তৈরি হবে এই ফলের প্রসার ঘটানোরজন্য। সাধারণত এগুলো রান্না করেই খাওয়া হয়।আধাপাকা রুটিফলের তরকারি অনেকটা আলুর মতোলাগে খেতে। এই ফল শর্করা সমৃদ্ধ এবং একই সাথেপ্রোটিন, ভিটামিনসহ অন্যান্য উপাদানও রয়েছে। তাইভাত, রুটি, কাসাভা এবং ভুট্টা জাতীয় শর্করা সমৃদ্ধফসলের বিকল্প হিসেবেই এটা ব্যবহার করা যায়।এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অনেক দ্বীপাঞ্চলে এইরুটিফলই প্রধান খাদ্য। দিনে দিনে এই ফল ছড়িয়ে পরেমধ্য ও দক্ষিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ইন্ডিয়া, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, মাদাগাস্কার, মালদ্বীপ, ফ্লোরিডা এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়সহ বিশবের ৯০টি দেশে।
মজার ব্যাপার হল, এই ফলগুলো দেখতে ফলের মতহলেও স্বাদে রুটির মত যা পুষ্টিতে ভরপুর। এইশক্তিশালী ফল ট্রপিক্যাল দেশগুলোতে অনেক বছরধরে প্রধান খাবার হিসেবে বিরাজ করেছে। সেখানেইএগুলো জন্মাতো। একবেলার খাবারে ব্রেডফ্রুটে থাকেপ্রচুর আঁশ জাতীয় খাবার, ১০০ ভাগ ভিটামিন সি থাকেপ্রতিদিনের চাহিদা মোতাবেক এবং থাকে প্রায় ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ নিউট্রিয়েন্ট। ব্রেডফ্রুট ইন্সটিটিউটেরএথনোবটানিস্ট ডায়েন রেগোনি (Diana Ragone) জানান রুটি ফল যে কোনো স্টেজে খাওয়া যেতে পারে।যখন ছোট থাকে তখন এটা খেতে আর্টিচোকের মতলাগে, যখন এরা ম্যাচিউর করে তখন আলুর মত আরযখন এটা পেকে যায় তখন ডেসার্ট হিসেবে খাওয়া যায়।হাওয়াই দ্বীপে এটা আলুর মতন প্রধান খাদ্য হিসেবেখাওয়া হয়। তাই ওখানে একে গাছআলু (tree potato)বলে ডাকা হয়। আলুর চাইতে উন্নত মনে করা হয় এইফলকে। এতে যেমন আলুর মত কার্বোহাইড্রেট আছে, সেইসাথে আছে উন্নত মানের প্রোটিন এবং প্রচুর পরিমাণেভিটামিন ও নিউট্রিয়েন্ট।
এই কারণেই রেগোনি বহু বছর ব্যয় করেছেন এই ফলেরউপর গবেষণা করে এবং পৃথিবীর ট্রপিক্যাল অংশেরদরিদ্র এলাকায় লাগানোর চেষ্টা করে চলেছেন, যেখানেঅনেক ক্ষুধার্ত মানুষের বাস। তার মতে রুটি ফল গাছদ্রুত বাড়ে, পরিচর্যার জন্য অনেক কম পরিশ্রমের দরকারহয়, কম সার এবং কম পেস্টিসাইড দরকার হয়। একটিগাছ বছরে ২৫০ টির মত ফল উৎপাদন করে থাকে, যাএকটি পরিবারের আহার জোগানোর জন্য যথেষ্ট মনেকরেন তিনি। বড় পরিসরে চাষ করলে রুটি ফল একজন কৃষকের পরিবারের খাদ্যের চাহিদা মিটিয়ে ব্যবসা করতেপারে।
বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে এই ফল এবংপ্রচুর গবেষণা হয়েছে এর উপর। এই ফলের গুরুত্বউপলব্ধি করে গবেষণা হয়েছে ক্যান্সার, হার্টের অসুখ, ইনফ্লামেশন ইত্যাদি অসুখ নিরাময়ে এই ফলের ভূমিকানিয়ে। এমাইনো এসিডে পরিপূর্ণ এই ফল। আমাদেরশরীরের বিল্ডিং ব্লক হলো এমাইনো এসিড। এরাইআমাদের শরীর গঠনে বেসিক কাজ করে, অঙ্গ সংগঠনেএবং অর্গানগুলোকে সচল রাখতে বিরাট ভূমিকা রাখে।ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এক স্টাডিতে জানা যায়রুটিফলে প্রয়োজনীয় এমাইনো এসিডগুলো পূর্ণ মাত্রায়রয়েছে এবং সেই সাথে প্রচুর পরিমানে রয়েছেphenylalanine, leucine, isoleucine and valine। এতেপ্রচুর পরিমাণে এন্টিঅক্সিড্যান্ট আছে। হার্টের জন্য এইফল খুবই উপকারী। এতে প্রচুর পরিমানে আঁশ রয়েছে যাউচ্চ রক্তচাপ এবং হাইপারটেনশনের ঝুঁকি কমায়।রুটিফলে প্রচুর পরিমাণে পটাসিয়াম রয়েছে যা হার্ট ফেলকরার ঝুঁকি কমায়। চুলের বৃদ্ধির জন্য ভাল ভূমিকা রাখেএই ফল এবং সেই সাথে খুশকিও দূর করে। আরওঅনেক গুণাবলী রয়েছে এই ফলের যা প্রবন্ধের স্বল্পপরিসরে প্রকাশ করা দুষ্কর।
বিদেশী ফল এদেশে আমদানি করে এদেশের মাটিতে ব্যাপক ভাবে চাষ করার ব্যাপারে অনেক দ্বিমত রয়েছে।এমন সমৃদ্ধ একটি ফল এদেশের মাটিতে চাষ হলে মন্দকি? অতীতের অনেক ফসল তাদের প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে, জায়গা করে দিয়েছে অন্য ফসলের। মানুষতাতেই অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে। এক সময় রান্না হতো সরিষার তেলে। এই তেল ছাড়া অন্য বিকল্পের কথাভাবতেই পারতেন না সেই যুগের মানুষ। কখন যেসয়াবিন তেল এসে তার জায়গা দখল করে নিয়েছে আমরা বুঝতেও পারিনি। সয়াবিন তেল এখনঅপরিহার্য একটি রান্নার সামগ্রী। এমনি করেই হয়তো রুটিফল বা অন্য কোনো খাদ্যশস্য জায়গা করে নেবে আমাদের দেশের মাটিতে তার অপরিহার্য গুনের কারণে।
স্কারবোরো, কানাডা
