
দিন দুই স্রেফ ঘরে বসে কেটে গেল, সাজিদ ভাই বাড়ি এলো না। লিমাপা প্রথম দিন সন্ধ্যায় ঘুম থেকে উঠে তাতাইকে জড়িয়ে ধরে আদর করল খানিক, গাল টিপে দিল তারপর বেড়িয়ে গেল, ফিরল সেই রাতদুপুরে। কারো সাথে কথাবার্তা তেমন কিছু হচ্ছে না। পরদিন নাশতার টেবিলে তাতাই মামাকে বলল, মামা সাজিদ ভাই কোথায় গেছে? দেখছি না যে?
─ ও তো এ বাড়িতে থাকে না।
─ ও মা সে কি, কোথায় থাকে?
─ উত্তরায় একটা বাড়িতে।
─ তাই নাকি, বলোনি তো আমাকে। কবে গেল?
─ বছর পাঁচ ছয় তো হয়ে গেল নিজের বাড়ি করেছে সেখানেই থাকে।
─ এত্তদিন আমি কিছুই জানি না।
─ ওহ আমি ভেবেছি তুই জানিস, লন্ডনে গতবারই গেল না?
─ না বলেনি।
─ হুম ছেলেটা খুব চাপা স্বভাবের।
─ আমি এসেছি জানে না?
─ জানে তো আমি বলেছিলাম বেশ আগে তুমি আসছো, মনে হয় ব্যস্ত আছে।
─ মানা যাচ্ছে না আমার জন্য সাজিদ ভাইর সময় নাই। লিমা আপাও এত ব্যস্ত!
মামা-মামী দু’জনেই যেন লিমার প্রসঙ্গে একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। ব্যাপারটা খেয়াল করে তাতাই তাড়াতাড়ি বলে, মামা আজ আমাকে একটা গাড়ি দিবে, আমি বাইরে ঘুরে বেড়াব।
─ কোথায় যাবি?
─ ঢাকা শহর দেখব ঘুরে ঘুরে, ফুপুদের বাসায়ও যেতে পারি।
─ ঠিক আছে আমি অফিসে গিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিব।
তাতাই বাড়ি থেকে বের হয়ে হোটেল শেরাটন, সোনারগাঁয়ে যায় জয়কে খুঁজতে। যে তারিখে ও এসেছে সে তারিখে কোনো নওয়েজীয়ান হোটেলে উঠেছে কিনা জানতে চাইল কিন্তু ওকে কোনো তথ্য জানালো না হোটেল কর্তৃপক্ষ। খানিক হোটেলের লবিতে বসে থাকল। কারো দেখা মিলল না। এরপর ঢাকা শহরের অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়াল। পুরনো ঢাকার অনেক রাস্তায় গাড়ি নিয়ে ড্রাইভার যেতে চাইল না। তাতাই রিকশা নিয়ে যেতে চাইলে ড্রাইভার বাধ্য হয়ে ঢুকল। ভিড়ের রাস্তায় গাড়ি চালানো মুশকিল। দাঁড়িয়ে আছে জ্যামে। দুইপাশে ফুটপাতে সওদাপাতি নিয়ে বসেছে লোকজন, দখল করে আছে রাস্তার অনেকটা। রিকশা, গাড়ি, ঠেলা, সিএনজি, ট্রাক, ঘোড়ার গাড়ি নানান রকমের যানবাহন এক রাস্তায় চলছে। তাতাই জানালা দিয়ে মানুষজনের চলাফেরা, জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেলো বেশ ভালোভাবে প্রায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে বসে। ক্যামেরা দিয়ে ছবি উঠাল অনেক। মোগল আমলের আর আধুনিক ঢাকা একাকার হয়ে মিশে আছে।
বিকালে ফুপুর বাসায় গিয়ে রাত এগারোটার দিকে বাড়ি ফিরল। ফুপুর বাসায় থাকার জন্য অবশ্য খুব জেদাজেদি করছিল ফুপু এবং ভাই-বোনরাও। কিন্তু ও ফিরে এলো। মামী বললেন,
─ তাতাই তোমাকে একজন ফোনে খোঁজ করছিল। আমাকে ফোনে কে খুঁজবে? আনমনা হয়ে ভাবে তাতাই।
─ নাম বলল জয়। হঠাৎ ভিতরটা চমকে উঠল তাতাইর। জয় ফোন করেছিল, আমি তো ওকে খুঁজতে গেলাম আজ, পেলাম না। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে ভুলেই গিয়েছিলাম।
─ কখন ফোন করেছিল মামী? কোনো নাম্বার দিয়েছে? একটা নাম্বার লেখা কাগজ এগিয়ে দিয়ে মামী বললেন,
─ এই নাম্বারে আছে বলল।
জয় তাহলে হারিয়ে যায়নি। এবার তাতাইর মনে হয়, মামার নাম্বার ওকে দিয়েছিল কথাটা ভুলে গিয়েছিল। রাত প্রায় বারোটা বাজে। সকালে করব না এখন করব, তাতাই অপেক্ষা করতে পারছে না। ভোরে যদি ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয় আর ও বেরিয়ে যায়, তাহলে আবার কালও কথা হবে না। তাতাই টেলিফোন করে ফেলে, রিং হচ্ছে কেউ তো ধরে না। পাঁচ ছ’টা রিং হওয়ার পর ধরে।
─ হ্যালো।
─ ঘুম থেকে উঠালাম কি?
─ না ঘুমাইনি এখনও। জানতাম তুমি ফোন করবে তাই অপেক্ষা করছিলাম।
─ কেমনে জানো ?
─ আমার মন বলছিল।
─ কোথায় আছো তুমি?
─ এই এলাকাটার নাম উত্তরা।
─ তোমার কাজের কতদূর অগ্রগতি।
─ শুরু হয়নি এখনো, দু’দিন শুধু ঘুমালাম।
─ আচ্ছা আমিও আজই বের হলাম, তোমাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম।
─ তাই নাকি, বাহ্ ট্যালিপ্যাথি।
─ হুম।
─ কাল দেখা করা যাবে?
─ যাবে, কোথায়?
─ আমি এখনও কিছু চিনি না। কোথায় আসতে বলব জানি না, আমার এখানে আসবে?
─ ঠিক আছে, ঠিকানা নিয়ে কথা শেষ করল তাতাই।
মামারা সবাই কেমন যেন আগের মতন আনন্দে-উচ্ছাসে ভরপুর না। সাজিদ ভাই এখানে থাকে না। লিমাপা প্রতিদিন সন্ধ্যা বা বিকালে বেরিয়ে রাত করে বাড়ি ফিরে। ও কি আজকাল পড়ালেখা, কাজ কিছু করে না। বাড়িতে যতক্ষণ থাকে ঘুমিয়ে থাকে। মামা-মামী লিমাপাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে বোঝা যায়। ফুপুর বাসায় লিমাপাকে নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছিল। সবাই বাজে ভাবে। তাতাই পাত্তা দেয় নি। লিমাপা ওর খুব প্রিয়। ছোট বেলায় সাজাতো তাতাইকে। সুন্দর সুন্দর উপহার দিত আর কত গল্প দু’জনের ফুরাত না। লিমাপার পিছনে সে সারাদিন ঘুরঘুর করত। অনেক সুন্দর গান করত লিমাপা। গানের ওস্তাদের তবলার সাথে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করত লিমা আপা আর সাজিদ ভাই, পাশে বসে থাকত তাতাই। গান করার সময় লিমাপাকে স্বপ্নের দেশের মেয়ে মনে হতো। সেই লিমাপা কেমন বদলে গেছে। তাতাইর সাথে কথাই বলতে চায় না।
ওর ভাব দেখে মনে হচ্ছে ও ড্রাগ নিচ্ছে। মামা-মামী কি জানে?
লিমাপার বিষয়টা জানতে হবে, তাতাই ঠিক করে মনে মনে।
পরদিন সকাল দশটায় তাতাই চলে যায় ঠিকানা অনুযায়ী উত্তরার বাসায়। জয় হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানায়।
─ কি ব্যাপার তুমি দেখি রীতিমত বাসাবাড়ি করে বসেছো। আমি তোমাকে হোটেলে খুঁজতে গিয়েছিলাম।
কোনো হোটেলে? নাম শুনে হাসতে হাসতে জয় শেষ।
─ হাসির কি হলো?
─ হাসব না, তুমি আমাকে ফাইভ স্টার হোটেলে খুঁজতে গিয়েছো। আরে আমার কি অতো পয়সা আছে নাকি? আমি হলাম গরিব মানুষ।
─ ফাজলামী রাখো। আসলে তোমার কিছু একটা উদ্দেশ্য আছে সেটা বলো।
─ আচ্ছা এত প্রশ্ন থাক। চা খাও।
─ চা খাবো তবে প্রশ্ন থাকবে মানে ঝগড়া হবে রীতিমত।
─ ওরে বাবা আমি চা করতে যাই। কিচেনের দিকে যায় জয়।
পিছনে আসে তাতাই। বেশ ছিমছাম বাড়িটা। খোলামেলা একটা লিভিংরুম, পাশে কিচেন ডাইনিং। তার পাশ দিয়ে খোলামেলা একটা বারান্দা। চোখ চলে যায় আকাশ আর দিগন্তের কাছে। তাতাই বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। একটা ট্রেন চলে যাচ্ছে ঝমঝম শব্দ তুলে, বেশ লাগে দেখতে।
জয় চায়ের কাপ হাতে পাশে এসে দাঁড়ায়।
জায়গাটা সুন্দর তাই না? চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে বলে।
─ বেশ সুন্দর, তুমি আবিষ্কার করলে কীভাবে?
─ হয়ে যায় কেমনে যেন। অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম, কিছুদিন বাংলাদেশে থাকব, পেয়িং গেস্ট থাকতে চাই। এক ভদ্রলোক যোগাযোগ করলেন, মিলে গেল।
─ তাহলে যে সেদিন বললে, জান না কোথায় থাকবে?
─ জায়গাটা পছন্দ না হলে হয়তো থাকতাম না। তাই আগে বলিনি।
─ বারান্দায় পাতা চেয়ারে বসে তাতাই বলে,
─ তা সেদিন ওভাবে হাওয়া হয়ে গেলে যে আমি নামিয়ে দিতে পারতাম তোমাকে।
─ তুমি যেভাবে লোকজনের ভিড়ে হারিয়ে গেলে, তোমাকে আর খুঁজে পেলাম না তো।
─ মারব, হাত উঁচু করে তাতাই আর হাসিতে ভেঙে পড়ে জয়।
চা শেষ করে হাসতে হাসতে ঘরে আসে ওরা।
─ এ বাড়িটা কি পুরোটাই তোমার? পেয়িং গেস্ট হলে আর মানুষ কই?
─ এবাড়ির মালিক ট্যুরে গেছেন। উনার সাথে আমার দেখা হয়নি। কাল পরশু মনে হয় আসবেন। একজন বুড়ো মতন লোক আছে সে এসে রান্না করে দিয়ে যায়, ঘর ঝাড় দেয়। যা স্পাইসি রান্না করে শুধু রাইস ছাড়া কিছু খেতে পারছি না।
─ তাহলে তো তুমি না খাওয়া অবস্থায় আছো। আবার একচোট হাসে তাতাই।
─ দাঁড়াও মামীকে বলে দেই আজ দুপুরে তুমি আমাদের সাথে খাবে। মামীর রান্না যা মজা না একবার খেলে তুমি প্রতিদিন খেতে চাইবে।
─ তাহলে না খাওয়াই ভালো। আমাকে আশেপাশে একটা রেস্টুরেন্ট যদি চিনিয়ে দিতে।
─ আচ্ছা দিব আজ চলো মামার বাসায়।
─ আজ থাক। আজ আমি তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই। হঠাৎ করে হাসিখুশি জয়ের বিষন্ন কণ্ঠে ওর দিকে ভালো করে তাকায় তাতাই।
─ সিরিয়াস কিছু?
─ আমি তো এদেশে কাউকে চিনি না। যে কাজটা নিয়ে এসেছি সেটা অনেক কঠিন। ভেবেছিলাম যাদের বাসায় উঠব তাদের কাছে সাহায্য পাবো। কিন্তু এ বাসার ভদ্রলোকের সাথে এখনো দেখা হলো না। আরো দু’দিন পর বাইরে থেকে এসেই উনি তো আর আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আসার আগে যেমন ভেবেছিলাম উনি একা হয়তো আমার জন্য সময় করতে পারবেন কিন্তু এখন মনে হচ্ছে উনি খুব ব্যস্ত মানুষ। বসে বসে দিন কাটালে হবে না। আমাকে আবার ফিরে যেতে হবে ছয় সপ্তাহের মধ্যে। তাই তোমার কথা মনে হলো, তুমি যদি হেল্প করতে পারো। অন্তত আমার কাজের জন্য চেষ্টা করে গেলেও আমার ভালোলাগবে।
─ সে তো ঠিক কথা। অবশ্যই কিছু করতে হবে। তুমি আমাকে বলো আমার কাছ থেকে তুমি কেমন সাহায্য চাও?
─ তোমাকে সেদিন যা বলেছি, ছোটবেলায় মা আমাকে পাওয়ার যে গল্পটা বলেছিল একটু বড় হওয়ার পর সে গল্পে খানিক ভিন্নতা যোগ হয়েছিল, সে বিষয়ে আরো কিছু কথা বলার আছে তোমাকে।
তাতাই ছোট করে বলে,
─ বলো।
আমার নিজের মাথায় প্রায় প্রায় প্রশ্ন জাগত, নিজের মা কেন সন্তানকে অন্য কাউকে দিয়ে দিবে, কোনো মা কি তা করতে পারে? হয়তো আমার এই মা-ই আমার আসল মা। হয়তো মায়ের বাংলাদেশে কারো সাথে সম্পর্ক হয়েছিল। সে বিষয়টা বাবাকে লুকানোর জন্য। আমি জানি বাবা মায়ের সম্পর্কটা অনেক দিনের। চাকরি পাওয়ার পর তারা বিয়ে করবে কিন্তু মা কাজের জন্য বাংলাদেশে চলে যাওয়ায় বিয়েটা স্থগিত হয়ে যায় মা ফিরে না আসা পর্যন্ত। ফিরে আসেন দেড় বছরের এক শিশু কোলে। তারপর তারা বিয়ে করে সংসার করেন। আমার জন্য তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু আমার মাথায় মাঝে মধ্যে প্রশ্নের উৎপত্তি হতে থাকল।
আমি যখন ইউনিতে পড়ি তখন একদিন মাকে সরাসরি প্রশ্ন করি,
মা আমার বাবার পরিচয়টা বলবে আমাকে? মা এত অবাক হয়ে যায়, আমার প্রশ্ন বুঝতেই পারেনি প্রথমে। পরে গম্ভীর হয়ে যায়, মা ঠিক বুঝে যায় আমি কি বোঝাতে চেয়েছি। মায়ের মুখ হয়ে যায় টকটকে লাল। আমার ভীষণ ভয় হতে থাকে। বুঝতে পারি আমি মারাত্মক একটা ভুল করে ফেলেছি। কিন্তু বলে ফেলা কথা ফিরানোর উপায় নাই।
মাকে আমি এমন গম্ভীর কখনো দেখিনি। চুপ করে নিজের ঘরে বসে থাকে। বাবা বাসায় এসে মাকে হয়তো বোঝায়।
পরদিন একসময় মা আমাকে ডেকে বলে,
এদিকে আসো, খাওয়ার টেবিলের উপর একগাদা কাগজ রেখে বলে এগুলো দেখো। আমি কাগজগুলো নাড়াচাড়া করি। বুঝি না কি বলব?
মা একটা মানচিত্র বের করে বলে এই দেশটা বাংলাদেশ আর পশ্চিমের এই একহাজার মাইল দূরের দেশটা পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা দুইশত বছর শাসন-শোষণের পর ইস্ট ইন্ডিয়া নামক দেশটি ছেড়ে আসার সময় হিন্দু আর মুসলমানদের দেশ হিসাবে পুরো দেশটাকে তিন ভাগে ভাগ করে। মাঝখানে হিন্দুদের জন্য দেশ ইন্ডিয়া। আর দুই পাশে পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান মুসলমানদের জন্য ভাগ করে দেয়। এর আগে কিন্তু হিন্দু-মুসলমান একসাথে সুন্দরভাবেই বাস করছিল একদেশে। কিন্তু এই ভাগাভাগির ফলে মানুষের মনে তৈরি হয় হিংসা বিদ্বেষ বৈষম্য। মারামারি কাটাকাটি শুরু হয়, পাশাপাশি বসবাসরত ভাই ভাইয়ের মতন বসবাসরত হিন্দু মুসলিমের মধ্যে। হিন্দুরা পাকিস্তান ছেড়ে ইন্ডিয়া আর মুসলমানরা ইন্ডিয়া ছেড়ে পাকিস্তানে রওনা দেয় নিজেদের ভিটেমাটি জমি ফেলে। উদ্বাস্তু রিফুজি জীবনযাপন। সুন্দর স্বাভাবিক মানুষদের অস্থির জীবনে ঢুকিয়ে দিয়ে ব্রিটিশরা ছেড়ে আসে দুইশ’ বছরের উপনিবেশ ভারত।
পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তান মিলে পাকিস্তান গঠিত হয় ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, আবহাওয়া, জলবায়ুর সমন্বয়ে। যাদের কোনো কিছুরই মিল নেই তারা এক দেশের মানুষ। ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে থাকা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের ব্রিটিশের অনুকরণে, পাকিস্তানের কলোনি তৈরি করে চোখ রাঙানি আর ডাণ্ডার নিচে রাখতে চাইল। পূর্ব বাংলার যত সম্পদ তা পশ্চিমের জন্য ব্যয় করতে লাগল। পূবের মানুষগুলো পেলো অবহেলা। কিন্তু স্বাধীনচেতা বাঙালি তা মানবে কেন? তারাও প্রতিবাদ করতে থাকল সমান অধিকারের। নিজের অধিকার আদায়ের বাদপ্রতিবাদ চলছে পাকিস্তান হওয়ার শুরু থেকেই পশ্চিমাদের সাথে বাঙালিদের। উর্দূ নয় বাংলাভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে এই নিয়ে প্রতিবাদ। ভাষার জন্য গুলিতে প্রাণ দেয় বাঙালি উনিশ বাহান্নর একুশে ফেব্র“য়ারি। সত্তরে নির্বাচন হয়, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি নেতা শেখ মুজিবর রহমান কিন্তু পশ্চিমা নেতা ইয়াহিয়া, ভুট্টো কিছুতেই শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করতে চায় না। বাকবিতণ্ডা চলছে, গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার কিছুতেই মেনে নেয় না পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী। উত্তাল জনগণের উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেয়। ইয়াহিয়া, ভুট্টো আলোচনার নামে সময় ব্যয় করে। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য নিয়ে আসে পূর্ব পাকিস্তানে। ছাব্বিশে মার্চ ১৯৭১ অতর্কিতে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের আক্রমণ করে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তা, হত্যা করে নিরীহ মানুষকে। বাংলাদেশীরাও মুক্তিবাহিনী গড়ে প্রতিরোধ করে, যুদ্ধ শুরু করে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়, দুই লাখ মহিলার সম্ভ্রমহানি হয়। ষোলই ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। একটি নতুন দেশ জন্ম নেয় পৃথিবীর বুকে ।
সে সময় ধর্ষিতা অনেক মেয়ে যারা পাকিস্তানি আর্মির নির্যাতনের শিকার, তারা হারায় তাদের পরিবার। সমাজের বেশিরভাগ পরিবারে সে সব মেয়ে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। এইসব নিরীহ অসহায় মেয়ে নিজেদের নিয়ে কোথায় যাবে জানে না। স্বাধীনতার পরে অনেক অবৈধ সন্তান জন্ম নেয় বাংলাদেশে, যে সন্তান পিতৃ-পরিচয়হীন, অবাঞ্ছিত, অনেক নারীই সে সব সন্তানকে বিদেশি সংস্থা যারা শিশু এডপট করতে চায় তাদের দিয়ে দেন। যুদ্ধউত্তর বাংলাদেশে অনেক বিদেশি সংস্থা তখন সাহায্য করতে এগিয়ে যায়। অনেক দেশ সে সময় বাংলাদেশ থেকে সে সব যুদ্ধ শিশুদের নিয়ে আসে তাদের দেশে। এক নাগারে ইতিহাস বলে,
আরো একটি কাগজ উঠান, আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন─এইটা তোমার জন্ম সনদ।
মা মাগো, বহুদিন পর মাকে জড়িয়ে ধরে আমি আবার কেঁদে উঠি। কেন তুমি আমাকে এসব কথা বললে?
জন্ম সব সময় তোমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ছোটবেলা থেকে নানা কারণে তুমি আমাদের প্রশ্ন করে গেছো।
আমরা তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করে গেছি কিন্তু সব সময় কিছু প্রশ্ন তোমার মনে থেকেই গেছে। তোমাকে বুকে নিজের সন্তানের মতন ধারণ করে রেখেছি কিন্তু সত্য বারবার তোমার মনে প্রশ্ন তুলেছে। জানার অধিকার তোমার আছে। আমরা কিছুই গোপন করতে চাই না। এখন তুমি বড় হয়েছো, এখন সত্যটা জানতে পারো সঠিকভাবে।
তাহলে আমার গায়ে ঠিকই ময়লা লেগে আছে মা?
এভাবে বলে না জয়, মানুষের জন্ম তার ইচ্ছায় নয় ঈশ্বরের ইচ্ছায়, সে তোমাকে যেভাবে জীবন দিয়েছে, দেখাতে চেয়েছে তুমি সেভাবেই জীবন পেয়েছো। তোমার জন্মের জন্য তুমি কোনোভাবেই দায়ী নও। তুমি কি সুন্দর একটা জীবন পাওনি?
পেয়েছি।
তোমার যে পিতা সারা জীবন তোমাকে ভালোবাসা দিল তাকে তুমি পিতা ভাবতে পারো না?
তার কোনো তুলনা হয় না, সে মহান।
সুস্থ স্বাভাবিক একটা পরিবারে জন্ম নিয়ে হয়তো একটা ছেলে তোমার মতন সুন্দর জীবন পায়নি। তোমার কোনো আফসোস থাকা ঠিক না তোমার জন্ম নিয়ে।
ঠিক মা, আমার আর কোনো আফসোস নেই।
তবে তুমি একবার বাংলাদেশে যেও, যদি খুঁজে পাও তোমার মায়ের সাথে দেখা করো। এইসব কাগজ রাখো তোমার কাছে।
মা চেয়েছিল আসবে আমার সাথে। মা কেন যেন খুব ভালোবাসে এই দেশটাকে। কিন্তু শরীরটা বেশি দুর্বল হয়ে গেছে তাই আসতে পারল না। আমি একাই এলাম ।
যেন এক রূপকথার রাজ্যে ডুব দিয়েছিল তাতাই। নির্বাক শুনে গেছে জয়ের গল্প। কোথায় পৃথিবীর এক দেশ নরওয়ে সেখানে বড় হওয়া এক যুবরাজ হারিয়ে যাওয়া জন্মদাত্রী শ্যামা মাকে ফিরে পেতে এসেছে বাংলাদেশে আর অপেক্ষায় আছে পালনকারী শুভ্র মা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। জয়ের কথা থেমে গেলেও তাতাই চুপচাপ বসে ডুবে আছে স্বপ্নের মতন সত্যি গল্পের আবেশে।
চোখ বন্ধ করে নিথর বসে আছে জয় এনথন ক্রিসটোফার। পড়ন্ত বিকালের আবীর রঙ ছড়িয়ে আছে ওর চুলে, মুখে।
টরন্টো, কানাডা
