মাকে নিয়ে লেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছোট গল্পটি

মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে

‘মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে
মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে’…
অনুপ ঘোষালের গাওয়া এই গানটা আমার ভীষণ প্রিয়।

২০০১ সালে জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি নিয়ে যাবার সময় একটা ক্যাসেটের এ এবং বি সাইডে মাকে নিয়ে বিখ্যাত সব বাংলা গান রেকর্ড করিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। ক্যাসেটের নাম দিয়েছিলাম মায়ের গান। সেখানেও, শুরুতেই ছিলো মধুর আমার মায়ের হাসি।

- Advertisement -

মায়ের গান আমার ভীষণ ভীষণ প্রিয়।

দিলীপ বিশ্বাস পরিচালিত ‘সমাধি’ সিনেমাটি আমি সাতবার দেখেছিলাম শুধুমাত্র রাজ্জাকের লিপসিং-এ খুরশিদ আলমের গাওয়া ‘মা গো মা ওগো মা আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা’ গানটির জন্যে।

চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ভাষা আমার কাছে বিষয় নয়। হিন্দি ফিল্ম দেখি নিয়মিতই। বিশেষ করে যে ছবিতে মা-কে নিয়ে গান থাকে সেটা তো আমি দেখবোই।

আমির খানের ‘তারে জামিন পার’ নামের হিন্দি মুভিটা আমি কতোবার যে দেখেছি! কারণ ‘তারে জামিন পার’ ছবিতে মা-কে নিয়ে অসাধারণ একটা গান আছে। কতোবার যে শোনা হলো সেই গানটা! শংকর নামের একজন গায়ক কী অসাধারণ মমতায় গেয়েছেন-অভিমানী বালকের আকুল করা কথামালা-তার মাকে উদ্দেশ্য করে—‘তুঝে সব হ্যায় পাতা…হ্যায় না মা?’

বালকটিকে জোর করে পাঠানো হয়েছে অনেক দূরের এক আবাসিক ইশকুলে। ওখানে মা-কে ছাড়া অসহায় বালকটির চোখের জলে ভেসে যাওয়া দিবস-রজনীর কাব্য-চিত্র এই গানটি। মন খারাপ করা এক সন্ধ্যায় বালকটির মা বাবা আর পিঠেপিঠি অগ্রজ তাকে স্টুডেন্ট হোস্টেলে রেখে চলে যাচ্ছে, ওদের বহনকারী চলমান ট্যাক্সির পেছনে অসহায় বালকটির অশ্রুসজল অবয়ব ক্রমশঃ ক্ষুদ্র এবং ঝাপসা হয়ে আসে। এরপর অনেক ছোট ছোট দৃশ্যের নিপূণ গ্রন্থণা, সহসা আলো নিভে যাওয়া রাতে বালকের প্রথম শয়ন অজানা অচেনা একঝাঁক নতুন ছেলের সঙ্গে, ব্যাকগ্রাউন্ডে হৃদয় ছেঁড়া গানটি–‘তোকে কখনো বলতে পারিনি কিন্তু তুই তো সবই জানিস তাই না মা? অন্ধকারে আমার ভয় লাগে, হারিয়ে যাবার আশঙ্কায় আমাকে বেশিদূর যেতে দিতি না, তুইই তো ছিলি আমার সবচে বড় সাহস, তোকে ছাড়া এই জীবন আমি বইবো কেমন করে? তুই তো সবই জানিস তাই না মা? আমি কি এতোটাই মন্দ ছেলে যে আমাকে তুই একলা ফেলে গেলি? এতোটা দূরে আমাকে ঠেলে দিস না যেখান থেকে তোকে আমি স্মৃতিতেও আনতে পারবো নারে মা….!’

খুবই শাদামাটা কিন্তু হৃদয়ে মোচড় লাগানো কথা আর সুরে গানটি শুনে দর্শকও অশ্রুসজল হয়ে উঠবে বালকটির সঙ্গে। বিশেষ করে প্রবাসী যারা, তাদের তো মনে হবে এটা তারই গান। এই গানের কোথাও না কোথাও মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকা সন্তান নিজেকে আবিস্কার করবে অথবা নিজেকে প্রতিস্থাপন করবে ছোট্ট সেই অভিমানী বালকটির জায়গায়।

আমি যেমন করেছি। বারবার বহুবার আমার মনে হয়েছে মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া বালকটি আমি নিজে…!

কতো গল্প মাকে নিয়ে এই পৃথিবীতে!

মাকে নিয়ে কতো কতো কাহিনী-চলচ্চিত্র, কতো ছড়া-কবিতা, কতো গান-কতো ভাষায়!

আমার পড়া মাকে বিষয় করে লেখা সেরা গল্পটির লেখক ইভান তুর্গিনিয়েভ।

২০০১ সালে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক ছোটদের কাগজের ‘মা সংখ্যা’য় ‘বন্ধুর চিঠি’ নামের সম্পাদকীয় কলামে গল্পটা তুলে দিয়েছিলাম পাঠক বন্ধুদের জন্যে।

মা দিবসে সেই গল্পটাই আমার নৈবেদ্য। —

একটি কিশোর তার মাকে খুব ভালোবাসে। পৃথিবীতে তার চোখে সবচে সুন্দর হচ্ছে তার মা। সবচে রূপসী হচ্ছে তার মা।

মাকে জড়িয়ে ধরে কিশোর ছেলেটি বলে–মাগো,তোমার জন্যে আমি সব পারি।

মা বলেন–পাগল ছেলে!

সেই কিশোরটি একদিন তরুণ হলো।

সেই তরুণের সঙ্গে একদিন দেখা হলো ঝকঝকে এক তরুণীর। অনিন্দ্যসুন্দর সেই তরুণীর প্রেমে পড়লো সে।

তরুণীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো সেই তরুণ। তারপর নিবেদন করলো তার নৈবেদ্য–তোমার জন্যে আমি সব পারি। তুমি চাইলে পৃথিবীর সবকিছু আমি এনে দিতে পারি তোমার জন্যে, সব কিছু।
তরুণী জিজ্ঞেস করলো—সব? সব কিছু?

–হ্যাঁ, সবকিছু।

তুমি চাইলে পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যা আমি এনে দিতে পারবো না।

–তাহলে যাও, তোমার মায়ের হৃদপিন্ডটা নিয়ে এসো আমার জন্যে।

অতঃপর ছুটতে ছুটতে তরুণটি গেলো তার মায়ের কাছে।

মাকে হত্যা করে মায়ের হৃদপিন্ডটা ছিঁড়ে নিয়ে ঝটিতি সে ছুট লাগালো সেই তরুণীর বাড়ির দিকে।

তরুণীর বাড়িতে ঢুকতে যাবার মুখে তাড়াহুড়োয় দরোজায় ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়লো তরুণটি।

মায়ের হৃদপিন্ডটা তখন বলে উঠলো–খোকা তোর লাগে নি তো?…

আজ মা দিবসে আমার নিজের মা-সহ জগতের সকল মাকে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। আর আগামীতে যারা মা হতে চলেছে, ভালোবাসা সেই নতুন মায়েদেরও। এবং আজকের এই বিশেষ দিনটিতে যারা মা হবে, তাদের জন্যেও অনেক অনেক ভালোবাসা।

মাগো তোরা ভালো থাকিস গো মা, ভালো থাকিস।

অটোয়া ১১ মে ২০২৪

- Advertisement -

Read More

Recent