
পড়তাম নবাবপুর স্কুলে। ম্যাট্রিক পরীক্ষার সিট পড়েছিলো জগন্নাথ কলেজের কাছাকাছি একটা স্কুলে। স্কুলের নাম ছিলো ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল। পরীক্ষার দিন কয়েক আগে নবাবপুর স্কুল থেকে প্রবেশপত্র সংগ্রহ করে রেকি করে এলাম কলেজিয়েট স্কুলের লোকেশনটা। বুঝে নিতে চাইলাম ওয়ারি হেয়ার স্ট্রিটের বাসা থেকে পরীক্ষা হল পর্যন্তপোঁছুতে কতোটা সময় লাগবে। কতো আগে রওনা হতে হবে। হেঁটে গেলে কতো মিনিট লাগবে আর রিকশায় গেলে কতো মিনিট।
তখনকার শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা মাধ্যমিক স্কুল বোর্ডের উর্বর মস্তিষ্কের কুতুবুদ্দিনরা বাংলা ও ইংরেজি পরীক্ষার দিনে একটা তোঘলকী নিপীড়ন সিস্টেম চালু রেখেছিলেন। বাংলা এবং ইংরেজি পরীক্ষার সময় তাঁরা একই দিনে দুই পত্রের পরীক্ষা নিতেন। মাঝখানে মাত্র এক ঘন্টার বিরতি। কোমলমতি কিশোর কিশোরীদের একেবারে চিড়েচ্যাপ্টা করে ছাড়তেন তাঁরা। ছাত্রছাত্রীদের হালুয়া টাইট করা সেই সিস্টেমটা কি এখনো চালু আছে?
ম্যাট্রিক বা এসএসসি ছিলো তখনকার ছাত্রছাত্রীদের জীবনের প্রথম পুলসিরাত। এই পুলসিরাত সবাই পেরুতে পারতো না। ছাত্র হিশেবে আমি কখনোই খারাপ ছিলাম না। কিন্তু আমার শংকা ছিলো ম্যাট্রিকটায় আমি ফেল মারবো শুধুমাত্র অংকের কারণে। অংক দেখলে আজো আমার গলা শুকিয়ে যায়। টাকা-পয়সা গুণতে পারি না ঠিক মতো। কানাডায়ও আমার কলিগরা বা কাজ করা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা জানেন গোণাগুন্তি বা অংকে আমি কতোটা বেকুব।
বাংলাদেশে নদী যখন ক্লাশ সিক্স সেভেনের ছাত্রী তখন সে আমারটাকাকড়ি গুণে দিতো। বিশেষ করে ইউনিসেফ বা এরকম কোনো প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক টানা কয়েক সপ্তাহ কাজ করে যখন মোটামুটি মোটা অংকের টাকা রোজগার করে আনতাম তখন সেগুলো গুণে দিতো নদী।
এতো যে বয়েস হলো, এখনো, তিন হাজার ডলার তিনবার গুণলে তিন রকমের রেজাল্ট আসে! হয় কম হয়, নয় বেশি। আমি তাই গোণাগুন্তি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কিন্তু পারি না। অংক আমার পিছু ছাড়ে না। ভয়াল বিভীষিকা হয়ে অংক আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। জীবনের বহু অধ্যায়ের বহু জটিল অংকের সমাধান করতে পারলেও ম্যাথ-এর সমাধান আমি করতে যাইও না চাইও না।
ম্যাট্রিকে ফেল-এর হাত থেকে বাঁচতে ফাইনাল পরীক্ষার একমাস আগে বাবা-মাকে না জানিয়ে সোনালী ব্যাংক বায়তুল মোকাররম শাখার এক তরুণ অফিসারের কাছে অংক শিখেছিলাম। শিক্ষাকাল একমাস। স্থান বনগ্রাম রোড পানির ট্যাংকির উল্টোদিকের একটি একতলা বাড়ির ড্রয়িং রুম। টিউশন ফি তিনশ টাকা। বাড়িটা আমার সহপাঠী বন্ধু তুহীন রহমানদের। তরুণ সেই ব্যাংক কর্মকর্তাকে বলেছিলাম–আমাকে ৩৩ পাওয়ার মতো একটা গেরিলা ট্রেনিং দিলেই যথেষ্ঠ। অংকের কাছ থেকে আমার খুব বেশি কিছু পাবার নেই। ফেইল না করলেই হলো।
সপ্তাহের কয়েকটা দিন বিকেলে অফিস ছুটির পর তুহীনদের বাড়িতে আসতেন সেই ব্যাংক কর্মকর্তা। তারপর আমাকে ঘন্টাখানেক তালিম দিয়ে চলে যেতেন। ব্যবস্থাটা করে দিয়েছিলেন তুহীনের বড় মামা। তরুণ সেই ব্যাংকার আমাকে এলজেব্রার কিছু টেকনিক শিখিয়ে দিয়েছিলেন। আর পাটিগণিতের কিছু টোটকা। যেমন সরল অংকের সমাধান কী করে বের করতে হয়। জ্যামিতিও শেখাতে চেয়েছিলেন কিন্তু আমি বাঁধা দিয়েছি তাঁকে। আমার জীবনে ত্রিকোনোমিতির প্রীতির কোনো দরকার নেই। এই কম সময়ের হাইস্পীড দৌড়ের প্রাণহরা রেসে জ্যামিতির বাড়তি চাপ না নেয়াই ভালো।
কয়েকটা এলজেব্রা, একটা সরল অংক আর লোক ঠকানো লাভ লোকসানের একটা পাটীগণিতের ওপর ভিত্তি করেই ম্যাট্রিক পরীক্ষার অংকের বৈতরণীটা আমি পার হয়ে গিয়েছিলাম। য়্যানসার করেছিলাম চল্লিশের। পেয়েওছিলাম সেই চল্লিশই! কারণ অংকে হলো ছাক্কা মার্ক। উত্তর সঠিক হলে দশে দশ। নাম্বার কমার সুযোগ নেই।
প্রতিদিন পরীক্ষা হলে আমি আসতাম একা একা। কিন্তু অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে তাদের কোনো না কোনো অভিভাবক থাকতেন। হয় বাবা-মা কিংবা মামা চাচা অথবা বড় ভাই নিদেন পক্ষে দুলাভাই গোত্রের কেউ না কেউ। কিন্তু আমার সঙ্গে থাকতেন না কেউই। বিশেষ করে বাংলা এবং ইংরেজি পরীক্ষার দুই পেপারের পরীক্ষার দিন সকালের পরীক্ষা শেষেহল থেকে বেরিয়ে দেখেছি অভিভাবকেরা হাতে ডাব কলা কিংবা কমলা কিংবাবিরিয়ানির প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখেছি, তাঁদের কেউ কেউ পরীক্ষা দিয়ে বেরুনো বিধ্বস্ত ছেলেকে অতিযত্নে খাইয়ে দাইয়ে বাতাস করে তারপর বিড়বিড় করে সুরা পড়ে ছেলেটার বুকে কয়েকটা ফুঁ দিয়ে তারপর সর্বশেষ নির্দেশনার পর ফের পাঠাচ্ছেন রণাঙ্গণে। যুদ্ধ ক্ষেত্রে!
পরীক্ষার হলে ফেরার সময় ছেলেদের কারো কারো শার্টের সামনের অংশ ডাবের পানিতে ভেজা থাকতো। কাটা ডাবটা উলটে ধরে ডাবের ফুটোয় মুখ রেখে ঢক ঢক করে ডাবের পানি খেতে গিয়ে বাঙালি তখন জামা ভেজাতো আকসার। বাঙালি তখনো ডাবের ভেতরে স্ট্র ঢুকিয়ে খেতে শেখেনি। তখন স্ট্র ব্যবহার করা হতো কেবলমাত্র কোকাকোলা-ফান্টা ইত্যাদি বনেদী কোল্ড ড্রিংক্স-এর বেলায়।
আর আমি একলা একা হল থেকে বেরিয়ে ফুটপাথ লাগোয়া বেকারি থেকে একটা প্যাটিস কিংবা ক্রিমরোল খেয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটি করে, পত্রিকা স্ট্যাণ্ডে পত্রিকা দেখে-টেখে ফুরফুরা মেজাজে ফের হলে ঢুকেছি সেকেন্ড পেপারের পরীক্ষায় অংশ নিতে। আমার দিকে অভিভাবকদের কয়েকজন খানিকটা অবাক চোখে তাকাতেন। তাঁদের দৃষ্টিতে কিছুটা মায়াও লেগে থাকতো–আহারে এতিম ছেলেটা! কেউ আসেনি ওর সঙ্গে! কেউ নেই ওর জন্যে!
ওরা জানতেন না, আমি ওই বয়েসেই একলা একা চলতে পারতাম। যেতে পারতাম দূর গন্তব্যে, একা একা।
ম্যাট্রিকের সেই পুলসিরাত পার হবার নিষ্ঠুর পরীক্ষাকালে একদিন একটা ডাব অবশ্য জুটেছিলো আমার ভাগ্যেও। ঘটনাটা চমকপ্রদ ছিলো। খুবই বিস্মিত হয়েছিলাম আমি। সেদিন,পরীক্ষা শেষে হল থেকে বেরিয়ে দেখি ক্লাশফ্রেন্ড তুহীন আর শাহীনের বাবা তিনটে ডাব হাতে দাঁড়িয়ে আছেন পুত্রদের সঙ্গে আমাকেও পৃথিবীর একমাত্র নির্ভেজাল শীতল পানীয়টি পান করাবেন বলে!
তুহীনের বাবা আর বেঁচে নেই। কিন্তু তিনি আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষার স্মৃতির সঙ্গে কী রকম মায়া হয়ে জড়িয়ে আছেন স্বর্ণলতার মতো।
অটোয়া, কানাডা
