কানাডার টিভিতে বারবার বাংলাদেশ

আজ থেকে প্রায় ২২ বছর। কিন্তু চোখে এখনও দিনের মতো ভাসছে সেদিনের ঘটনা। কানাডার ভিক্টোরিয়া শহরে কেবল পর্দা নেমেছে কমনওয়েলথ গেমসের পঞ্চদশ আসরের। আর নামতে না নামতেই কানাডিয়ান টিভি চ্যানেলগুলোর শিরোনামে বাংলাদেশ! না কোনো আদুরে খবর নয়। নয় গেমসে বাংলাদেশের স্বর্ণ জয়ের কোনো ঘটনা। স্রেফ লজ্জাস্কর একটা বিষয়কে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সংবাদের শিরোনাম করা হচ্ছিলো কানাডার টিভি চ্যানেলগুলোতে। বড়ো বড়ো অক্ষরে ছাপা হয়েছিলো জাতীয় দৈনিকগুলোতে।
হ্যাঁ, বাংলাদেশ ক্রীড়া দলের এ্যাথলেট বিমল চন্দ্র সাহা। দেশের দ্রুততম মানব। কমনওয়েলথ গেমসের সমাপনী অনুষ্ঠানের ঠিক আগ দিয়ে গেমস ভিলেজ থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। চিরুনি অভিযান চালিয়েও তাকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না দলের কর্মকর্তারা। অগত্যা বিমলকে ছাড়াই সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশ নেয় বাংলাদেশ দল। কর্মকর্তারা বিমলকে খুঁজে না পেলেও ঠিকই খুঁজে পায় কানাডিয়ান মিডিয়া। রাতে সিটিভি, সিবিসি সহ টিভি চ্যানেলগুলোর সংবাদ শিরোনামে উঠে আসেন এ্যাথলেট বিমল চন্দ্র তরফদার। টিভির পর্দায় ভেসে ওঠে তার ছবি। কানাডিয়ান মিডিয়াকে দেয়া তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হতে থাকে বারবার। বিমল ইংরেজি তেমন বলতে পারেনা। তারপরেও টিভি সংবাদে শোনা গেলো তার কন্ঠ। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বিমল বলছে, ‘বাংলাদেশ নো ফুড নো মানি।’ নিউজ এ্যাংকর বললেন, গরীব রাষ্ট্র বাংলাদেশের এ্যাথলেট বিমল পালিয়ে এসেছেন গেমস ভিলেজ থেকে। অর্থ ও খাদ্যের অভাবে তিনি আর ফিরে যেতে চান না নিজ দেশে। একদিন নয়, দু’দিন নয়, টানা এক সপ্তাহ টিভি খুললেই দেখা গেছে বিমলকে, শোনা গেছে তার কন্ঠে: বাংলাদেশ নো ফুড, নো মানি।
মাথা হেট হয়ে আসছিলো আমাদের। বিশেষ করে আমরা যে ক’জন সাংবাদিক দেশ থেকে উড়ে এসেছিলাম এ গেমস কভার করতে। বিষয়টি এখনও রহস্যজনকই থেকে গেছে। থেকে গেছে এ কারণেই যে, বাংলাদেশ ক্রীড়া দলের প্রত্যেকের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বাক্স-পেটরা নিয়ে একজন ক্রীড়াবিদ কিভাবে পালিয়ে যান গেমস ভিলেজ থেকে! পালিয়ে বিমল ভিক্টোরিয়ায় আশ্রয় নেন এ দেশীয় এক সাহেবের বাড়ীতে! আবার সে সাহেবই বিমলের পক্ষে আইনজীবী ধরে কানাডায় তার ইমিগ্রেশনের আবেদন করেন! আরো একজন সাঁতারু থেকে গেছেন এই দেশে। কিন্তু তার পালানোর ঘটনা জানতে পারেনি এ দেশীয় মিডিয়া। ফলে তাকে নিয়ে বিভ্রান্ত পোহাতে হয়নি আমাদেরকে।
সে যাইহোক, লজ্জাস্কর ঘটনার এটি ছিলো শেষ দৃশ্য। এর আগের দৃশ্যগুলোতেও লজ্জার আবরণটা ছিলো ভিন্ন ধরণের। সেটি প্রতিযোগিতার মাঠে ক্রীড়াদলের রুটিন ব্যর্থতার মাঝে। বাংলাদেশ ক্রীড়াদল এ্যাথলেটিক্স, সাঁতার, বক্সিং ও শুটিংয়ে অংশ নেয়। বাংলাদেশের শক্তিমত্ত¡া সম্পর্কে আমাদের সবারই জানা। তাই এ্যাথলেটিক্স, সাঁতার ও বক্সিং নিয়ে কোনো রকমের প্রত্যাশা ছিলো না। ‘অংশগ্রহণই বড়ো কথা’ এমন মূলমন্ত্র নিয়েই যেনো আসা এই তিনটি ইভেন্টে। কিন্তু প্রত্যাশার বেলুন ফুলে-ফেঁপে উঠেছিলো শুটিং দলকে ঘিরে। কারণ ঠিক আগের কমনওয়েলথ গেমস, যা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে। আর সে আসরে বাংলাদেশ জিতেছিলো একটি স্বর্ণ ও একটি ব্রোঞ্জ। দেশের তাবোড় ক্রীড়ামোদী সে সময় নেচে উঠেছিলেন কমনওয়েলথের মতো বড়ো আসর থেকে প্রথম স্বর্ণ জয়ের আনন্দে। এবার তেমনই কিছু ঘটবে এমন প্রত্যাশায় বাংলাদেশের ক্রীড়াদলের এ গেমস কভার করতে সাত জন সাংবাদিক উড়ে এসেছিলেন। কেউ নিজ খরচে, কেউ কোনো না কোনো পৃষ্ঠপোষকতায়। সরকারী খরচে তো নয়ই। তাই সম্ভবত: আশাহতের বেদনাটা ছিলো প্রকট।
কমনওয়েলথ গেমস। বিশাল আয়োজন। বিশ্বকাপের পরই এ গেমসের অবস্থান। এর আগে এতো বড়ো গেমস কভার করার অভিজ্ঞতা ছিলো না। চার বছর আগে চীনের বেইজিংয়ে এশিয়ান গেমস কভারের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সংবাদ সংগ্রহ, আর তা দেশে পাঠানোর কাজটি প্রতিদিন করতে হতো। প্রতিদিনের খেলার সংবাদগুলো লিখে সন্ধ্যায় যখন মিডিয়া সেন্টার থেকে ফ্যাক্সে দেশে পাঠাতাম, তখন অবাক বিষ্ময়ে ভিনদেশী সাংবাদিকরা আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতো। কেউ কেউ আবার বলেই ফেলতো ফ্যাক্স কেনো? এটাতো অনেক সময়ের ব্যাপার। ই-মেইল করে পাঠিয়ে দাও। কিন্তু কীভাবে বলি, আমাদের দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে তখনও (১৯৯৪) ই-মেইলে সংবাদ পাঠানোর পদ্ধতি শুরু হয়নি!
আগেই বলেছি, শুটারদের নিয়ে প্রত্যাশাটা ছিলো অনেক বেশী। সবচে’ বেশী ১০ জন শুটার ছিলেন ১৫ জন ক্রীড়াবিদের মধ্যে। শুটার গোলাম হায়দার, হায়দার আলী, এস চৌধুরী, তৌফিকুর রহমান, আসিফ হোসেন, নাসির উদ্দিন, আখি চৌধুরী, রাজিয়া নওশাদ, কাজী ফেরদৌসী পারভীন পলি ও ফওজিয়া করিম। এদের শুটিং দেখতে প্রতিদিনই আমরা দল ধরে বের হতাম ভিক্টোরিয়া জাতীয় শুটিং রেঞ্জে। মিডিয়া সেন্টার থেকে সাটল বাসে প্রায় এক ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে শুটিং রেঞ্জে যাওয়া-আসাটাই যেনো সার হয়েছিলো। শুটারদের ব্যর্থতার ষোলকলা দেখতে দেখতে আমরা যেনো হাঁপিয়ে উঠছিলাম। অথচ, শুটিং দলকে চীনে ছ’মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে কমনওয়েলথে আনা হয়েছিলো! আর এই কিনা পারফরমেন্স? দশ শুটারের একজনও কোয়ালিফাইং স্কোর গড়তে পারেননি। অথচ চোখের সামনে ভারত, শ্রীলংকানরা ঠিকই পদক তুলে নিয়ে যাচ্ছেন যেনো নামতার ধারাবাহিকতায়।
সাঁতার পুলে দেশের সেরা সাঁতারু মোখলেসুর রহমান ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে ১ মিনিট ১০.৭ সেকেন্ড সময় নিয়ে হিটে সর্বশেষ স্থান পান। অপর সাঁতারু কারার মিজান ২০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে সাঁতার শুরুর আগেই ডিসকোয়ালিফাই হয়ে বসে থাকেন। একমাত্র বক্সার মোজাম্মেল হক ৫৪ কেজি ওজন শ্রেণীতে কানাডিয়ান বক্সারের সাথে প্রথম রাউন্ডেই মুখ থুবড়ে পড়ে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নেন। আর এ্যাথলেটিক্স ট্র্যাকে বিমল চন্দ্র তরফদার ১০০ মিটার ও ৪০০ মিটার হার্ডলসে আব্দুর রহিম নইম হিটে আটজন প্রতিযোগির মধ্যে সপ্তম স্থান পেয়ে বিদায় নেন কমনওয়েলথ গেমস থেকে।
কমনওয়েলথ তো অনেক বড়ো আসর। সাফের মতো গেমসেও বাংলাদেশ ক্রীড়াদলের পারফরমেন্স নিয়ে যখনই যা লেখা হয়েছে তখনই এমন রোজ নামতা লিখতে হয়েছে যেনো নিয়মিত ভাবেই।
সে যাইহোক, এগারো দিন ব্যাপী ভিক্টোরিয়া কমনওয়েলথ গেমস শুরু হয়েছিলো চুরানব্বইয়ের ১৮ আগস্ট। ৬৩ দেশের আড়াই হাজারের বেশী ক্রীড়াবিদের অংশগ্রহণে গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ইংল্যান্ডের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। সেন্টেনিয়াল স্টেডিয়ামে প্রায় ষাট হাজার দর্শক মনোমুগ্ধের মতো উপভোগ করেন গেমসের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান। দীর্ঘ ৩২ বছর নির্র্বাসিত থেকে দক্ষিন আফ্রিকা যেমন ফিরে আসে কমনওয়েলথ আসরে, তেমনি হংকং বিদায় জানায় কমনওয়েলথকে। কারণ একটাই, ততোক্ষণে হংকং অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেছে চীনের প্রশাসনে। তাই এটিই ছিলো হংকংয়ের জন্য শেষ কমনওয়েলথ গেমস। অস্ট্রেলিয়া একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে ৮৮টি স্বর্ণ সহ ১৮৪টি পদক জিতে গেমসের শীর্ষস্থান বজায় রাখে। স্বাগতিক কানাডা ৪১টি স্বর্ণসহ ১৩৩টি পদক নিয়ে দ্বিতীয় সেরার মর্যাদা পায়। গেমসে ভারত ৬টি স্বর্ণ ও শ্রীলংকা একটি স্বর্ণ জয়ের কৃতিত্ব দেখায়। কৃতিত্ব দেখায় পাকিস্তানও। তিনটি ব্রোঞ্জ তারা তুলে নিয়ে যায় বিশাল এ গেমস থেকে। আর বাংলাদেশ? ব্যর্থতা আর লজ্জাস্কর এক একটি ঘটনার জন্ম দিয়ে ফিরে যায় স্বভূমে।
গেমস শেষে আমরা সাংবাদিকরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম ভিক্টোরিয়া শহরকে। আগে জানতাম সবুজ শ্যামলার দেশ বাংলাদেশ। ভিক্টোরিয়া শহর ঘুরে দেখে মনে হলো এটিই বোধ হয় পৃথিবীর সেরা সবুজ শহর। তাই নামটি হয়েছে গার্ডেন সিটি। অনিন্দ্য সুন্দর এ শহর সম্ভবত কানাডার সেরা সুন্দরী শহর। তন্ময় হয়ে উপভোগ করেছি এ শহরের সব সৌন্দর্য্য। তারপর ফিরে গেলাম কানাডার অপর শহর মন্ট্রিয়লে।

- Advertisement -

মন্ট্রিয়ল, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent