
মন্ট্রিয়লের বিখ্যাত ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে টানা প্রায় ৭০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রো-প্যালেস্টাইন শিক্ষার্থীদের অবরোধ আন্দোলন অবশেষে ১০ জুলাই ভোরে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান চত্বর ও আশপাশে শতাধিক শিক্ষার্থী ও তাদের সমর্থকরা তাঁবু ফেলে অবস্থান করছিলেন। নিরাপত্তা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাঁবুগুলো সরিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসান ঘটে এই বহুল আলোচিত আন্দোলনের।
শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে তিনটি স্পষ্ট দাবি জানিয়ে আসছিলেন যেমন – ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানি ও প্রকল্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনিয়োগ বন্ধ করতে হবে, ইসরায়েলি সামরিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাডেমিক সহযোগিতা বাতিল করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে নীতিগতভাবে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে হবে।
আন্দোলনকারীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল যদি এমন খাতে ব্যয় হয়, যা পরোক্ষভাবে দমননীতি বা দখলদারিত্বকে সমর্থন করে, তবে তা শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে। প্রথমে কয়েক ডজন শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা বড় আকার ধারণ করে। স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নাগরিকরা আন্দোলনে এসে যোগ দেন। ফলে ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণ রূপ নেয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতির এক প্রতীকে।
প্রায় ৪০টিরও বেশি ছাত্র সংগঠন লিখিতভাবে সমর্থন জানায়। শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, একাংশ প্রফেসর ও লেকচারারও প্রকাশ্যে আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান। ফলে এটি কেবল শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে এক বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নে রূপ নেয়।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই অবরোধকে অবৈধ বলে উল্লেখ করে আসছিল। তাদের দাবি দীর্ঘ সময় ধরে তাঁবু ফেলে রাখার কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে এবং স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ ও প্রাদেশিক সরকার বারবার চাপ সৃষ্টি করে অবরোধ সরানোর জন্য। কয়েক দফা আলোচনায় সমঝোতা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় তাঁবু সরিয়ে ফেলা হয়।
অবরোধ ভাঙার পরও আন্দোলনকারীরা হতাশ নন। অনেক শিক্ষার্থী সংবাদমাধ্যমে বলেন, যদিও তাদের সব দাবি পূরণ হয়নি, তবুও এই আন্দোলন কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন করে বিতর্ক ও সচেতনতা তৈরি করেছে।
তাদের মতে, এখন শিক্ষার্থীরা ভাবছেন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থ আসলে কোন খাতে ব্যবহার হচ্ছে এবং তা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কি না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক টিমা হুরেন টরন্টো বাংলা টাউনকে বলেন, ম্যাকগিলের এই অবরোধ ছিল ২০২৪ সালের অন্যতম আলোচিত ক্যাম্পাস আন্দোলন। এটি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের প্রশ্ন নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নৈতিকতা ও শিক্ষার্থীদের সামাজিক অবস্থানকে এক সূত্রে বেঁধেছে।
যদিও অবরোধ শেষ হয়ে গেছে, তবে এর প্রতিক্রিয়া এখানেই থেমে নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতের প্রজন্মকে নতুন আন্দোলনের প্রেরণা জোগাবে। ফিলিস্তিন ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তর আমেরিকার ক্যাম্পাসগুলোতে যে নৈতিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা সহজে থামবে না।
সংক্ষেপে বলা যায়, ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আন্দোলন অবসান হলেও এর বার্তা শিক্ষা, নৈতিকতা ও বৈশ্বিক ন্যায্যতার প্রশ্ন অবিরত আলোচনায় থাকবে।
