একটা সাত তলা বাড়ির চিলেকোঠা

একটা সাত তলা বাড়ির চিলেকোঠা

অফিস থেকে দুদিন ছুটি দিয়েছে এই মুহুর্তে বাসা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। মেইন রোডের পাশেই আমাদের বাসা, বাসার সামনের এই রাস্তাটা সবসময় কোলাহল ছিলো এখন কারফিউ চলবার কারনে পুরো রাস্তা ফাঁকা হয়ে আছে। শহরের পথে কেমন অদ্ভুত এক শোকের বাতাসের ঘ্রাণ, শহরকে এখন বড্ড অচেনা লাগছে।

এমনিতে মাসের শেষ যার কারনে পকেটে এখন শহর পথঘাটের মতোই শূন্যতা। আমার রুমমেট সে দুইদিন হয় তার বোনের বাসায় গাজীপুর যেয়ে আটকে গেছে আসতে পারছে না, কারো কাছ থেকে যে টাকা ধার নিবো তার উপায় নেই।

- Advertisement -

রুমের ভিতরে খাবারের কিছু খুঁজে দেখলাম একটা পাউরুটির অর্ধেক আছে তবে সেই পাউরুটির প্যাকেটের পাশে একটা তেলাপোকা হাঁটতে দেখে রুটি খাওয়ার ভক্তি আসলো না।

প্যান্টের পকেট হাতিয়ে, বিছানার নিচে সবকিছু খুঁজে কয়েকটা খুচরো পয়সা পাই। যেহেতু আমি সিগারেট খাই না যার কারনে খুচরো পয়সা দোকানদার দিলে বিছানার নিচে রেখে দেই। হিসেব করে দেখলাম পঁচিশ টাকা হয়েছে।

ভেবে রাখলাম আপাতত এই টাকা দিয়েই কয়েকটা পাউরুটি কিনে খেয়ে চালিয়ে দিবো। সবকিছু স্বাভাবিক হলে হয়তো কারো কাছ থেকে ধার নিয়ে নেওয়া যাবে, তাছাড়া আমার রুমমেট তপন ভাই আসলে তার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নেওয়া যাবে।

আমাদের বাসার নিচ তলায় একটা চায়ের দোকান আছে, দুপুরের দিকে নিচে যেয়ে দোকান থেকে দুইটা পাউরুটি আর একটা কলা নিয়ে আসলাম।

সিঁড়ি থেকে উপরে উঠতে যাবো তখনই আমাদের বাড়িওয়ালা আজিজ আংকেলের সাথে দেখা। আংকেল বলল, তোমার রুমে গেছিলাম পেলাম না। আমি বললাম আংকেল জরুরী কিছু? আংকেল বলল, আজকে তুমি আমাদের সাথে ভাত খেও, জাফর গ্রাম থেকে একটা বড় বোয়াল মাছ নিয়ে এসেছে, বাসায় মানুষ আমি আর তোমার আন্টি তাই ভাবলাম তোমাদের দুজনকে বলি। আংকেল বলল, অন্য জন কই? আমি বললাম তপন ভাই তার বোনের বাসায় গাজীপুরে আছে, আসতে পারেনি। আংকেল বলল, হ্যাঁ বাহিরের যে অবস্থা এর ভিতরে বের না হওয়া ভালো। আংকেল বলল, তুমি এসো কিন্তু, তুমি আসলেই খেতে বসবো৷ আমি বললাম আচ্ছা আসবো।

সাত তলা এই বাড়িটার চিলেকোঠার ঘরে আমি আর তপন ভাই থাকি। যখন বাসা খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত তখনই এই বাসার খোঁজ পাই। আমার ভীষণ ভাবে বাসাটা পছন্দ হলো। বড় সড়কের পাশে বাড়িটা যার কারনে এখানে দাঁড়িয়ে খুব সহজে পুরো শহরটাকে দেখা যায়, জোছনা রাতে চাঁদের আলো আসে। শহরে এখন এমন হয়েছে চাঁদের আলো আর জানালা দিয়ে ভোরে রোদ আসে এমন একটা বাসা পাওয়া দুস্পাপ্য। প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে যায় এই বাসা, তখনই এডভান্স করে যাই। এই বাড়িটাতে সেই থেকে তিনবছর ধরে আমি আর তপন ভাই আছি৷ অবশ্য তপন ভাই নতুন বিয়ে করেছে, দুই মাস পরেই ভাবিকে শহরে নিয়ে আসবে তখন নতুন বাসা নিবে। আমি ভেবে রেখেছি এই বাসাটা ছাড়বো না, দরকার হয় একাই থাকবো। এমন একটা বাসা পাওয়া বিশাল কিছু। আমার আকাশ দেখা আর চাঁদের আলো ঘরে আসা খুব জরুরী।

রুমের ভিতরে কলা রুটি রেখে গোসল দিয়ে তিনতলায় আজিজ আংকেলের বাসায় গেলাম। আংকেলের দুই ছেলেমেয়ে মেয়ের বিয়ে হয়েছে আর ছেলে দেশের বাহিরে থাকে, এখন পুরো ঘরে তারা দু’জন থাকেন৷ জাফর ভাই এই বাড়ির দারোয়ান, জাফর ভাই তার গ্রাম থেকেই সাত কেজি ওজনের এই বোয়াল মাছ নিয়ে এসেছেন। বোয়াল মাছ আর দেশী মুরগী দিয়ে ভাত খেলাম। আন্টির হাতের রান্নার প্রশাংসা না করলে সে হবে পাপ, হয়তো তার শত্রুকে যদি তার হাতের রান্না খাওয়ানো হয় সে তাকে পছন্দ করা শুরু করবে।

বাসায় এসে দেখি বাড়ি থেকে মা বেশকয়েকবার কল দিয়েছেন। এই সময়টায় মা একটু বেশিই কল দেন, দেশের অবস্থা ভালো না যার কারনেই। আমি কল ব্যাক করলাম মা বললেন, কি করছি? খাইছি কি-না। আমি বললাম হ্যাঁ খাইছি। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি করো মা। মা বলল, পাশের বাড়ির হাবিব চাচায় এসেছে তাকে ভাত দিচ্ছি তখনই তোর কল, আমি যখন কল দিলাম ধরলি না কেন? আমি বললাম খাবার খাইতেছিলাম দেখি নাই যার কারনে।

আমাদের বাড়ি থেকে দুই বাড়ি পরেই হাবিব দাদুর বাড়ি।হাবিব দাদু আমাদের বাড়িতে প্রায় দিনই আসেন, যেদিন আমাদের বাড়িতে আসেন আমার মা কিংবা বাবা কেউ তাকে ভাত না খেয়ে যেতে দেন না। দাদুর ছেলেমেয়ে কিছু নেই, একাই থাকেন বিশাল একটা বাড়িতে। যার কারনে আমাদের বাড়িতে আসলে তাকে ভাত না খেয়ে যেতে দেন না, বাটিতে করে রাতের খাবার দিয়ে দেন। বাড়িতে যখন ছিলাম এসব দেখেছি, দাদুকেও দেখেছি কখনো গাছের পেয়ারা কখনো তাল আমার মায়ের জন্যে নিয়ে আসতেন।

এই জগতে কিছু নিয়ম কানুন ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকে। এই যে আজকে আমার পকেটে টাকা ছিলো না তবু দুপুরে আজিজ আংকেলে৷ বাসায় ভরাপেটে বোয়াল মাছ, দেশী মুরগী দিয়ে খাবার খেলাম। তেমনি আমার মা গ্রামে একজন মানুষকে খাওয়ালো, যদিও তার সাথে আমাদের কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। দুনিয়ায় যে যতোটুকু দিবে ঠিক ততোটাই অন্য কোথাও থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

- Advertisement -

Read More

Recent