পরিপক্কতা

পরিপক্কতা

আমি যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি তার প্রথম স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে।

প্রখ্যাত প্যারা সাইকোলজিস্ট আনিস দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে আমরা সারাদিনে যেসব জিনিসের দিকে তাকাই তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঘড়ি। কিন্তু এর সৌন্দর্যের দিকে কি আমরা নজর দেই? এমন হতে পারতো ঘড়ির মধ্যে নানান ধরনের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি থাকতো। দুপর বেলায় নায়াগ্রা ফলসের জলপ্রপাতের ছবি থাকতো। বিকেলে বেলায় সমুদ্র তীরের সূর্যাস্তের ছবি থাকতো।

- Advertisement -

আনিস রুমানার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো
বলেনতো সন্ধ্যায় আপনার সবচাইতে প্রিয় স্থান কোনটি?

রুমানা বুঝতে পারছে না। ড আনিস কি তার কথা শুনেছে? নাকি তার নিজের ভুবনের মধ্যেই তিনি আটকে আছেন? সবাই উনাকে পাগল বলে। কিন্তু সবাই এটাও স্বীকার করেন মানুষের মন বুঝার এক অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে এই মানুষ জন্মেছেন। উনি সাইকোলজি নিয়ে পড়াশুনা করেছেন। পরবর্তীতে উনি প্যারা সাইকোলজি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। কোথাও প্র্যাকটিস করেন না। কিছুদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। এখন মাঝে মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে ক্লাস নেন। খুবই সাধারণ জীবনযাপন।
স্যার আপনি আমার কথাটা মনে হয় শুনেন নি। আমি এক সপ্তাহ পর যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি তার প্রথম স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে।

আনিস শূন্য চোখে রুমানার দিকে তাকালো। তারপর বললো
জী বুঝতে পেরেছি। আপনি কি আমাকে দাওয়াত দিতে এসেছেন? নাকি দোয়া নিতে এসেছেন? যেহেতু আপনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী হতে যাচ্ছেন আমি দোয়া দিচ্ছি যেন আপনাকে আত্মহত্যা করতে না হয়।

স্যার আমার মা এই বিয়েতে রাজি না। উনার কথা হচ্ছে এই ছেলে তার বউকে খুন করেছে। কিন্তু কথা সত্য না। পুলিশের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে সেই মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। তার একটা ছেলের সঙ্গে প্রেম হয়েছিলো। সেই ছেলে তাকে কষ্ট দিয়ে চলে যাওয়ার পর মেয়েটা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। আমি আপনাকে আরেকটু বিস্তারিত বললে আপনি বুঝতে পারবেন। আমি তানিমের সঙ্গে মিশি গত ছয় মাস ধরে। তার স্ত্রী মারা যায় গত বছরের জুলাইতে। মানে আমার সঙ্গে যখন তানিমের পরিচয় হয় তার দুই মাস আগে তার স্ত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। সেই সময় তানিম অফিসে ছিলো। সব সাক্ষ্য প্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে যে সে নির্দোষ। যেই ছেলের সঙ্গে মিতুর প্রেম ছিলো সেই ছেলেটাকে পুলিশ ধরেছিলো। সেও স্বীকার করেছে যে তার সঙ্গে মিতুর প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। কিন্তু মেয়েটার অতিরিক্ত আবদারের কারণে তাদের রিলেশনশিপ অসহনীয় হয়ে গিয়েছিলো। তাই ছেলেটা ব্রেকআপ করে। এটা সহ্য করতে না পেরে মিতু আত্মহত্যা করেছিলো। ছেলেটা খুব প্রভাবশালী হওয়াতে তার কিছুই হয়নি। কিন্তু আমার মা কোনভাবেই বুঝতে চাচ্ছে না। আপনি কি একটু আমার মা-কে বুঝিয়ে বলতে পারবেন। উনি আপনার লেখা খুব পড়ে। আপনাকে খুব মানে।

আমারতো মনে হয় আপনার মায়ের চাইতে আপনি বেশি ভয় পাচ্ছেন।

রুমানা চুপ করে থাকে।
স্যার ছোটবেলায় আমার ভাই মারা যায়। তার পাঁচ দিন আগে আমার মা একটা স্বপ্ন দেখেছিলো যে আমার ভাই উঁচু জায়গা থেকে পরে যাচ্ছে। এবং বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছে। এই স্বপ্ন উনি পর পর পাঁচ রাত দেখেছিলেন। আমার বাবাকেও বলেছিলেন। ষষ্ঠ দিনে এসে আমার ভাই পাঁচ তালা ছাদ থেকে পরে মারা যায়। আমার এক সপ্তাহ পর বিয়ে। আমার মা স্বপ্ন দেখেছেন যে তানিম একটা ছুরি হাতে আমাকে খুন করতে আসছে। আমি দৌড়ে পালাচ্ছি। এটা উনি গত তিন রাত দেখেছেন। আমার ভীষণ ভয় করছে। আমার সঙ্গে তানিমের খুব ভালো সম্পর্ক। বলতে পারেন আমাদের ভীষণ প্রেম চলছে। কিন্তু আমি মাথা থেকে কোনভাবেই মায়ের স্বপ্নটা বের করতে পারছি না। তাই আপনার কাছে এসেছি। আমার মায়ের মতো আমিও আপনার লেখার ভক্ত। আমার মায়ের চাইতে আমার আপনাকে বেশি প্রয়োজন।
আনিস উঠে দাঁড়ায়। আপনার এড্রেস, তানিমের বাসার এবং অফিসের এড্রেস, ওই মেয়ের বাসা এবং তার ছেলে বন্ধুর এড্রেস যোগাড় করে আমাকে ম্যাসেজ করুন।

আনিস তানিমের অফিসে বসে আছে। রুমানার পিড়াপীড়িতে আসতে হয়েছে। আপনি যদি ছেলেটাকে দেখে ক্লিয়ারেন্স দিতেন তাহলে আমি ভরসা পেতাম। আনিসের ইদানীং রাতে ঘুম হয় না। সে স্বপ্নে দেখে কেউ একজন তাকে উঁচু বিল্ডিং থেকে নীচে ফেলে দিচ্ছে। লোকটার চেহারা বুঝা যাচ্ছে না। কিন্তু আজকে তানিমকে দেখার পর তার মনে হলো যে তাকে নীচে ফেলে দিচ্ছে সে তানিম।

আনিসের হাসি পায়। সে জানে মানুষ কেন দুঃস্বপ্ন দেখে। এটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। শারীরিক এবং মানসিক অশান্তি এবং অস্থিরতার কারণেই মানুষ দুঃস্বপ্ন দেখে। ইদানীং আবিষ্কার হয়েছে দুঃস্বপ্ন খারাপ না। এটা মানুষকে নেতিবাচক অনুভূতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।

তানিম আনিসকে খুব খাতির যত্ন করলো। খুব সুন্দর সুন্দর কথা বললো। রুমানাকে বিয়ে করার পর তার দাম্পত্য জীবনের নানান স্বপ্নের কথা বললো। মিতুকে নিয়ে তেমন কোন কথা হয়নি। সে শুধু একবার বললো
মিতুকে আমি ভালবেসেছিলাম। কিন্তু সে ভালোবাসার মর্যাদা রাখেনি।

মিতুর সঙ্গে যেই ছেলেটার সম্পর্ক ছিলো তার নাম রাহাত। সে কোনভাবেই রাজি হচ্ছিলো না আনিসের সঙ্গে দেখা করতে। আনিস জানে এই ব্যাপারে সে জোরও করতে পারবে না। অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেলো রাহাত যে কোম্পানিতে চাকরি করে তার বসের ভাই আনিসের ছাত্র ছিলো। সেই সূত্রে সাক্ষাৎ পাওয়া গেলো।

রাহাত ছেলেটা সুদর্শন আছে। তার একটাই কথা
দেখুন মিতুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিলো। মেয়েটা ভালোবাসার কাঙ্গাল ছিলো। শুধু জোর করতে চাইতো। একসময়য় আমার কাছে অসহনীয় লাগা শুরু হয়। আমি ব্রেকআপ করি। তাকে ব্লক করে দেই। এরপর তার সঙ্গে আমার আর কথা হয়নি। আমার কারণে সে আত্মহত্যা করেছে এটা আমি মানতে পারছি না। কেননা আমার সঙ্গে ব্রেকআপের দুই মাস পর সে আত্মহত্যা করে। অন্য কেউ জড়িত থাকতে পারে।

রুমানা দরজা খুলে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। তার সামনে ড আনিস দাঁড়িয়ে।
স্যার আপনি আমার বাসায়।
জী। এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। তাই ভাবলাম এক কাপ চা পান করে যাই।

জী স্যার বসেন। আমার মা-ও আপনার ভক্ত। উনাকে ডাকি।

রুমানার মা এসে তাকে খুব প্রশংসা করলো। আমি মনোবিজ্ঞান নিয়ে আপনার লেখাগুলো খুব পড়ি। খুব ভালো লাগে। আমার মেয়ের দুই দিন পর বিয়ে। ও আমাকে বলেছে আপনার কথা ছাড়া ও এই বিয়ে বসবে না। আপনি এসেছেন খুব ভালো লাগছে।
আনিস চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চিন্তা করলো। তারপর সে রুমানার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে
এই বিয়ে দিয়েন না।

কেন? রুমানার মা বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।

সেটা আপনার মেয়ে খুব ভালো করে জানে। তবু আমি আবার বলছি। তানিমের আগের জীবন নিয়ে আমার কিছু মতামত আছে। তার প্রথম স্ত্রী মিতু খুব ইমোশনাল একটা মেয়ে ছিল। আরো আট দশটা বাঙালি মেয়ে যেমন আবেগপ্রবণ হয় তেমনি।
আমাদের সমাজের সবচাইতে বড় সমস্যা দুটি।

এক আমাদের দেশের মেয়েরা একটা স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়। সেটা হচ্ছে পরিবারের স্বপ্ন।
আর দুই হচ্ছে; আমাদের দেশে বিয়ের আগে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়না। তাই বড় বড় মানসিক রোগীরা বিয়ে করে নামে মাত্র সংসার করছে।

তানিম অন্য অনেক ছেলেদের মতো একজন মানসিক বিকার-গস্ত। সে বাইরের মানুষদের সঙ্গে খুব ভালো কিন্তু ঘরে সে একজন মানসিক রোগী যে সারাক্ষণ তার স্ত্রীর দোষ ধরতো। তাকে কথা শুনাতো। সন্দেহ করতো। সে স্ত্রীকে ঘরে আটকিয়ে রাখতে চাইতো। কথা না শুনলে চিৎকার চেঁচামেচি করতো। এই বাসায় একজন কাজের মেয়ে ছিলো। আমি তাকে খুঁজে বের করেছি। সে বলেছে যে তানিম বাসায় সারাক্ষণ মিতুকে অপমান করতো। তাকে কোন কাজে সাহায্য করতো না। সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশে এই ধরনের কঠিন অবস্থা কিভাবে মোকাবেলা করতে হয় তা কাউকে শিখানো হয় না। ফলে সেই মেয়েটা নিজে নিজে ডিপ্রেশনে চলে যায়। সে কারো কাছ থেকে কোন সাহায্য পায় না। এই ক্ষেত্রে দোষ দেয়া যায় তার বেড়ে উঠার পদ্ধতিকে।

দ্বিতীয় একটা তথ্য রুমানা আমাকে দেয়নি। যেটা আমাকে খুঁজে বের করতে হয়েছে। সেটা হচ্ছে রুমানার আগে একটা বিয়ে হয়েছিলো। সেই ঘরে তার একটা মেয়ে আছে। এবং রুমানা এই বাসায় আসার আগে মিতুদের উপরের ফ্ল্যাটে থাকতো।
রুমানা বিস্ফোরিত চোখে আনিসের দিকে তাকিয়ে আছে।

ড আনিস রুমানার দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে।
যেহেতু মিতু নিঃসঙ্গ ছিলো এবং বিষণ্ণ ছিলো। সে আপনার মেয়ে মারিয়াকে খুব আদর করতো। আপনি অফিসে থাকতেন। আপনার মেয়ে কাজের লোকের কাছে থাকতো অথবা আপনার মা যখন আপনার বাসায় থাকতো তখন উনার কাছে থাকতো। হটাত আপনি খেয়াল করলেন যে মারিয়া আপনার চাইতে মিতুকে বেশি ভালবাসে। এটা আপনার সহ্য হলো না। আপনি বাসা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেন। মিতু আরো বিষণ্ণতায় ডুবলো। কিন্ত আপনিও সমস্যায় পরলেন যে মারিয়া শুধু মিতুকে খোঁজে। আমাদের দেশের যেসব মেয়েরা চাকরি করে তারা সবাই কম বেশি এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত। যে তাদের সন্তানরা তাদের চাইতে কাজের মেয়েদের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ।

তখন আপনি প্রতিহিংসা থেকে আপনার বন্ধু রাহাতকে বলেন মিতুর সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে তাকে ছেড়ে দিতে। রাহাত আপনাকে বেশ পছন্দ করে। আপনার কথায় সে মিতুর সঙ্গে প্রেম শুরু করে। সেই বিষণ্ণ অবস্থায় হতাশ মিতুর তখন একজন বন্ধুর ভীষণ প্রয়োজন যাকে সে মনের কথা খুলে বলতে পারবে। কিন্তু এই সমাজে এমন বন্ধু কোথায়? এর জন্য শুধু ছেলেরা দোষী না মেয়েরাও দোষী।

রাহাত আপনার কথামতো একসময় মিতুকে ছেড়ে দেয়।
একদিকে তার স্বামীর অপমানজনক আচরণ, নিদারুণ অবহেলা, কথায় কথায় সন্দেহ, সময় না দেয়া। অন্যদিকে মারিয়াকে হারানোর দুঃখ। যাকে বন্ধু ভেবেছিলো সেই রাহাতের চলে যাওয়া সব কিছু এই মেয়েটাকে আত্মহত্যার দিকে প্ররোচিত করে। আবার সেই ঘুরে ফিরে ঐ কথা বলতে হয় এই ক্ষেত্রে সমাজের দায় যতটুকু সেই মেয়েটা এবং তার পরিবারের দায়ও সমান। আমরা এক অদ্ভুত স্বপ্ন দিয়ে আমাদের জীবন কাটাতে চাই।

আপনি জানতেন যে তানিম আদতে এমন। কিন্তু অন্যদিকে মারিয়া যেহেতু এখনো মিতুর কথা বলে, তানিমের কথা বলে। আপনার মা ভেবেছিলেন যে আপনি আর কতদিন সিঙ্গেল মাদার হয়ে থাকবেন? তার চাইতে সেই পরিচিত বাসাতেই মারিয়া যাক।
কিন্তু আপনি তা মনেপ্রাণে চাননি। আপনি জানতেন আমি একটু খোঁজ নিলেই তানিমের চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্য বের করতে পারবো এবং তা আপনার মা-কে আমি বললে আপনার এই বিয়ে হবে না। যদিও আপনি স্বাধীন তবুও আপনার পরিবারের প্রতি আপনার দুর্বলতা আছে। কিন্তু আমি যে রাহাতের অফিসে গিয়ে আপনাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ছবি দেখতে পাবো তা আপনি আশা করেন নি।

আপনি আমাকে যে গল্প বলেছেন আপনাকে ক্রেডিট দিতেই হবে। আপনার গল্প দারুণ ছিলো। এভাবে গল্প বলতে পারা চাট্টিখানি কথা না। আপনি একজন প্রচণ্ড কল্পনাপ্রবন মানুষ।

আনিস উঠে দাঁড়ায়
সংসার অনেক বড় ব্যাপার। মানসিক পরিপক্বতা না আসলে কারোই সংসার করা উচিত না। এই সত্যটা এই দেশের মানুষ কবে বুঝবে তা জানি না।

- Advertisement -

Read More

Recent