দেশটা অন্যরকম

দেশটা অন্যরকম

পাশের ফ্ল্যাটে নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে শুনে নবনীর মা নিশিতা এতো খুশি যে খুশিতে কি করবে না করবে অবস্থা।মায়ের খুশি হওয়ার পেছনে অবশ্য একটা সুনির্দিষ্ট কারণও আছে।সেটা হলো পাশের ফ্ল্যাটে যারা এসেছে সে হলো নিশিতার মায়ের ছোটবেলার বান্ধবী আশিয়া।আশিয়ার সাথে নবনীর মায়ের সেই ছোট থেকে গাঢ় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।যা এখনও পর্যন্ত বিরাজমান।এদিকে নবনী ও শ্রাবণী দু-জমজ বোন হালকা পাতলা আলোচনা করলো মায়ের এমন কাজকর্ম নিয়ে।নবনী আর শ্রাবণী জমজ বোন।নবনীর থেকে শ্রাবণী তিন মিনিটের ছোট মাত্র।জমজ হলেও দুজনের চেহারার মাঝে রয়েছে প্রগাঢ় পার্থক্য।দুজনের স্বভাবচারিতায়ও রয়েছে বড়সড় রকমের অমিল।শ্রাবণী ভীষণ শান্তশিষ্ট,নম্র-ভদ্র স্বভাবের হলেও নবনী ঠিক তার উল্টো অশান্ত,বদমেজাজী স্বভাবের।নবনীর গায়ের রঙ শ্যামলা প্রকৃতির আর শ্রাবণী হলুদ ফর্সা।নবনীর চোখদুটো গোলগোল আর শ্রাবণীর টানাটানা।তাদের চেহারায় এমন অমিলের জন্য কেউ বুঝতে পারে না তারা জমজ বোন।দুজন দু-মুখো প্রান্তের।একজন এন্টার্কটিকা তো অন্যজন এশিয়া।দুজনেই অনার্স প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করছে সবে।একই ইউনিভার্সিটিতে।এই প্রান্তটা দুজনের তীরে এসে বেধেছে।

একটু আগে মায়ের বিষয়ে আলোচনা করে খন শুয়ে শুয়ে নিজের করা আজকের দুষ্টামির কথা ভাবছিলো নবনী।অন্যপাশে সোফায় আরামদায়ক ভাবে বসে উপন্যাসের বই পড়ছিলো শ্রাবণী।অবসর সময়ে উপন্যাসের বই পড়তে বেশ পছন্দ করে শ্রাবণী।আজকে শুক্রবার হওয়ার দরুণ সকাল থেকে মায়ের কাজে সাহায্য করে একটু আগে রুমে এসে বোনের সাথে কিছুক্ষণ মায়ের ব্যাপারে আলোচনা করে এখন উপন্যাসের বই পড়া শুরু করেছে।ওদিকে নবনী সেই সকালে প্রানপ্রিয় দুজন বান্ধবীকে নিয়ে কোথাও একটা বেরিয়েছিলো এসেছে সন্ধ্যা হওয়ার কিছু সময় আগে।আসলে নবনীর বান্ধবী ইশাকে এক ছেলে ভীষণ বিরক্ত করে বলে নবনী গিয়ে সেই ছেলেকে পিটিয়েছে।যে কথা আপাতত বাসার কেউ জানে না।নয়তো নবনীর বাবা পাল সাহেব মেয়ের এমন কাজকর্মের কথা জানতে পারলে মেয়েকে আজই ঘরছাড়া করবে।নবনীর বাবা পাল সাহেব একজন বেশ নামকরা ডাক্তার।এলাকার সবাই পাল ডাক্তার হিসেবেই চিনে নবনীর বাবাকে।সবাই বেশ সম্মান করেন পাল সাহেবকে।এ সম্মানটা দ্বিগুণ হয়েছিলো তখন, যখন শ্রাবণী মাধ্যমিক পরীক্ষায় পুরো জেলায় ২য় স্থান অধিকার গ্রহণ করে।অন্যদিকে নবনী কোনোভাবে পাস করেছিলো।এই খবরটা আত্মীয়-স্বজন ছাড়া কেউ জানে না।তবুও নবনীর মাঝে নেই কোনো লজ্জাবোধ,নেই কোনো আফসোস।সে দিব্বি নিজের জীবন কাটাচ্ছে নিজের মতো।ছেলেদের মতো দুষ্টামি করে ঠিকই তবে বাবা-মায়ের কথাও বেশ মানে নবনী।নামের সাথে এক চিলটে পরিমাণও যেন মিলে না তার প্রতি।প্রথম প্রথম কেউ নবনীকে দেখলে সবার আগে মুখ থেকে একটি শব্দই বের হবে ‘ভদ্র মেয়ে’ অথচ নবনী ঠিক তার উলটো।নিজের ব্যাপারে এসব ভাবাভাবির মাঝেই দরজা ঠেলে রুমের ভেতর প্রবেশ করেন নিশিতা।হাতে তার একটা বক্স।দেখে বোঝার উপায় নেই সেটা কিসের।তবে ঘ্রাণ হিসেবে যদি হিসেবটা কষা হয় তবে বোঝা যাবে বক্সটিতে মুখোরোচক খাবার রয়েছে।এই যে নবনীর নাসারন্ধ্রিতে সেটা প্রবেশ করতেই একলাফে বিছানা ছেড়ে উঠে বসে।ওপাশে থাকা শ্রাবণী নির্বাক,নিশ্চল।নবনী উঠে মায়ের হাতে বক্স দেখে ভাবতে থাকে ওটা কিসের জন্য?এদিকে নিশিতা হালকা কেশে নবনীর উদ্দেশ্যে হুকুম ছুড়েন,“যা তো নবনী এটা তোর আশিয়া আন্টিদের দিয়ে আয়।”

- Advertisement -

এমন কথা নবনী কিছুতেই আশা করেনি।সে তো ভেবেছিলো তার মা নিশ্চয় তাদের জন্য নিয়ে এসেছিলো এই খাবার।নবনী চোখমুখ কুচকে আবারও শুয়ে পড়ে বিছানায়।ছোট্ট করে বলে,“শ্রাবণীকে পাঠাও।”

মেয়ের কথায় নিশিতা কিছুটা রেগে যান।বিকেলের দিকে বান্ধবী আশিয়া বলেছিলো ছোট মেয়ে শ্রাবণীকে দেখতে পেলেও বড় মেয়ে নবনীকে এখনও দেখেননি তিনি।সাধারণত তাদের যোগাযোগ থাকলেও কখনো দেখা সাক্ষাৎ হয় নি।কারণ আশিয়ার বিয়ে হয়েছিলো ময়মনসিংহে আর নিশিতার ঢাকায়।যোগাযোগটা ছিলো নিত্যদিনের তবে দেখাদেখি ছিলো না।আশিয়ার স্বামী একজন সরকারী কর্মকর্তা হওয়ায় এবার ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় ট্রান্সফার হয়েছে।উনার অফিসটা যেখানে সেখানের থেকে বাসাটা বেশ কাছে হওয়ায় তাড়াতাড়ি এখানে শিফট হয়ে যায় তারা।সকালে কাজ করার সময় আশিয়া একবার তাদের বাসায় আসেন।তখনই প্রথম শ্রাবণীকে দেখেন তিনি।নবনী বাসায় না থাকায় তাকে দেখতে পান না।তাইতো দেখার ইচ্ছে পোষণ করেন বান্ধবীর কাছে।নিশিতাও খাবার দিয়ে আসার বাহানায় মেয়েকে পাঠাচ্ছিলেন আশিয়াদের বাসায়।তবে মেয়েটার ঘাড়ত্যাড়া উত্তর সম্পর্কেও তিনি অজ্ঞাত ছিলেন।এবার একটু গম্ভীর স্বরে আবারও মেয়ের উদ্দেশ্যে শুধান,“তাড়াতাড়ি দিয়ে আয় বনী।নয়তো তোকে আজ রাতের খাবার দেবো না বলে দিলাম।”

নবনীর এমনিতেই প্রচুর ক্ষিদে পেয়েছিলো আগে থেকে।মায়ের এমন কথায় এখন কিছুটা নড়েচড়ে ওঠে নবনী।মায়ের যখন রাগ হয় তখনই এই ‘বনী’ নামটা মুখ থেকে নিঃসরণ করে।আড়চোখে শ্রাবণীর দিকে একপলক তাকিয়ে উঠে বসে।মনে মনে ভাবে শুধু খাবারের বক্সটাই তো দিয়ে আসতে হবে এতে ঠিক কতখানি পরিমাণ কাজ করতে হবে একবার হিসেব করে নেয়।মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে নিশিতা তার দিকেই চোখ রাঙিয়ে।এবার প্রচুর আলসে ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে মায়ের হাত থেকে বক্সটা নিয়ে পা বাড়ায় আশিয়া আন্টি নামক উটকো ঝামেলার বাসার উদ্দেশ্যে।বাসা থেকে বেরিয়ে আশিয়াদের ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়ায় নবনী।মনে মনে ভাবে এই ফ্ল্যাট-টা আগে খালি ছিলো।এখন এই ফ্ল্যাটে নাকি মানুষ এসেছে।অন্যান্য প্রতিবেশিদের ভাষ্যমতে এই ফ্ল্যাটে আগে চায়না থাকতো তিনজন।একবছর আগেই তারা চলে গিয়েছে।সেই থেকে ফ্ল্যাট-টা খালি।এর নির্দিষ্ট কারণটা অজানা তার।দরজায় নক করতে থাকে নবনী।কলিংবেলে চাপ দিতে তার গায়ে বাধে।এই আরেক সমস্যা।বেশ কয়েকবার নক করেও যখন দরজা খোলা নাহয় তখন বড়সড় করে দরজায় করাঘাত শুরু করে যেমন এখনই ভেঙ্গে ফেলবে দরজা।আবারও দরজায় নক করবে তার আগেই দরজা খুলে যায়।নবনীর ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফোটে ওঠে।নবনী মাথা নামিয়ে সবেগে বলে ওঠে,“আন্টি এটা আপনাদের জন্য মা পাঠিয়েছে।”

নিচে পুরুষালী পা দেখে মাথা তুলে সামনে তাকায় নবনী।দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে দেখে চমকে ওঠে নবনী।ঠোঁট দুটো আপনা-আপনি হা হয়ে যায়।ছোট্ট করে বলে,“অনন্য।”

পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয়।তবে তার পুরো মস্তিষ্ক জুড়ে বিচরণ চলছে ভার্সিটির এই সিনিয়র এখানে কি করছে?কিভাবে সম্ভব?তাহলে কি আশিয়া আন্টির বড় ছেলেই অনন্য?কিন্তু আশিয়ারা তো আগে ময়মনসিংহ থাকতো?কিন্তু এই মশায় তো তাদের ভার্সিটিতেই পড়াশোনা করছে তাদের থেকে দুই ব্যাচ সিনিয়র।এতসব প্রশ্নের মাঝে ভরাট পুরুষালী আওয়াজে সৎবিৎ ফিরে পায় নবনী।

“কে আপনি?কি চাই?”

অনন্যের মুখে আপনি ডাক শুনে মনে মনে হেসে ওঠে নবনী।অনন্য নবনীকে চেনে না তবে নবনী অনন্যকে চেনে।কারণ অনন্য নামক ছেলেটা ভার্সিটিতে বেশ জনপ্রিয়।কারণ সে একজন ব্রাইট স্টুডেন্ট।নবনী ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে অনন্যকে।শ্রাবণীর ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র এই ছেলে।ভ্রু জোড়া কুচকানো হলেও চোখে স্পষ্ট সৌজন্যতা রয়েছে,ঠোঁটে তার একরাশ সরলতা,চুলগুলো এলোমেলো।আগে কয়েকবার দেখা হয়েছে এই ছেলেকে তবে এতো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি।ভার্সিটির মেয়েদের ভাষ্যমতে অনন্য নামক ছেলেটা বেশ সুদর্শন।নবনী সেটা আজ বুঝতে পারলো।এই গরমের মাঝেও শীতল হাওয়া বয়ে যায় তার পাশ দিয়ে।নিজেকে বহুকষ্টে সামলে দাত কপাটি বের করে হেসে বলে,“আমি নবনী।মা এটা আপনাদের জন্য পাঠিয়েছে।আশিয়া আন্টি কোথায়?”

নবনী হাতে থাকা বক্সটা অনন্যের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কথাটা বলে।তখন অনন্যের পেছনে এক মহিলা এসে জিজ্ঞাসা করে,“কে এসেছে অনন্য বাবা?দাঁড়িয়ে আছিস যে?”

অনন্য পেছনে একপলক মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“নবনী না কি যেন বললো নাম।তুমি দেখো।”

কথাটা বলেই নবনীকে একপলক দেখে সেখান থেকে চলে যায় অনন্য।নবনীর চোখজোড়া শুধু অনন্যের চলে যাওয়ায় দেখে।এদিকে তার সামনে এসে আশিয়া দাড়িয়েছে সে খবর কি আছে তার?আশিয়া নবনীকে দেখে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে।মনে মনে বলে ‘মায়ের মতো হয়েছে’।মুখে বলে,“তুমিই নবনী?আহা মায়ের মতো হয়েছো তুমি।এসো এসো ভেতরে এসো।”

নবনী যাওয়ার জন্য রেডি হলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে নেয়।আর বলে,“না আন্টি অন্য একদিন যাব।এটা মা পাঠিয়েছে।রেখে দিন।”

আশিয়া অনেকবার বললেও খুব কষ্টে নবনী নাকোচ করে দেয়।প্রথমবারেই যদি ভেতরে যায় তাহলে অনন্য সাহেব ছ্যাচড়া ভাববেন।তাই ভাবে অন্য একদিন।নবনী রুমে এসে শ্রাবণীর সামনে বসে বলে,“আশিয়া আন্টির ছেলে অনন্য?”
শ্রাবণীও সহজ সরল স্বীকারোক্তি দেয়,“হ্যা।”

”কিন্তু কিভাবে কি?আশিয়া আন্টিরা তো আগে ময়মনসিংহ থাকতো।আর অনন্য ঢাকা।তোর ডিপার্টমেন্ট সিনিয়র তাহলে কিভাবে কি?আমি বুঝতে পারছি না।”

শ্রাবণী বইটা মুখের সামনে থেকে সড়িয়ে নবনীর দিকে তাকিয়ে একটা ফোস করে শ্বাস ফেলে বলে,“অনন্য ভাই ভার্সিটির হলে থাকতো।তার বাবা-মা এখানে এসেছে বিধায় এখন থেকে এখানেই থাকবে হয়তো।এতকিছু জানি না আমি।তুই গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা কর।”
“তার আর দরকার নেই রে শ্রাবণী।আহা ছেলেটা আসলেই হ্যান্ডসাম।আজকে ভালোভাবে দেখলাম মানুষটাকে।আর আজকেই মনটা গলে গেলো আমার।”

শ্রাবণী আড়চোখে নবনীর দিকে তাকায় শুধু।পরপরই বই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।নবনী বিছানায় বালিশ জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে।আজ তার ভালো লাগছে অনেক।এতো এতো ভালো লাগছে কেন সেটা তার জানা নেই।শ্রাবণীকে হিংসা হচ্ছে হঠাৎ করে।মেয়েটা অনন্যের ডিপার্টমেন্টের।নবনী যদি ভালোভাবে লেখাপড়া করতো তাহলে হয়তো সেও ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে না থেকে কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে থাকতো।পরক্ষণেই ভাবে দোষটা তারই।সমস্যা নেই সে ক্লাস ফাকি দিয়ে অনন্য সাহেবকে গিয়ে হাজারবার দেখে আসবে।এই ভেবে মনটা তার নেচে ওঠে।জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশের চাঁদটা দেখা যাচ্ছে।পূর্ণাঙ্গ নয় অর্ধপূর্ণাঙ্গ।দেখতে দারুণ লাগছে।হালকা বাতাসে জানালার পর্দাগুলো উড়ছে।বাতাসটাও কেমন মোহময় লাগছে নবনীর কাছে।নবনী হেসে বলে ওঠে,“উফ আজকে এতো ঠান্ডা কেনো বুঝতে পারছি না।”

শ্রাবণী বইয়ের ফাঁকে নবনীর দিকে তাকায়।সে নিজেও বুঝতে পারছে না মেয়েটার কি হয়েছে?

চলবে…

- Advertisement -

Read More

Recent