
বেটা, তোর সাখু মামাটাকে দেখছিস কতটা ভেঙে পড়েছে? তোকে তো সে কয়েকটা বছর বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল। তোর অ্যাক্সিডেন্টের পরে কী অমানুষিক কষ্ট করেছে তোকে সুস্থ করে তুলতে! অনেক বাবাও তার সন্তানের জন্য এতোটা করে না। তুই শুধু ওর সন্তানের মতই ছিলি না, ছিলি ওর বন্ধুও। তোর ক্ষ্যাপামি, পাগলামি একমাত্র তোর সাখু মামাই হাসিমুখে কী সুন্দরভাবে ম্যানেজ করতে পারতো! গমগম করে ওঠা অনিকে সে কি এক মন্ত্রবলে শান্ত করে ফেলতো! আমরাও তোকে ওর মতো বুঝিনি বাবু। তোর অ্যাক্সিডেন্টের পরে আমাদের চব্বিশটা ঘন্টা কাটতো তোকে ঘিরেই।
তুই তো বড় একটা বাচ্চা হয়ে গিয়েছিলি। সারারাত তোকে নিয়ে হাসপাতালে জেগে থাকা, দৌড়াদৌড়ি করা, দুই দফায় আড়াই মাস হাসপাতালে থাকা, বাসায় আনার পরে সপ্তাহে দুইদিন ড্রেসিং করাতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সব তো মামাটার ওপর দিয়ে যেতো। তোর প্রায় ৫ ফিট ১১’র শরীরটা সাখু মামা পরম যত্নে স্ট্রেচারে তুলে এ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিত। ঘেমে নেয়ে যেত। ছায়ার মতো সারাক্ষণ থাকত তোর সাথে। মামাটা তোকে খাইয়ে দিত, দিনে ৪-৫টা ইনজেকশন দিতে হতো, শেভ করিয়ে দিতো। আর দিতো সাহস আর সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য প্রেরণা। তোর ভেতরে যেন ডিপ্রেশন না আসে তার জন্য কত কী যে করতো! তোকে বুক দিয়ে আগলে রাখত রে।
অ্যাক্সিডেন্টের পরে জীবন আর মৃত্যু যখন তোকে নিয়ে টানাটানি করছিল তখন আচ্ছন্নতার ভেতরে যখন তোর মায়ের মুখটা ভাসছিল চোখে, যখন মনে হচ্ছিল তোর মায়ের ব্যাকুল চোখ থেকে পানি এসে পড়ল তোর কপালে… কষ্ট করে চোখ মেলে দেখলি মামার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে তোর কপালে। তোর কথা শুনতে শুনতে আমি কাঁদতাম, তোর কথা বলতে বলতে তুই কাঁদতি।বলতি সাখু মামা যেন সারাজীবন আমাদের সাথে থাকে। মামা তো থাকলোই রে, তুইই তো চলে গেলি!
সাখু দু’দিনের জন্য নাটোরে যাবে শুনলেই অস্থির হয়ে যেতি… একটু সুস্থ হতে কোথাও যাবার কথা উঠলেই আগে জিজ্ঞেস করতি— ছোটমামা যাচ্ছে তো? বাবা রে, এবার তো আমাদের কাউকে না নিয়ে একাই চলে গেলি!
তোদের মামা-ভাগ্নের কত পরিকল্পনা! তোরা কত কিছু করতে চেয়েছিলি। করছিলিও। আমি আর তোর বাবা বলতাম, চিটাগংয়ের অফিসের সব দায়িত্ব তোদের মামা-ভাগ্নের। বলতাম, কোম্পানিকে একটা বড় জায়গায় নিয়ে যাবে নাকি বসিয়ে দেবে… তা সবই তোমাদের সিদ্ধান্ত। ওনারশিপ নিয়ে, দায়িত্ব নিয়ে কি চমৎকারভাবে কাজ করছিলে!
তোর মামাটার পাঁজর ভেঙে গেছে রে! ওর মুখের দিকে আমি তাকাতে পারি না, যেমন পারি না তোর বাবার দিকে তাকাতে। এই কয়টা মানুষ তো তোকে ঘিরে রাখতাম সারাক্ষণ। মামাটা বড় কষ্ট পাচ্ছে রে বেটা!
