
শীতের কুয়াশা কেটে গিয়েছে। তবু, ঘাসের অস্পৃশ্য পাতায় এখনো জমে আছে রাতের জমানো শিশির। দোকানগুলো খুলে যাচ্ছে। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছে কোলাহলপ্রিয় মানুষ। খিত্তারপাড়া, খাসাড়িপাড়া, ফেনগ্রাম, চন্দগ্রাম, বাগন, কোনাগ্রাম, হুরুদেশ থেকে আসবে জলঢুপি বির্থুং। আর যথারীতি খুলে যাবে আল-আমিন প্রেস। তার সামনে থাকবে চারজন বসার উপযুক্ত কাঠের সাধারণ একটি বেঞ্চ।
এই সাত সকালে চারজন নয়, অন্তত একজন বেঞ্চে বসে চেয়ারে বসা প্রেসের কবির সঙ্গে আলাপে মত্ত হয়ে যাবে। চমচম মিষ্টিঘর থেকে চা আসবে। চা পানের পর পরই দুজনের আঙুলে জ্বলবে সোনালি পাতার সিগারেট। আশা ভোঁসলে গাইতে থাকবেন – কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন দিয়ে যায়…। আর সঙ্গে সঙ্গে চেয়ারে বসা কবি বলবেন- জানিস, আমাদের শিল্পী কি গায়? পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম…।
এই বেঞ্চিতে এসে বসেছেন হাজী ছইদ আলী, আকাদ্দাস সিরাজুল ইসলাম, আব্দুস সাত্তার, তাজুল মোহাম্মদ, গোলাম কিবরিয়া, তমিজউদ্দিন লোদী, শাকুর মজিদ, এনায়েত সারোয়ার, আব্দুল মালিক ফারুক, কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার, আব্দুল আজিজ, তবারক হোসাইন, ফারুক জোশি, মুস্তাফিজ শফি, আজিজুল পারভেজ সহ আরও অনেকেই। কেন এই বেঞ্চিতেই এসে বসেন এতো এতো গুণধর মানুষ?
আশা ভোঁসলে শেষ হলে শুরু হবে রানু সোমের কেচ্ছা। কিংবা ধূর্জটিপ্রসাদ আর দিলীপ রায়ের বিতণ্ডা। কোন ফাঁকে বেঞ্চিতে সহসা এসে আসন নেবেন রঁদা ও রামকিঙ্কর বেইজ। শামসুর রাহমানই ত্রিশের পরে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবি, এই তর্ক জমে উঠতেই কেউ এসে শুনিয়ে যাবে আল মাহমুদের সোনালী কাবিন৷ কাদরী থেকে ঝরে পড়বে নগরের বৃষ্টি। আবার চা আসবে। ডাকপিয়ন দিয়ে যাবে হরিপদ দত্ত কিংবা হেলাল হাফিজের চিঠি। চা পান শেষে চেয়ারে বসা কবির আঙুলে জ্বলে উঠবে সোনালি পাতার আগুন৷ এখন তিনি নিজেই ডান আঙুল ঘুরিয়ে বলবেন- কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন দিয়ে যায়…!
ফজলুক হক এরকমই। কবি তিনি। শব্দে শব্দে গেঁথে রাখেন পরাবাস্তব ছবি। তার কাছেই মিথের নায়ক এসে পেতে চায় আরো কিছু বদন্তের বিস্তার৷ কলসি কাখে রমণীরা পেয়ে যায় ক্লিওপেট্রার সাম্রাজ্য। দালির গলিত সময় থমকে থাকে বেঞ্চ পাতা বারান্দায়। চিরযুবা এই কবি শহরকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে বলেন – দেখে যা, এখনো কোন কোন কবি গ্রামে বাস করে!
শুভ জন্মদিন ফজলু ভাই। আপনার অমোচনীয় স্মৃতির প্রতি আমার অবিরাম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
টরন্টো, কানাডা

