
জর্জ রায় আমাদের বন্ধু। কবি তুষার গায়েনের কাছে জর্জের কথা শুনতাম প্রায়শই। জর্জও তুষারের কাছে আমার কথা শুনে থাকবেন। মূলত তুষারের মাধ্যমেই জর্জের সঙ্গে আমার পরিচয়। জর্জ তখন মেইন স্ট্রিটের বাড়িতে থাকেন। এক তুষার শুভ্র শীতের রাতে কবি তুষার গায়েনের সঙ্গে জর্জের বাড়িতে গেলাম। বলতে দ্বিধা নেই- জর্জের বিদগ্ধ উষ্ণ সান্নিধ্যের ওম, আর জর্জের বন্ধুপ্রতিম স্ত্রী জেনিফার রায়ের স্বাগতিক সহাস্যমুখ আপ্যায়ন ও আলাপে বাহিরের শীতের তীব্র আক্রমণকে আমরা সহজেই ভুলে গিয়েছিলাম। গেলাসের সোনালি শিশির পান করে করে আমরা সাঁতার কেটেছিলাম কবিতার স্নিগ্ধ জোছনায়। তলিয়ে যাবার মৃত্যুভয় সেখানে ছিল না। বরং অনড় নিশ্চল থেকেও আমরা ভ্রমণ করেছিলাম মহাজাগতিক রশ্মির সাথে সাথে।
কবি ইকবাল হাসানের সঙ্গে আমার পরিচয় এই টরন্টো শহরেই। তাঁর কবিতা পড়েই আমি কবি ইকবাল হাসানকে খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠি। ড্যানফোর্থ এভিন্যুতে তখনও বাংলা টাউন দানা বাঁধেনি। তথাপি দু’একটা গ্রোসারির সঙ্গে ছিল সবেধন প্রিয়াঙ্গন। আজ যেটা ঘরোয়া রেস্টুরেন্ট হিসেবে খ্যাত সেটিই একসময় প্রিয়াঙ্গন নামে খ্যাত ছিল। সেইসময়ের একদিনে ড্যানফোর্থের একটি গ্রোসারির একটি সেলফে দেখি ‘জোছনার চিত্রকলা’ নামে অপূর্ব সুন্দর প্রচ্ছদের একটি ছোট্ট বই। হাতে নিয়ে দেখি এটি একটি কবিতার বই। প্রচ্ছদটি কবির বন্ধু প্রখ্যাত শিল্পী ও পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক সৈয়দ ইকবালের আঁকা। জ্যোৎস্নার চিত্রকলার কবিতা পড়ে আমি রীতিমতো বিস্মিত। প্রবল রোমান্টিকতা ও ছোট ছোট চিত্রময়তায় আঁকা প্রতিটি কবিতা। বিস্মিত একারণে যে, এরকম সুসংহত গাঁথুনি আর শব্দবন্ধের ঋজু ও নির্মেদ ব্যবহারে মনকাড়া কবিতার কবি নাকি টরন্টো শহরেই থাকেন! আমি বইটি ক্রয় করে ইকবাল হাসানকে খুঁজে বের করার তৎপরতায় লেগে যাই। এক সময় ইকবাল হাসানকে খুঁজে পাই। ইকবাল হাসান প্রচণ্ড আড্ডাবাজ মানুষ। বন্ধুবৎসল। তারুণ্যে ভরপুর। রস করার জন্যে তির্যক বাক্যবাগীশ। এই মুহূর্তে যার নিন্দায় মুখর, পরমুহূর্তেই তার সঙ্গে নিবিড় গলাগলি। অর্থাৎ এক অস্থির অবাধ্য কিশোর ইকবাল হাসানের মনোজগতকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় সারাক্ষণ। কিন্তু বাস্তবের পরিপার্শ্ব তাকে বাধ্য করে আর দশজনের মতো থাকতে ও সামাজিক ন্যায়বিচারগুলো মানতে। ইকবাল হাসানের ঝুলিতে আছে অসংখ্য গল্প। অসংখ্য দ্যুতিময় মানুষের সঙ্গে মধুর ও ঈর্ষনীয় সময় যাপনের সমাহার। আজ পেছন ফিরে দেখি ইকবাল হাসানের সঙ্গে আমার মনোমালিন্য হয়েছে; ভুল বুঝাবুঝির কারণে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়েছে। পরবর্তীতে আবার আমরা নতুন উদ্যমে আড্ডায় মেতে উঠেছি। আমি বিশ্বাস করি বন্ধুত্বের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি হবে। দৃষ্টি ভঙ্গির তারতম্য সত্ত্বেও বন্ধুত্ব অটুট থাকবে৷ দু’জন মানুষের রুচি, বিশ্বাস, ধারণা, জ্ঞান ভিন্ন হয়েও বন্ধুত্ব বজায় থাকবে। এরকম আছে বলেই এই পৃথিবীতে মানুষ সুন্দর সমাজ গঠন করে জীবনকে যাপন করে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন৷ আমরা এই সভ্যতারই দুটি প্রাণ। দুটি আলাদা মানুষ। আলাদা মেজাজ সত্ত্বেও পরস্পরের প্রতি বন্ধুত্বের টানে একীভূত। ইকবাল হাসান ও তার স্ত্রী তসলিমা হাসান আমার আপনজন। আপনজনের আহবান কি ফেলে দেওয়া যায়!
জর্জ রায় ও কবি ইকবাল হাসান পরিকল্পনা করলেন জর্জের চাচাতো ভাই রনি রায়ের উইণ্ডজরের বাড়িতে বেড়াতে যাবেন। তাদের সঙ্গে যেতে হবে আমাকেও। আমার অভিধানে আবার বেশ কয়েকটি শব্দ একেবারেই নেই। ‘না’ শব্দটিও সেরকম। অভিধানেই যেহেতু নেই, মুখেও তাই আমার ‘না’ আসে না। অতএব, ইউণ্ডজোর অভিযানে এক সূর্যকরোজ্জ্বল সকালে আমরা তিন ভাই রওয়ানা দিলাম। কানাডা দেশটি এমনই যে, শহর থেকে বের হলেই দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর। মাইলের পর মাইল উঁচুনিচু সরল সোজা রাজ-রাস্তা বা হাইওয়ে। আমরা ছুটে চললাম হাইওয়ে ধরে। আমাদের সাথে সাথে বহু আগের অতীত থেকে উঁকি দিলেন ভিন্ন গল্পের ভিন্ন ভিন্ন মুখ। গল্পের মাঝে মাঝে লীলাময় পাত্র, শ্রীজাত, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা প্রণব রায়ের লেখা গান আমাদেরকে অন্য মনস্ক করলেই কবি ইকবাক হাসান এমন একেকটি বিষয় উত্থাপন করেন যে, সেই হাসির রেশ কাটতে সময় লাগে দীর্ঘক্ষণ। এরকম একটি গল্প বলি। গল্পের সময় সত্তরের দশক। স্থান ঢাকা। গল্পের প্রধান নায়িকা অনিন্দ্যসুন্দর কবি সুরাইয়া খানম। তৎকালে ঢাকার সকলেই জানেন আবুল হাসান সুরাইয়াকে ভালোবাসেন। সুরাইয়াও আবুল হাসান বলতে অজ্ঞান। আবুল হাসানের অকাল মৃত্যুর পর ঢাকায় সুরাইয়ার সঙ্গে ইকবাল হাসানের বন্ধুত্ব হয়। প্রেম নয়। স্রেফ বন্ধুত্ব। কিন্তু অনন্যা সুরাইয়া খানমের মুগ্ধতায় বিভোর অনেকেই ইকবাল হাসানের সঙ্গে এই স্রেফ বন্ধুত্বটাকেও মেনে নিতে পারছিলেন না। রাহাত খান ঈর্ষায় জ্বলেছেন। রফিক আজাদ ইকবাল হাসানকে ডেকে বলছেন – বেটা, তুমি সুরাইয়ার সঙ্গে এরকম ঘুরে বেড়াও কেনো? তুমি তো শেষ হয়ে যাবে বেটা! সেই সময়ে ইকবাল হাসানের একটি কবিতা ছাপা হলো ইত্তেফাকে। কবিতার মূল বিষয় ছিল অগ্রাণের শীত। রফিক আজাদ ইকবাল হাসানকে ডেকে পাঠালেন। তাঁর শরীরে চাদর। ইকবাল হাসান চাদর আচ্ছাদিত কবিকে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে জিগ্যেস করলেন -‘ রফিক ভাই, আপনার শরীর খারাপ হয়েছে? শরীরে জ্বর নাকি?’
রফিক আজাদ জবাবে বললেন- ‘বেটা, ইত্তেফাকে তোমার একটি কবিতা পড়লাম। কবিতাটি পড়ে এমন তীব্র শীত লাগছে যে, শরীরে চাদর দিতে হলো।’ এরকম গল্প, গান আর হাস্যরসে আমরা রাজ রাস্তা বা হাইওয়ে ৪০১ ধরে লণ্ডন পার হচ্ছি। দেখি সবুজ জমিনের উপর দৈত্যাকার উঁচু উঁচু উইণ্ড মিলের সারি। অগণিত। ওলন্দাজরা হল্যান্ড দেশটি জুড়ে এরকম উইণ্ড মিল আর টিউলিপ দিয়ে ভরে রেখেছে৷ উইণ্ড মিলের ধারালো ব্লেড আর গম ও ভুট্টা ক্ষেতের সবুজ প্রান্তর পার হয়ে আমরা মধ্যাহ্নের ধবল আলোয় গিয়ে পৌঁছলাম ড. সব্যসাচী চৌধুরী রনি রায়ের বাড়িতে। রনি অনাড়ম্বরভাবে আমাদেরকে স্বাগত জানালেন। যেন পাশের বাড়ির বহুদিনের চেনা আপনজন তার বাড়িতে গিয়েছি, এরকম ঘরের মানুষ মনে করে বাড়ির পেছনে এক টুকরো বাংলাদেশ দেখাতে নিয়ে গেলেন। লাউ, মিষ্টি কুমরা, কালো কালো মরিচ, পাটশাক, বেলী ফুল, জবা ফুল ইত্যাকার লতায় পাতায় ফুলে ফসলে ভরপুর।
রনি রায় উদ্যমী, ভীষণ প্রাণশক্তিপূর্ণ একজন মানুষ। তার ব্যবহারে কোন বাহুল্য নেই। প্রবল চেষ্টায় কোনকিছু নিয়ে দেখানোপনা নেই। শুদ্ধ উচ্চারণ। নির্বাচিত শব্দের প্রয়োগে তার রুচিসম্পন্ন বাক্যগুলোও হৃদয় উৎসারিত। রনিকে আমাদের ভালো লেগে গেলো। বুঝতে পারি আমাদেরকেও রনির রুচিহীন মনে হয়নি। তখন তার বাড়িতে এক কন্যা গুনগুন রায়৷ দুটি অপূর্ব সুন্দর টিয়া পাখি। সান ও মুন। আর আছেন রনির শাশুড়ি। তার শ্বশুর ও স্ত্রী বাইরে; কাজে।
দুপুরের খাবার খেয়েই আমরা ছুটে চললাম লেক এরিতে মাছ ধরতে। রনির নিজের একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা আছে। আকারে ছোট হলেও মাছ ধরার জন্য উপযুক্ত। আমরা ইঞ্জিন চালিয়ে চারজন নৌকায় বসে চলে গেলাম লেক এরির মাঝখানে। জায়গাটা দুদিক দিয়ে বৃক্ষের দেয়াল দেওয়া ছোট নদীর মতো। শান্ত। শান্ত হলেও মাছ ধরার আনন্দ ও উচ্ছ্বাস ধ্বনিতে এলাকাটি মুখর হয়ে উঠলো। আর রনির প্রাণ উজাড় করা গান শুনলে নীরবতা ভেঙ্গে বৃক্ষের পাতাও আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার কথা। হয়েছিলও তাই। অন্তত আমি সেরকমই তো অনুভব করলাম। ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা, আমি কাঁদি সাহারায় / ওগো কমলিকা বুঝিলেনা, আমি কত অসহায় / তোমার ভুবনে ফুলের মেলা, আমি কাঁদি সাহারায়…’ পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা এবং অখিল বন্ধু ঘোষের সুর ও কণ্ঠে এই গান লেক এরির সেই নীরব বিকেলে যারা রনি রায়ের কণ্ঠে শুনেননি, তাদেরকে বুঝানো যাবে না, রনি রায় কত প্রেমময় বিরহী আবেগের দরদ ঢেলে দিয়েছিলেন এই গানে!
মূলত এই এলাকাটি সান ফিশের জন্য উপযুক্ত। আমরা সান ফিশই ধরতে চাই। এই মাছটি কড়া করে ভাজলে বাংলাদেশের কৈ মাছের মতো স্বাদ পাওয়া যায়। আমার খুব ভালো লাগে। টুক টুক করে ধরতে ধরতে আমরা চারজন শেষ পর্যন্ত একশত একটি মাছ ধরলাম। এদিকে পশ্চিম আকাশে সূর্য যখন হেলে পড়লো। আমরাও বললাম – চলেন এবার বাড়ি যাই!
সন্ধ্যার পর আমরা রনি রায়ের বাড়ি এলাম। ইতোমধ্যে রনির স্ত্রী লিজা রায় ও শ্বশুর কাজ শেষ করে বাড়িতে ফিরেছেন। আমাদের মাসিমা দোপেয়াজা করে সীবাস রান্না করেছেন৷ সান ফিস ভেজেছেন। হাঁস ভুনা করেছেন৷ চাচাতো ভাই জর্জকে দেখতে রনির বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন রনির বোন ও ভগ্নিপতি। আর কি আশ্চর্য, দরজা পর্যন্ত চলে যাওয়া ভগ্নিপতিকে রনি ডেকে বললেন- রঞ্জু তুমি যাওয়ার আগে- পল পল গানটা শুনিয়ে যাও প্লিজ। দ্বিতীয়বার বলার অপেক্ষা না করে রঞ্জু ফোনে গানের ট্রাক বাজিয়ে দরাজ গলায় মধু ঢেলে গাইতে লাগলেন – ‘পল, পল, দিল-কে পাস, তুম রেহতি হু..’! কিশোর কুমারের কণ্ঠে এই গান কতবার শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই। প্রতিবারই ভালো লেগেছে। আলাদা মেজাজে আলাদা আবেদনে গানটি নিজের কাছে আলাদাভাবে প্রতিভাত হয়েছে। কিন্তু রঞ্জুর কণ্ঠে এই গান যেন- অন্যরকম অনন্য এক গল্প! বাইরের কুয়াশার চাদরে লুকিয়ে আছে যে অনন্যা অদৃশ্য অপ্সরা; তারই উচাটন বসবাস হয়তো প্রতিটি রঞ্জুর হৃদয় জুড়ে! গানের সুর-ধ্বনিতে ভর করে যে কখনো কখনো ধরা দেয় নিরুপায় হয়ে!
রনি রায়ের স্ত্রী লিজা রায় এক অনন্যসাধারণ স্নিগ্ধ মানুষ। বাহিরে অচঞ্চল। নীরব। শান্ত। একটি মিষ্টি হাসি তার চিবুকের কোণে লেগে আছে। রনি রায় ও লিজা রায়ের পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্মান এই পরিবারের গভীর শান্তির অস্ফুট কারণটি যে কেউ ধরতে পারবেন৷ কথা ছিল রনি আমাদেরকে গান শোনাবেন। কথামতো হারমোনিয়াম নিয়ে রনি অখিলবন্ধু ঘোষ, মান্না দে, সুবীর নন্দী, সতিনাথ মুখোপাধ্যায়ের গান গাইতে লাগলেন। আমাদের সকলের অনুরোধ রক্ষা করতে লিজা রায় এসে রনির সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে গাইলেন রবীন্দ্রনাথের গান- কেন যামিনী না যেতে জাগালেনা, বেলা হলো মরি লাজে। ভালোবাসার নিবিড় বন্ধন থাকলে গানে গানে দুটি প্রাণের দ্যুতিময় উদ্ভাস ফুটে ওঠে। যেমনটি হয়েছিল লিজা রায় ও রনির রায়ের গানের সময়ে।
রনি গান শিখেছেন। গানের উপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন ভারতের পুনে ও এলাহাবাদে। অন্য একটি বিষয়ে পিএইচডি করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায়। কিন্তু এই বিষয়গুলো তিনি এড়িয়ে যেতে চান। অথচ তার কণ্ঠে আশ্চর্য মধুর সুর। মায়াবী উচ্চারণ। সুললিত কণ্ঠস্বর। শিল্পী রনির আরেকটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে মোহিত করেছে। সেটা হলো গানের বাণী ও সুরের প্রতি তার মননশীল রুচি৷ মুগ্ধ হয়ে শুনেছি রনির নিজের লেখা ও সুর করা গান। কী যে অপূর্ব কথা ও সুরের ঐন্দ্রজালিক সমন্বয়! আর তার মায়াময় কণ্ঠে হৃদয় উজাড় করা পরিবেশনা! আহা! আমি কি কখনো ভুলতে পারবো রনির লেখা ও সুর করা সেই অপূর্ব সুন্দর গানটি-
বলেছিলে দুঃখ কিনতে
আসবে আমার তাজমহলে
সুখের দরে দুঃখ নিয়ে
চলে গেলে দিন ফুরোলে…’
রনি রায়, লিজা রায়, গুনগুন রায়ের জন্য অনেক শুভেচ্ছা। স্মৃতির অমলিন পাতায় কয়েকটি ছবি আঁকা হয়ে থাকলো। আলাদাভাবে যাদের মুখচ্ছবি ভেসে উঠবে বারংবার!
টরন্টো, কানাডা

