
মেয়েটার সাথে আমার পরিচয় কেবল দুই মাস হয়। এখন সন্ধ্যা, সারাদিনের তাপ কিছুটা কমেছে। মাত্র একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছ থেকে আমরা বের হলাম। শহরের পথে কোলাহল, রঙিন আলো জ্বলে উঠেছে প্রতিটা দোকানের সামনে, চোখে লাগে এমন আলো। রিক্সা, অটো, সিএনজি এবং মানুষের কথার শব্দ মিলে অদ্ভুত এক সুর এখানে; সব শব্দ মিশে নতুন এক শব্দ। হঠাৎ একটা সিএনজির চাকা ব্লাস্ট হয়, মুহুর্তের ভিতরে সব শব্দ থেমে যায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ড নিরব হয়ে উঠে শহরের কোলাহলের জায়গা। কিছুক্ষণের ভিতরেই নিরবতা ভেঙে যায়। যে যার মত আবার পথ চলতে শুরু করে।
আমরা দুজন চুপচাপ হাঁটছি৷ গন্তব্য জানা, এখন আমরা যাবো শহরের এক কোনায় একটা লাইব্রেরিত, যেখানে পুরাতন বই পাওয়া যায়। দুজনে বই ঘাটবো, তারপর মেয়েটা ওর পছন্দ মতো কিছু বই নিয়ে নিবে। ও অবশ্য অনেক বই কিনে, আমি মাসে দুই একটা কিনতে পারি। বেশি বই কিনলে কবিতা আর উপন্যাস খেয়ে দিন কাটাতে হবে, সত্যি হলো কবিতা আর উপন্যাস খাওয়া যায় না, দুপুরে ক্ষুধা লাগলে ভাত খেতে হয়, গরম ভাত, ধোঁয়া উঠা শাদা ভাত। তারপর একটা ভাতঘুম, ভাতঘুম না দিলেও চলে তবে দুপুরে ভাত অবশ্যই দরকার।
আমরা দুজনে হাঁটতে হাঁটতে লাইব্রেরির পাশে এসে দাঁড়াই। স্নিগ্ধা বইয়ের স্তুপ থেকে বই বের করে, আমিও স্তুপ ঘাটতে শুরু করি। স্নিগ্ধার দুটে বই পছন্দ হয়, দুটো বই কিনে। স্নিগ্ধা বলল, তুমি বই কিনবে না। আমি বললাম না তেমন পছন্দের বই পেলাম না।
স্নিগ্ধার সাথে আমার পরিচয় এই লাইব্রেরিতে এসেই। আমি মাসের শুরুতে এখান থেকে দুই একটা বই কিনা। সেবার এসে বই ঘাটতেছিলাম, পাশ থেকে একটা মেয়ে বলল, আমাকে ওই বইটা একটু নামিয়ে দিবেন। আমি তাকিয়ে দেখলাম একটা আকাশী রঙের ফ্রোক পরা মেয়ে, যার খোঁপা করা চুল, চোখে একটা তীক্ষ্ণ কাঁচের চশমা। আমি বললাম কোন বই, মেয়েটা একেবারে তাকের উপরে একটা বই দেখালো। আমি বইটা তাক থেকে নামিয়ে তার হাতে দিলাম। মেয়েটা বইটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে বলল, দাম কতো? আমি একটু অবাক হলাম। মেয়েটা হয়তো আমাকে দোকানের লোক ভাবছে, আমি বললাম আমি এখানকার লোক না, আপনার মতোই পাঠক, যে বই কিনতে এসেছে। মেয়েটা ভীষণভাবে লজ্জিত হয়ে বেশ কয়েকবার দুঃখিত বলল, আমি বললাম ঠিক আছে সমস্যা নেই।
মেয়েটা বইয়ের দাম পরিশোধ করে বের হয়ে যায়৷ আমিও একটা পছন্দের বই পেয়ে যাই। বইয়ের দাম মিটিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম, তখন পাশের একটা টঙ থেকে কেউ যেনো আমাকে ডাকলো। তাকিয়ে দেখলাম লাইব্রেরির সেই মেয়েটা। মেয়েটা বলল, চা খাবেন? আমি হ্যাঁ বা না কি বলবো ঠিক বুঝলাম না। এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবার সাহস হয়তে কোনো যুবকের নেই, আমিও পারলাম না। আমি একটা টুলে বসলাম সেই থেকে স্নিগ্ধার সাথে আমার পরিচয়। ফোন নাম্বার আদানপ্রদান, গভীর রাতে ফোনে কথা বলা, চিঠি লেখা। এইতো।
কখনো দুজনে এখানে আসি লাইব্রেরিতে বই ঘাটি৷ স্নিগ্ধা মানসিকভাবে অসুস্থ, ভীষণ অসুস্থ। মাসে একবার সাইকিয়াট্রিস্ট দেখায়, ঢাকা থেকে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট আসেন মাসে একবার স্নিগ্ধা তাকে দেখায়।
স্নিগ্ধার মা বাবা দুজনেই আলাদা। দুজনের আলাদা সংসার। এমন না যে স্নিগ্ধা অর্থকষ্টে আছে। বাবা তার খরচ দেয়, স্নিগ্ধা থাকে তার বড় খালার সাথে। স্নিগ্ধা কখনো কখনো বলে, দেখো বাবা মা কি কেবল আমার জন্যে একসাথে থাকতে পারতো না? আমি কোনো উত্তর দিতে পারি না।
এইতো সেদিন আমরা দুজনে পাশাপাশি হাঁটছি। তখন সামনে একটা স্কুল ছুটি হয়েছে, একটা বাচ্চার হাত ধরে তার বাবা রাস্তা পাড় করে নিয়ে যাচ্ছে, স্নিগ্ধা সেই দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখলো, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো। বাচ্চাটা আর তার বাবাকে যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ একইভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো। স্নিগ্ধার চোখে দেখলাম বৃষ্টির কিছু ফোঁটার মতো পানি। মেয়েটা আবার হুট করেই চোখমুছে একটা হাসি দিলো।
স্নিগ্ধা যেনো দিনের পর দিন অসুস্থ বেশি হয়ে যাচ্ছে। স্নিগ্ধাকে আমি ভালোবাসি কিনা কিংবা স্নিগ্ধা আমাকে ভালোবাসে কিনা কেউ জানি না। আমি কি ওর হাতটা ধরলে মন খারাপ ভালো হবে সে-ও জানি না। স্নিগ্ধা বলেছে, কখনো সে বিয়ে করবে না।
স্নিগ্ধাকে নিয়ে পাশের একটা নদীর ঘাটে গেলাম। এখানে আমি প্রায়সময়ই বসি। সিঙ্গারা পাওয়া যায় তিনটাকায়। এই সিঙ্গারার দোকানে সজীব নামের একটা ছেলে কাজ করে, ওর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, সজীব মা এবং ভাইয়ের সাথে এখানের একটা বস্তিতে থাকে।
সজীবকে ডাক দিলে পাশে এসে দাঁড়িয়ে হাসি দিলো। স্নিগ্ধাকে বললাম চা খাবে নাকি সিঙ্গারা? স্নিগ্ধা বললো দুটোই, তবে আরেকটা সিগারেট।সিগারেট চলবে না বাকি দুটো চলতে পারে। স্নিগ্ধা হাসলো।
সজীব সিঙ্গারা দিলো। আমি সজীবকে ডেকে পাশের একটা টুলে বসালাম। জিজ্ঞেস করলাম সজীব তোর দুঃখ হয় না? সজীব বলল না ভাই, আমার আবার কিসের দুঃখ! আমি আর স্নিগ্ধা দুজনেই হাসলাম।
স্নিগ্ধাকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি তোমার সাইকিয়াট্রিস্টকে মাসে কতো টাকা ভিজিট দেও। স্নিগ্ধা বলল, দুই হাজার টাকা। আমি সজীবকে ডেকে ওর হাতে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট দিয়ে বললাম এটা দিয়ে তুই আইসক্রিম কিনে খা। সজীব বলল, না ভাই লাগবে না। আমার জোরাজুরিতে টাকাটা নেয়। সজীব টাকাটা দিয়ে আইসক্রিম না কিনে এক প্যাকেট বিস্কুট কিনলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আইসক্রিম না কিনে বিস্কুট কিনলি কেন? সজীব বলল, মায় এই বিস্কুটটা ভালো খায়।
স্নিগ্ধা তাকিয়ে আছে। আমি বললাম দেখো স্নিগ্ধা আমরা কি নিজেরাই নিজের দুঃখ তৈরি করি না? স্নিগ্ধা বলল কিভাবে? আমি বললাম, তোমার টাকা আছে তাই দুই হাজার টাকা দিয়ে ডাক্তার দেখাও, মনের অসুখের। অথচ সজীব যে মনে কতো অসুখ নিয়ে এখানে বড় হয়ে উঠেছে, ওর যে ডাক্তারের প্রয়োজন হয় না, মনের অসুখ কি শরীরের অসুখেই ডাক্তার দেখাতে পারে না জ্বর হলে ফার্মেসি থেকে নাপা কিনে খায় আর বড়জোর একটা সিরাপ কিনতে পারে। স্নিগ্ধার চোখে পানি, মেয়েটা যে কোমল হৃদয়ের সেসব বুঝতে পারি, সজীবের দুঃখে কাঁদছে। অথচ সজীব এই দুঃখ বুকে লালন করেও বলে, আমার আবার কিসের দুঃখ ভাই!
স্নিগ্ধা বলল, তো আমি কি করবো। আমি বললাম তোমার কোনো স্বপ্ন নেই? স্নিগ্ধা বলল আছে, তবে এখন স্বপ্ন মুছে ফেলতেই ভালো লাগে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কি স্বপ্ন বলো। স্নিগ্ধা বলল দেশের বাহিরে পড়তে যাওয়ার খুব ইচ্ছে। আমি বললাম, কেবল নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে বাঁচো। তোমার চলার পথে বহুজনে সঙ্গী হবে তবে আবার অনেকেই হারিয়ে যাবে, শেষ পর্যন্ত যদি চাও সবাই তোমার পাশে থাকবে এমনটা কখনে হবে না। এই চাওয়াতে তুমি কেবল দুঃখ পাবে।
স্নিগ্ধা পড়াশোনা শুরু করে। একবছর পরেই দেশের বাহিরের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ পেয়ে যায়।
স্নিগ্ধা শীতের কিছু পোষাক কিনেছে, আমিও সাথে ছিলাম। মেয়েটার চোখেমুখে তখন সে কি উচ্ছ্বাস। ভাবছি স্নিগ্ধা দূরে যাওয়ার আগে ভালোবাসার কথা বলবো, তবে সে কথা বলা হয়না।
স্নিগ্ধা যাবার আগে এয়ারপোর্টে একবার জড়িয়ে ধরে, চোখে পানি টলমল। আবার চট করে চোখমুছে হাসে। আমি ঠিক কি বলবো বুঝতে পারলাম না, ইচ্ছে করছি বলি থেকে যেতে তবে সে সাহস হয়নি। মেয়েটা স্বপ্নের পিছনে ছুটছে, স্বপ্নই যে আমাদের দুঃখ সাথে নিয়েই হাসিমুখে বাঁচতে শেখায়৷
স্নিগ্ধা চলে যায়। সারাদিন সেবার ঢাকা শহর হাঁটি। দুদিন পরে একটা মেইল আসে, মেইলটা স্নিগ্ধার। ‘স্নিগ্ধা লিখেছে, তুমি কি আমার সাথে শেষসময় পর্যন্ত থাকবে, আমি তোমার পাশেই থাকতে চাই৷ বিয়ের কোনো ইচ্ছে আমার ছিলো না তবে আমি চাই আমাদের একটা ঘর হবে, একটা ছোট্ট বাচ্চা থাকবে, ওর নরম আঙুলে আঙুল রাখবো।’
আমি লিখিলাম, থাকবো শেষ সময় পর্যন্ত। স্নিগ্ধাকে এখন অদ্ভুত হাসিখুশি লাগে, মেয়েটার এখন অনেক স্বপ্ন তৈরি হয়েছে জীবনকে ঘিরে। স্নিগ্ধা দেশে আসলেই আমাদের বিয়ে হবে। আমি ক্যালেন্ডার দাগিয়ে রাখছি স্নিগ্ধা কবে দেশে আসবে।
